জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১১৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে ‘নজরুলমেলা’র আয়োজন করা হয়। চ্যানেল আই ও আইএফআইসির ১২তম আয়োজনে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী শাহীন সামাদ। এছাড়া শিল্পী ফেরদৌস আরার নজরুলসংগীত সমগ্রের সপ্তম খণ্ডের মোড়ক উম্মোচন করা হয়।
প্রিয় কবিকে ভালোবেসে ‘নজরুলমেলা’য় উপস্থিত ছিলেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারোয়ার, নজরুলসংগীতশিল্পী শাহীন সামাদ, শিল্পী খালিদ হোসেন, নাট্যজন ইনামুল হক, শিল্পী ফেরদৌস আরা, শিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক, চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, সঙ্গীতজ্ঞ আজাদ রহমান, নাট্যজন সৈয়দ হাসান ইমাম, কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ, অধ্যপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক চিন্ময় মুৎসুদ্দি, সুভাষ সিংহ প্রমুখ।
ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে শ্রদ্ধার জন্যই এই মেলা। তিনি বন্ধুর মতো আমাদের পাশে রয়েছেন। আজকের এই পুরো অনুষ্ঠান জুড়ে তিনি আমাদের আরও নিকটে থাকবেন বলে আমি মনে করি।’
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘নজরুল মানুষে মানুষে ভেদাভেদ পছন্দ করেননি। পছন্দ করেননি সাম্প্রদায়িকতা। তিনি সাম্যের গান গেয়ে গেছেন। তার আদর্শে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়াই হবে নজরুলের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান জানানো।’

ফেরদৌস আরা বলেন, ‘যিনি প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত তার কলমের মাধ্যমে জীবন্ত করে গেছেন, তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ফলে আজকের দিনটি বিশেষ দিন। অন্যায়, অবিচার, রক্তচক্ষুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা কাজী নজরুল ইসলাম।’
মুস্তাফা মনোয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার বাবা কবি গোলাম মোস্তফা কলকাতা গেলেন। বললেন কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করে আসি। আমাকে বললেন, “তুমি জলযোগের দই আর সন্দেশ কিনে আনো।” নজরুল খুব খেতে পছন্দ করতেন। দই, সন্দেশ কিনে তার বাসায় গেলাম। শ্যামবাজারের দিকে তখন খাকতেন। আমি সাথে কালো রঙ্গের একটা ক্যামেরা নিয়েছি। কবির ছবি তুলব। বাসায় ঢোকার আগ মুহূর্তে দেখি, ভেতরে খুব আওয়াজ হচ্ছে। সব্যসাচি বললেন, “আপনার ক্যামেরাটা সামলে রাখেন।” আমি দ্রুত কালো ক্যামেরাটা তার হাতে দিলাম। তিনি সামলে রাখলেন। আমরা নজরুলের রুমের সামনে গিয়ে দেখি, উনি কালো কাক তাড়াচ্ছেন। খুব কর্কশ গলায় কাক তাড়াচ্ছেন। আমার খুব দুঃখ লাগল। ভাবলাম এতো ভালো কবি, এতো সুন্দর তার গলা। তিনি কাক তাড়াচ্ছেন! পরক্ষণেই মনে হলো উনি কালো কোনো কিছু দেখতে চাননি। অন্ধকার দেখতে চাননি। জীবনভর তিনি অন্ধকারকে তাড়াতে চেয়েছেন।’

সৈয়দ হাসান ইমাম বলেন, ‘আমাদের সমাজে, শিক্ষা ব্যবস্থায় নজরুলকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে বাংলাদেশের অবস্থা এমন হতো না। আমরা সেই আশা করব যে নজরুলকে চেতনায় ধারণ করবে এবং জীবনের প্রতিটি কাজে নজরুলের আদর্শকে ব্যবহার করবে। নজরুলের মতো সাহসী মনুষ বাঙালি জাতির মধ্যে আমরা আর কাউকে দেখতে পাই না। নির্ভয়ে তিনি সব কথা বলেছেন। জেলে গেছেন। জুলুম সহ্য করেছেন। দারিদ্র সহ্য করেছেন, কিন্তু কোনোদিন আপোষ করেননি। আমরা আপোষহীন নজরুলকে স্মরণ করি।’
নজরুলকে নিয়ে আলোচনা শেষে বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করা হয়। চ্যানেল আইয়ের সেরা নাচিয়ে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উঠে আসা একঝাঁক তরুণ নাচিয়ে নজরুলের লেখা ‘বেল ফুল ফুল এনে দাও চাই না বকুল’ গানের সুরে নেচে অনুষ্ঠান শুরু করেন।
সৈয়দ হাসান ইমাম আবৃত্তি করেন ‘সাম্যবাদী’ কবিতা। মঞ্চে এসে ‘দূর্গম গিরি কান্তার মরু’ গাইলেন গানের স্কুল ‘সুর সপ্তক’-এর ছয় শিল্পী।

ফেরদৌস আরার গাওয়া নজরুলসংগীত সমগ্র সপ্তম খণ্ড অ্যালবামের মোড়ক উম্মোচন করা হয়। অ্যালবামটি নিবেদন করছে আইএফআইসি ব্যাংক। মোড়ক উম্মোচনকালে ফেরদৌস আরা বলেন, ‘সঠিক বাণী ও সঠিক সুরে নজরুলসংগীত ধারণ করা খুব কঠিন। সবার সহযোগিতার ফলে অ্যালবামটি আপনাদের হাতে তুলে দিতে পারছি।’
একই মঞ্চে শিল্পী শাহীন সামাদকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। শাহীন সামাদকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন ফেরদৌস আরা। সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করেন আজাদ রহমান ও মুস্তাফা মনোয়ার। ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন ফরিদুর রেজা সাগর ও শাহ আলম সারোয়ার। সম্মাননা পেয়ে শাহীন সামাদ বলেন, ‘আমি আপ্লুত। সারা বিশ্বের বাংলাদেশিদের মনে প্রাণে ঠাঁই করে নেওয়া চ্যানেল আই আমাকে এতবড় সম্মান দিল। আমি খুবই খুশি। পুরস্কার দায়িত্ববোধক বৃদ্ধি করে। দোয়া করবেন, আমি যেন আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি।’
চ্যানেল আই প্রঙ্গনে মেলায় ছিল কয়েকটি স্টল। আনন্দধারা, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন, আইএফআইসি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্টলের মাধ্যমে তাদের সেবা ও তথ্য প্রদান করে। এছাড়া শিশুদের চিত্রাঙ্কণের ছিল জমকালো।
ছবি : এস এম নাসির, তানভীর আশিক










