কাতারের বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করছেন বিশ্বনেতারা। নিষেধাজ্ঞার অমানবিক এবং ক্ষতিকর পরিণতির পাশাপাশি ইয়েমেন শান্তি ইস্যুকে জড়িয়েও কথা বলেছেন তারা।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান কাতারের সঙ্গে আরব দেশগুলোর সম্পর্কচ্ছেদের নিন্দা জানিয়ে একে ‘অমানবিক এবং ইসলামিক মূল্যবোধের বিপরীত’ বলে উল্লেখ করেছেন। উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে চলমান সঙ্কট নিরসনে সৌদি আরবকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে বলে জোর দিয়েছেন তিনি।
তুরস্কের সংসদ অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে মঙ্গলবার তুর্কি প্রেসিডেন্ট এ কথা বলেন। তার মতে, তথ্যপ্রমাণ ছাড়া কাতারকে এভাবে একঘরে করে দেয়া অনেকটা বিনাবিচারে কারও ওপর মৃত্যুদণ্ড চাপিয়ে দেয়ার মতো।
এরদোগান বলেন, তুরস্ক ছাড়া কাতারই জঙ্গি সংগঠন দায়েশ-এর (আইএস) বিরুদ্ধে সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে পেরেছে। কাতারকে এ ধরণের প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডের শিকার বানানো হলে তা কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
কাতারের বিরুদ্ধে যেখানে সৌদি আরবের নেতৃত্বে বাহরাইন, মিশর, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং পরে মালদ্বীপ ও ইয়েমেন জঙ্গিবাদে মদদ দেয়ার অভিযোগ এনে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছে, সেখানে খোদ সৌদির বিরুদ্ধেই জঙ্গি সংগঠনকে সমর্থন দেয়ার অভিযোগ তুলেছে ইরান।
অন্যদিকে ইরানের রাজধানী তেহরানে হওয়া একটি হামলায় জঙ্গি সংগঠন আইএস দায় স্বীকার করার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ বলেন, ‘আমাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে যে, সৌদি আরব ইরানের পূর্বাঞ্চলে বালুচিস্তান প্রদেশে জঙ্গি দলগুলোকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা দিচ্ছে।’
অবশ্য অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ থেকে সরে গিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, সিরিয়ায় চলমান যুদ্ধ থামাতে যে শান্তি আলোচনা চলছে, কাতার নিয়ে উদ্ভূত উপসাগরীয় দ্বন্দ্বে সেই
শান্তি প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজের সঙ্গে ফোনালাপে এ আশঙ্কা প্রকাশ করে কাতার বিরোধী পদক্ষেপ ভেবেচিন্তে নিতে বলেছেন তিনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের কাতার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দু’রকম কথার মাঝে আবার এই ইয়েমেন যুদ্ধ নিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে হয়ে গেল এক ভোটাভুটি। সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্পের ৫শ’ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির চুক্তি খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে মার্কিন সিনেটে পাস হয়েছে।
৫৩-৪৭ ভোটে জিতলেও ওই ৪৭ কূটনীতিকের ভাষ্য ছিল, বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য ৫শ’ মিলিয়ন ডলারের বোমা রিয়াদ ব্যবহার করবে ইয়েমেন যুদ্ধে। এর মধ্য দিয়ে ইয়েমেনে মানবতার আরও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আগুনে ঘি ঢালা হবে বলে মনে করেন তারা।
কিন্তু বিশ্বনেতাদের সমালোচনা এবং একের পর এক দ্বন্দ্ব নিরসনের আহ্বানের পরও সৌদি আরব, বাহরাইন এবং আমিরাত কাতারের জন্য তাদের আকাশসীমা খুলে দিতে রাজি হয়নি। দেশগুলোর এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের দাবি, নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের যে কোনো ঝুঁকি থেকে বাঁচাতেই সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল-ওতাইবা জানিয়েছেন, কাতার ইস্যুতে দেশটির ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হলেও এখন পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের কোনো পরিকল্পনা নেই নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী দেশগুলোর।

সর্বশেষ বুধবার বাহরাইনের মানবাধিকার বিষয়ক অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীকে কাতার ইস্যুতে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিবেশী কাতারের ওপর দেশটির সরকারের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করায় ইস্সা ফারাজ আরহামা আল-বুরশাইদ নামের ওই আইনজীবীকে গ্রেফতার করা হয়। আল-বুরশাইদ বাহরাইনের সিদ্ধান্তকে ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছিলেন।
এর আগে গত ১০ জুন আমিরাত ও বাহরাইন কাতারের প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ‘সহমর্মিতা’ দেখানোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে শাস্তির ঘোষণা দেয়। আমিরাত বলেছিল, এ অপরাধের শাস্তি হিসেবে ১৫ বছর জেল এবং ১ লাখ ৩৬ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে। আর বাহরাইন ৫ বছরের কারাদণ্ডের ঘোষণা দেয়।










