বাংলাদেশ

‘করোনার ছয়মাসেও আমরা অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছি’

বাংলাদেশে করোনার মহামারীর সময় মানুষ মাস্ক পরে বাইরে চলাফেরা করছে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

করোনার সময় বাংলাদেশে বিভিন্ন মানুষ মাস্ক পরে বাইরে চলাফেরা করছে, কিছু মানুষ বসে আছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ছয় মাস পার করছে বাংলাদেশ। প্রথম শনাক্তের ১৮০তম দিনে এসেও বাংলাদেশ অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

তারা বলছেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে সেরো সার্ভিলেন্স (করোনা সমীক্ষা), অঞ্চলভেদে করোনা পরীক্ষার চিরুনী অভিযানসহ তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করতে পারলে অনেকাংশেই করোনা প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ২৫তম সপ্তাহ শেষ হয়েছে গত শনিবার। আশার কথা এই সপ্তাহে নতুন রোগী ও পরীক্ষার তুলনায় শনাক্তের হার কমেছে।

গেলো সপ্তাহে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩০০ জন। তার আগের সপ্তাহেও এই সংখ্যা ছিল ১৮ হাজার ১০০।

আবার সংক্রমণের ২৫তম সপ্তাহে পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ছিল ১৭.৩৪ শতাংশ। এই প্রথম টানা ১২ সপ্তাহ পর এক সপ্তাহে শনাক্তের হার ২০ শতাংশের নিচে ছিল।

করোনার ছয় মাসেও সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে কারও ধারণা নেই
বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাসের পরিস্থিতি কী? জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: “দেশের করোনার সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে কারো পুরো ধারণা নেই। কারণ দেশে যে পরিমাণ জনসংখ্যা, যে পরিমাণ রোগ শনাক্ত হয়েছে, পুরো বিস্তৃতি, গভীরতা, ধরণ, এবং দেশের কোন অঞ্চলে কম, কোন অঞ্চলে বেশি বুঝতে গেলে যতো পরীক্ষা হওয়া দরকার, সেটা হয় নাই। দেশব্যাপী করোনা জরিপ কোথাও করা হয়নি। ফলে করোনা আছে বা নাই এ ব্যাপারে সঠিকভাবে ধারণা দেওয়া সম্ভব না।’’

বাংলাদেশি ব্যক্তি, কালো চুল, গোঁফ ও চশমা পরা, নীল শার্ট পরিহিত. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
ডা. লেলিন চৌধুরী

‘‘এর মাঝেও আমরা দেখতে পাচ্ছি বেশ কিছু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে এবং হাসপাতালে রোগী আছে। জনসাধারণের মধ্যে ভয় নাই, তারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেও না। একটা অবৈজ্ঞানিক ব্যবস্থার মধ্যে আমরা রয়েছি।’’

তিনি বলেন: বিজ্ঞানভিত্তিক অবস্থা হচ্ছে সঠিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা রাখা, ধারণা পরিষ্কার রাখা, ডাটা ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত জানা– সেটা আমাদের নাই। করোনা বাস্তবতার নীরিখে কি কৌশল গ্রহণ করব সেটাও ঠিক করা হয়নি।

ডা. লেলিন চৌধুরীর সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: জুন-জুলাই-আগস্ট মাসে শনাক্তের শতকরা হার ছিল ২০ শতাংশের ওপরে, গত দুই সপ্তাহ ধরে এটা ২০ শতাংশের নীচে আছে।

‘‘বলা যাবে না যে কমেছে, আগামী সময়গুলোতে যদি কমে আসে তাহলে সেটা বলা যাবে। যেমন ঈদুল আযহার আগে কমেছিল, আবার ঈদের পর বেড়েছিল, বর্তমানে দুই সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে কমছে।’’

ঈদুল আযহার সময় সংক্রমণ বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা সত্য করে ঈদের পরের সপ্তাহগুলোতে সংক্রমণ হার বেড়েছিল। এক পর্যায়ে মৃত্যু বাড়বে বলে তাদের সতর্কতার প্রমাণ দেখা গেল গত সপ্তাহে। শনিবার পর্যন্ত এক সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে ২৯৯ জনের।

করোনা প্রতিরোধে চাই তৃণমূলে বিনিয়োগ
দেশে এখন করোনা প্রতিরোধ করতে হলে তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন।

বয়সী পুরুষ ব্যক্তি, চশমা পরা, হালকা পাজামা পরিহিত, হাস্যোজ্জ্বল. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
ডা.মোস্তাক হোসেন

তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করে বা প্রচার প্রচারণা চালিয়ে করোনা প্রতিরোধ করা যাবে না। এখন জনগণকে সম্পৃক্ত করে সরকারী উদ্যোগে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ে বিনিয়োগ করতে হবে।’

‘‘সরকারকে জনগণকে নিয়ে সক্রিয়ভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবার নির্দেশ দিতে হবে। রোগী শনাক্ত করতে হবে, শনাক্ত রোগীকে আইসোলেট করা দরকার, যারা রোগীর সঙ্গে বেশী ঘনিষ্ঠ হবে তাদের কোয়ারেন্টাইন করতে হবে।’’

‘‘সর্বোপরি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, করোনার শুরুতে যেটা তাদের করতে হয়নি। কিন্তু এখন জনগণ জীবিকার জন্য বের হয়। তাই তাদের সরকারী উদ্যোগে স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যবস্থা করতে হবে।’’

দেশে চাই সেরো সার্ভিলেন্স
ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে দেশে করোনাভাইরাস কী পরিমাণে আছে, তার ব্যাপকতা কতটা, এটা বোঝার জন্য সারা দেশে দ্রুত একটা সেরো সার্ভিলেন্স (করোনা সমীক্ষা) করার প্রয়োজন।

‘‘সে অনুযায়ী যে অঞ্চলে করোনার সংক্রমণ বেশী সে অঞ্চলগুলোতে জোর দিতে হবে। কিছু জায়গায় চিরুনি অভিযানের মতো পরীক্ষা করতে পারি। অন্যদিকে জাতীয়ভাবে করোনা পরীক্ষা করানোর জন্য জাতীয়ভাবে টেস্ট করাতে হবে,’’ যোগ করেন তিনি।

‘‘এছাড়াও স্বাস্থ্যবিধি মানা, মাস্ক ব্যবহার করা জনসাধারণকে উৎসাহিত করার জন্য একটা জাতীয় কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। একই সাথে যদি কেউ এটি মেনে না চলে তাহলে শাস্তির ব্যবস্থা করে সেটা মানুষকে জানানো এবং কি শাস্তি দেওয়া হবে সেটার উদাহরণও দিতে হবে,’’ বলেন লেলিন চৌধুরী।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতিদিন কমপক্ষে ২০ হাজার মানুষের পরীক্ষা করে শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নীচে নেমে এলে বলা যাবে, করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে দেশে এখন পর্যন্ত ১৫ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। দেশে মোট আক্রান্ত শনাক্ত ৩ লাখ ১৭ হাজার ৫২৮ জন। মোট পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণ শনাক্তের হার ২০.১৩ শতাংশ।

দেশে করোনাভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ৩৫১, শনাক্ত বিবেচনায় মৃত্যু হার ১.৩৭ শতাংশ। সবমিলিয়ে সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ২ লাখ ১১ হাজার ১৬। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৬৬.৪৬ শতাংশ।

 

বিষয়:করোনাভাইরাস ডা. লেলিন চৌধুরী সেরো সার্ভিলেন্স স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…