মুসলিম কবির কণ্ঠে মা কালীর বন্দনা, সম্প্রীতির বার্তা নজরুলের শ্যামাসংগীতে

ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতা, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। মুসলিম পরিবারে জন্ম নিয়েও দেবী কালীর উদ্দেশে অসংখ্য ভক্তিমূলক গান রচনা করেছেন তিনি। নজরুলের সেই শ্যামাসংগীত আজও বাংলার অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নজরুলের শ্যামাসংগীতের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধর্মীয় পরিচয় যখন বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন নজরুলের গান বহুত্ববাদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
ঔপনিবেশিক শাসন, নিপীড়ন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী লেখনীর জন্য নজরুল ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে পরিচিত। তবে সংগীতেও ছিল তার অসাধারণ প্রতিভা। ইসলামী হামদ-নাত থেকে শুরু করে হিন্দু ধর্মীয় ভজন, কীর্তন ও শ্যামাসংগীত—বিভিন্ন ধারায় সমান দক্ষতায় গান রচনা করেছেন তিনি।
নজরুলের শ্যামাসংগীতে দেবী কালী কখনো শক্তির প্রতীক, কখনো মমতাময়ী মা। ভক্তের ভালোবাসা, অভিমান, আকুলতা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি তার গানে বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। এ ধারার গান রচনায় তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন রামপ্রসাদ সেন ও কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের মতো প্রখ্যাত কবিদের কাছ থেকে। তবে নিজস্ব সাহিত্যিক কল্পনা ও সুরের বৈশিষ্ট্যে শ্যামাসংগীতে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন নজরুল।
তার জনপ্রিয় শ্যামাসংগীতের মধ্যে রয়েছে ‘আমার কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা’, ‘বল রে জবা বল’ এবং ‘শ্মশানে জাগিছে শ্যামা’। এসব গানে দেবী কালীর বিভিন্ন রূপ ও ভক্তির নানা অনুভূতি উঠে এসেছে।
১৯৬৬ সালে প্রকাশিত নজরুলের শ্যামাসংগীতের সংকলন ‘রাঙা জবা’য় তার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গান স্থান পায়। সংকলনটির নামও দেবী কালীর চরণে নিবেদিত লাল জবা ফুলের ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
পরবর্তী সময়ে পন্নালাল ভট্টাচার্য ও ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে নজরুলের শ্যামাসংগীত ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তাদের পরিবেশনায় গানগুলো বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। কালীপূজার সময় এখনো রেডিও, বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত গানের তালিকায় নিয়মিত শোনা যায় এসব গান।
প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় পরিচয় ও উৎসবকে ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনার প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। নৈহাটির বড়মা মন্দিরের পরিচিত স্লোগান ‘ধর্ম যার যার, বড়মা সবার’ পরিবর্তন করে ‘বড়মায়ে ভক্তি, সনাতনে শক্তি’ করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। মন্দির কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, ভক্তদের অনুরোধেই স্লোগান পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই।
এমন প্রেক্ষাপটে নজরুলের শ্যামাসংগীত কেবল ধর্মীয় সংগীত হিসেবে নয়, বরং বাংলার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতির স্মারক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তার সৃষ্টিকর্ম মনে করিয়ে দেয়, শিল্প ও সংস্কৃতির কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় সীমানা নেই। বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত উত্তরাধিকার।






