পর্যটন নগরী কক্সবাজার বেড়াতে এসে এক নারী পর্যটক সঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় মূলহোতারা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি। তবে টুরিস্ট পুলিশ, জেলা পুলিশ ও র্যাব যৌথভাবে তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিষয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে জরুরী সভা হয়েছে। ধর্ষণের শিকার পর্যটক গৃহবধূ ও তার স্বামীকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। ওই নারীকে কক্সবাজার সদর আদালতে হাজির করে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়।
কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি তদন্ত বিপুল চন্দ্র দে জানান, এ ঘটনায় ওই নারীর স্বামী বাদি হয়ে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও তিন জনকে অজ্ঞাত দেখিয়ে ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। যে চারজন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন- আশিক, বাবু, ইসরাফিল ইসলাম জয়া ও রিয়াজ উদ্দিন ছোটন।
সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ মুনীর উল গীয়াস জানান, মামলার সকল কাগজ টুরিস্ট পুলিশকে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। টুরিস্ট পুলিশের ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ রুহুল আমিন মামলাটি তদন্ত করছেন।
টুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার মো. জিল্লুর রহমান জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি খুব গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছেন। দু’য়েকদিনের মধ্যেই এ বিষয়টি পরিষ্কার করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, ধর্ষণের শিকার হওয়া নারী ও তার স্বামীকে পৃথকভাবে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তাদের কাছ থেকে অনেকগুলো তথ্য পাওয়া গেছে, যেগুলো এখন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ওই নারী গত তিন মাস ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছে। তারা অনেকগুলো হোটেলে ছিল। কী কারণে এসব হোটেলে ছিলেন, কক্সবাজারে তাদের আগমনের কারণ, ব্যয়বহুল একটি শহরে কিভাবে কাটিয়েছেন, তাদের সাথে কার কার যোগাযোগ ছিল এসব বিষয়গুলোকে সামনে এনে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে।
জিল্লুর রহমান আরও জানান, শুক্রবার কক্সবাজার সদর আদালতে ধর্ষণের শিকার নারী কে হাজির করে ২২ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। যেহেতু ধর্ষণের শিকার নারী ও তার স্বামীর নিরাপত্তার বিষয় রয়েছে ,সেকারণে দুজনকে আমাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে।
ধর্ষণের শিকার হওয়া নারী তিন মাস ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছে বলে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে বলে দাবি করেছে কক্সবাজার জেলা পুলিশও। ওই নারী কক্সবাজার সদর মডেল থানায় আরও দুইবার অভিযোগ করেছেন গত তিন মাসে।
ওই নারীর বরাত দিয়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, কক্সবাজার শহরের পর্যটন গলফ মাঠ এর সামনে থেকে বুধবার রাতে র্যাব সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে। এরপর কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনের জিয়া গেস্ট ইন নামের রিসোর্টে তকে নিয়ে যাওয়া হয়।
জেলা পুলিশ সুপার বলেন,আসাদিদের গ্রেপ্তার করতে, র্যাব, জেলা পুলিশ, ট্যুারিস্ট পুলিশ সবাই কাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৩ মাস ধরে তারা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। তারা এ পর্যন্ত ৭ টি হোটেলে অবস্থান করার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এরমধ্যে লাইট হাউজ পাড়ার আরমান কটেজে ২ নভেম্বর থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত ছিল। এরপর শিশুর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় যায় ওই দম্পত্তি। তার ৫ দিন পর ফিরে এসে আবার আরমান কটেজে উঠে। সেখানে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল।
হোটেলের ম্যানেজার মো. হাসান বলেন, কিশোরগঞ্জ সদরের পরিচয় দিয়ে ওই নারী ও তার স্বামী দৈনিক ১ হাজার টাকা ভাড়ায় আমাদের কটেজে অনেকদিন ছিল।
৬ ডিসেম্বর ওই দম্পতি আরমান কটেজের বিপরীত দিকের দারুল এহেছান কটেজে ওঠে। তারপরদিন তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ওই হোটেলর মালিক আলি আকবর বলেন, ৬ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে হোটেলের সামনে আশিকের সাথে ওই নারীর স্বামীর কথা কাটাকাকাটি হয়। বিষয়টি আমার নজরে আসলে আমি ওই নারীর স্বামীর কাছে জানতে চাই কী সমস্যা। কিন্তু তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। এই কারণে আমি তাদেরকে আমার হোটেল থেকে বের করে দেই। সেখানে থেকে তারা একটু দূরে অন্য একটি কটেজে উঠে। সেখানেই ছিলেন ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত ।
ওখান থেকে তারা হলিডের মোড়ের সিল্যান্ড হোটেলে উঠে ঘটনার দিন ২২ ডিসেম্বর বিকেল ৩টায়। ওই দিন সন্ধ্যা ৬টায় সেই নারীকে হোটেল সি ক্রাউনের সামনে থেকে সিএনজিতে তুলে আশিক। এরপর সেখান থেকে তাকে মোটেল রোডের সৈকত পোস্ট অফিসের ছেনুয়ারের ঝুপড়ি চায়ের দোকানে নিয়ে যায় সন্ত্রাসী আশিক।
এ বিষয়ে ভিকটিম নারী বলেন, আশিক আমাকে ঝুপড়ি চায়ের দোকানে সিএনজিতে করে নিয়ে গেছেন।
ঝুপড়ি চায়ের দোকানের মালিক ছেনুয়ারা বেগম বলেন, আশিক এক নারীকে সাথে নিয়ে ২২ ডিসেম্বর রাত ৮ টার দিকে আমার এখানে আসেন। এরপর ওই নারীকে দিয়ে তার স্বামীকে ফোন করান। সেসময় ওই নারী তার স্বামীকে মুঠোফোনে বলেন তুমি নাকি আশিক ভাইয়ের সাথে বেয়াদবি করেছে। তুমি এখানে আসো। আমি আছি। আশিক ভাই তোমাকে কিছু করবে না। পরে ওই নারীর স্বামী একটি বাচ্চাকে নিয়ে আমার দোকানে আসে । এরপর আশিক কিছুক্ষণ এখানে অবস্থান করেন। তারপর ওই নারীকে মোটরসাইকেলে নিয়ে চলে যান।
তিনি আরও বলেন, সেদিন আশিক আমার দোকানের একটি দূরে এক কিশোরকে ছুরির ভয় দেখিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয়।
এ বিষয়ে ভিকটিম নারী বলেন, আশিক সেখানে আমাকে ধর্ষণ না করলেও তার বন্ধুরা ঝুপড়ি চায়ের দোকানের পেছনে নিয়ে আমাকে ধর্ষণ করে। পরে আমার স্বামী ও সন্তানকে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে আমাকে মোটরসাইকেলে করে নিয়ে এসে হোটেল মোটেল জোনের জিয়া গেস্ট ইনে আনে। মোটরসাইকেল আশিক চালাচ্ছিল। আর কেউ ছিল না।
জিয়া গেস্ট ইন এর পরিচালক রায়হান বলেন, আশিক ও ওই নারী স্বামী স্ত্রী পরিচয়ে সাবলীলভাবে হোটেল আসে। পরে একটি কক্ষে ৪০ মিনিট অবস্থান করে। তারপর আশিক বেরিয়ে যায়। এরপর আমার হোটেল ম্যানেজার গিয়ে ওই নারীর দরজা খুলে দেয়। তারপর তিনি এখান থেকে চলে যান। এর অনেক পরে ওই নারী ও তার স্বামী র্যাব সহ আমার হোটেলে আসে এবং আমার ম্যানেজারকে আটক করে নিয়ে যায়।
বুধবার রাত দেড়টার দিকে ওই নারীকে উদ্ধার করা হয় বলে কক্সবাজার র্যাব-১৫ এর সিপিসি কমান্ডার মেজর মেহেদী হাসান জানান।










