গৃহকর্মীর বেতনা না দেওয়া কিংবা বেশি পরিশ্রম করানোর ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে কূটনীতিক গ্রেফতারের ঘটনা এটাই প্রথম নয়। সোমবার বাংলাদেশী কূটনীতিক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলামকে গ্রেফতারের আগে এরকম ঘটনায় জড়িয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে।
দেবযানী ছিলেন নিউইয়র্ক সিটিতে ভারতীয় কনস্যুলেট জেনারেলের ডেপুটি কনসাল জেনারেল। ২০১৩ সালে ১১ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে সঙ্গীতা রিচার্ড নামের এক ভারতীয়কে গৃহকর্মী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার জন্য ভিসা আবেদনে মজুরি নিয়ে মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। একইসঙ্গে অভিযোগ করা হয়, তিনি গৃহকর্মীকে চুক্তি অনুযায়ী পারিশ্রমিক না দিয়ে বেশি কাজ করিয়েছেন।
পরদিন, অর্থাৎ ১২ ডিসেম্বর দেবযানীকে সন্তানকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে মার্কিন ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী তাকে কর্তৃপক্ষ গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কিন্তু, অভিযোগ উঠে যে একজন কূটনীতিক হওয়ার পরও এ ধরনের পরিস্থিতিতে কূটনীতিকের প্রাপ্য সম্মান বা সুবিধাগুলো তিনি পাননি। একজন সাধারণ কয়েদির মতো দেবযানীকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর অপরাধীদের মতো বিবস্ত্র করে তার দেহও তল্লাশি করা হয়। শুধু তাই নয়, তার ডিএনএ সংগ্রহ করে কারাগারে মাদকাসক্তদের সঙ্গে একই কক্ষে রাখা হয় তাকে।
দেবযানী অবশ্য কোন ধরনের অনিয়ম করার কথা অস্বীকার করেন। এক পর্যায়ে জামিনে ছাড়া পান তিনি।
একজন কূটনীতিককে এভাবে ‘হয়রানি’ করার ঘটনায় পুরো ভারত জুড়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ভারত দেবযানীর কূটনৈতিক দায়মুক্তি বা ছাড়ের দাবি পরিত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল মার্কিন সরকারের কাছে। দিল্লি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এ আচরণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনারও দাবি জানিয়েছিল।

কিন্তু ক্ষমা চাওয়া তো দূর, উল্টো দেবযানীকে বিচারের মুখোমুখি করার ব্যাপারে অনড় থাকে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ফেডারেল আদালতের গ্র্যান্ড জুরি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
দেবযানীকে গ্রেফতার ও তল্লাশির নামে হয়রানি নিয়ে তীব্র সমালোচনার সময়টাতে কনস্যুলেট থেকে সরিয়ে জাতিসংঘ মিশনে পাঠানোর ভারতীয় অনুরোধ গ্রহণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ভাষ্যমতে, একজন কনস্যুলার কর্মকর্তা যতটুকু দায়মুক্তি অধিকার ভোগ করেন, এটি ছিল তার চেয়েও বেশি।
ওই অনুরোধের বিপরীতে ভারত সরকারের কাছে একটি অনুরোধ করে মার্কিন কর্তৃপক্ষ: দেবযানীর দায়মুক্তির দাবি প্রত্যাহারের অনুরোধ। কিন্তু ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র তাকে দেশ ছাড়তে বলে। ২০১৪ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফেরেন কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়ে।
এর জের ধরে ভারত-মার্কিন সম্পর্কে ব্যাপক তিক্ততার সৃষ্টি হয়। দু’দেশের সম্পর্ক এতটাই খারাপ হয়ে যায় যে, দেবযানীকে গ্রেফতারের পর ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দেয়। দিল্লিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের চারপাশের নিরাপত্তা ব্যারিকেড সরিয়ে নেওয়া হয়। আর ১০ জানুয়ারিই দেবযানীর সম পদমর্যাদার মার্কিন কূটনীতিক ওয়েইন মে’কে বহিস্কার করা হয় ভারত থেকে।

এরপর আবার ভারত সরকার ঘোষণা দেয়, দূতাবাস অঙ্গনে সব ধরনের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। এছাড়া যানবাহন চলাচল বিষয়ক বিধি না মানলে দূতাবাসের গাড়িগুলোকেও শাস্তির মুখে পড়তে হবে। পাশাপাশি মার্কিন দূতাবাস প্রাঙ্গণের ক্লাব বন্ধের নির্দেশও দেয়া হয়। ওই ক্লাবের মধ্যে ছিল রেস্তোরাঁ, সুইমিংপুল ও টেনিস কোর্ট।
২০১৪ সালেরই ২০ ডিসেম্বর দেবযানীকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরিতে থাকলেও তার সুনির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব থাকবে না। কারণ হিসেবে ওই সময় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এর মাঝে দেবযানী অনুমোদন ছাড়া গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং তার সন্তানদের মার্কিন পাসপোর্ট থাকার বিষয়টিও গোপন করেছেন। এ কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান দায়িত্ব থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়।
দেবযানীর মতো বাংলাদেশের কূটনীতিককে গ্রেফতারের পর বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি।









