সাংবাদিকতা শুরু করেছি ২০০৫ সালে। সালমা সোবহান ফেলোশিপ দিয়ে। আমাদের প্রশিক্ষক ছিলেন জাহিদ রেজা নূর, শাহেদ মোহাম্মদ আলী, রোবায়েত ফেরদৌস, মীর মাসরুর জামানসহ পরিচিত বহু গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
টানা এক বছর হাতে-কলমে সংবাদ ও সাংবাদিকতা শিখিয়েছেন তারা। এক বছর ধরেই প্রথম আলোতে আমরা ৩২ জেলার ৩২ জন নারী লিখতাম। শিক্ষকরা শুধরে দিতেন। ছাপার অক্ষরে নিজের নাম প্রথমবারের মতো দেখলাম প্রথম আলোতে, শিরোনাম, ‘ধান থেকে চাল, মাঝে চাতাল কন্যা’, তারিখ ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৫। সেই শুরু, এরপর আর থামতে হয়নি।
মাসে অন্তত চারটা লেখা ছাপা হতো প্রথম আলোতে। এরপর যোগ দিয়েছিলাম দেশবাংলা পত্রিকায়। সেখানেই মূলত বিভিন্ন বিভাগে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলাম আবু তাহের, কাজী রফিক, শামসুল হকসহ অনেককে। সেসময় এই আমিই সম্পাদনা করতাম মহানগরের থানা ভিত্তিক কন্ট্রিবিউটরদের লেখা নিয়ে মহানগর পাতা, যাদের অনেকেই এখন স্বনামখ্যাত। সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলাম সিঁড়ি, আমাদের বিদ্যালয় পাতারও। এছাড়া নিয়মিত পাজল সুডুকু এবং সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর অনুবাদ খুশবন্ত সিং এর সম্পাদনা করেছি দীর্ঘদিন।
২০০৭ এর শেষের দিকে যোগ দেই একুশে টেলিভিশনের ন্যাশনাল ডেস্কে। সরাসরি সিনিয়র হিসেবে পেলাম পলাশ আহসান ভাইকে। সেন্ট্রাল ডেস্কে ছিলেন মজুমদার জুয়েল, শহীদুল ইসলাম রিপন, রাশেদ চৌধুরীসহ আরও অনেকে। ২০০৯ সালের শেষের দিকে একুশে টেলিভিশন ছেড়ে যোগ দিয়েছিলাম যমুনা টেলিভিশনে। শুধু আমি না, আমরা অনেকেই যোগ দিয়েছিলাম যমুনা টিভিতে। অন এয়ারে আসার অপেক্ষায় যমুনাতেই কাটিয়েছি টানা এক বছর। পরে ২০১০ সালে ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ হিসেবে যোগ দেই বৈশাখী টেলিভিশনে।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে বৈশাখী ছাড়তে বাধ্য হই। সে আরেক ইতিহাস, এ ইতিহাস অন্যদিন। এরপর যোগ দেই নতুনমাত্রা.কম, রেডিও ধ্বনি এবং দৈনিক নতুন কাগজে। এখন কাজ করছি একটি সাপ্তাহিক ও অনলাইনে।
তো ২০০৫ সাল থেকে শুরু করে এখন ২০১৮। এক যুগেরও বেশী সময়, অনেক সহকর্মী এবং বহু অভিজ্ঞতা। তিক্ত অভিজ্ঞতাই বেশি। কারণ জানি না। খুব কম স্মৃতি আছে আনন্দের। তবে ভালো মানুষের সাহচর্য নেহায়েত কম নয়।
দেখেছি কিভাবে অল্প সময়ে গাড়ি-বাড়ির মালিক বনে গেছেন বহু সহকর্মী। পদোন্নতি পেয়েছেন। অকারণে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন অনেকেই। অনেকের নেতিবাচক প্রভাবে চাকরি গেছে অনেকের। এই যে ‘নেতিবাচক প্রভাব’-এ কেবল বড় পদে থাকা পুরুষ সহকর্মীরই নয়, নারী সহকর্মীও দিয়েছেন।
দিনের পর দিন কাজ করার অভিজ্ঞতায় এইসব বড় ভাই-বোনদের সম্পর্কে ধারণা আস্তে আস্তে বদলাতে থাকে। কখনো কখনো প্রতিবাদ করেছি, কখনো কখনো করিনি, করতে পারিনি, সয়েছি- গণমাধ্যমের ভাষায় ‘এডজাস্ট’ করেছি। প্রয়োজনীয় সাহসের অভাব, অজ্ঞতা এবং প্রয়োজন (বেঁচে থাকার দায়) বাধ্য করেছে।
সাংবাদিকদের অনেকগুলো সংগঠন। অনেক সুযোগ, অনেক সুবিধা তাতে। সেসব সংগঠনকে এতদিন সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগঠন মনে করে দূরেই ছিলাম। ভাবছিলাম বড় ভাই-বোনদের হাতে নিরাপদ আমাদের অধিকার। অথচ এ ধারণা ভুল। কারণ আমি দেখেছি এই ১২ বছরেরও বেশি সময় পর আমার মতো অনেকেই নিঃস্ব। অথচ আমার পরে সাংবাদিকতা শুরু করে অনেকে অনেক কিছু করে ফেলেছেন।
সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের নামে এই যে বিভিন্ন সংগঠন এসব সংগঠনে নেতৃত্ব দেন কারা? এর উত্তর অনেকের সাথে আমার অভিজ্ঞতাও মিলে যাবার কথা। চোখের সামনে নেতারা অন্যায়গুলো করেছেন। কিছু সাংবাদিক স্বার্থহানীর কারণে প্রতিবাদ করেছেন বটে। তবে আমার মতো ঝামেলামুক্ত থাকার ইচ্ছাপোষণ করা সাংবাদিকের সংখ্যাও নেহায়েত কম নন, তাই তারা দূরেই ছিলেন এবং এখনো দূরেই আছেন।
বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করেন অর্থাৎ যারা এই পেশাটাকে আদর্শ মনে করে সেমতে চর্চা করেন তারা সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম বা আন্দোলনে আসেনই না বললেই চলে। ভোটও দেন না। মাঝে মাঝে অংশ নেন। এর কারণ একটাই, অধিকার আদায়ের নামে স্বার্থ-অর্থ-সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কামড়া-কামড়িতে তারা নেই। আর এই যে না থাকা, এই না থাকার কারণেই মাঠ কিন্তু ফাঁকা। আর এই ফাঁকা মাঠেই গোল দিয়ে দিয়ে আজ অনেকেই নেতা।
এটা আমার উপলব্ধি। সেই উপলব্ধি থেকেই এক বছর আগে থেকেই বলছিলাম, নির্বাচনে অংশ নেবো। আমি মনে করি, আমরা যারা সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, যারা দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা রক্ষায় জীবন বাজী রাখতে রাজি, যারা অন্যায়কে রুখে দেয়ার সাহস রাখি; তাদের উপরই এসব সংগঠন থেকে জঞ্জাল সরানোর দায়িত্ব বর্তায়। আর এ দায়িত্ব কেউ কাউকে দেবেন না। বিশেষ করে স্বাধীনতা বিরোধী শকুনদের তো নয়ই।
সেই সিদ্ধান্ত থেকেই এবারের ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন নির্বাচন ২০১৮-এ অংশ নেয়া। তবে কার সাথে থাকবো-এটি একটি প্রশ্ন ছিলো বটে। এ নিয়েও বেশি জটিলতায় পড়তে হয়নি। জাফর ওয়াজেদ ভাইয়ের মতো ঋদ্ধ মানুষের সাহচর্যে থেকে জ্ঞান আহরণের সুযোগ কে হাতছাড়া করে বলেন? তার আহবানে সাড়া দিতে এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করিনি।
নির্বাচনের অভিজ্ঞতা দুর্দান্ত। দুর্বৃত্তদের সাহস এখন এতো বেড়ে গেছে যে প্রহসনের নির্বাচনেরও আয়োজন করেন তারা! যারা করেন তারা আমাদের সকলের পরিচিত, শ্রদ্ধেয়। অথচ সেই সাংবাদিকতার শুরু থেকেই এই বড় ভাইদেরকেই আদর্শ মনে করেছি, কাউকে কাউকে এখনো করি। তাদের কাছেই নিজেকে নিরাপদ বোধ করেছি। অথচ সময়ের ব্যবধানে তারাই পরিণত হয়েছেন লোভী মানুষে। কেউ অর্থের লোভী, কেউ পদের লোভী, কেউ সুবিধা লোভী।
আমার এই লেখা সেই সিনিয়রদের জন্য নয়, যারা এখনো আদর্শচ্যুত হননি, যাদের কথায়-বলায় এবং চলায় এখনো স্নেহ ঝড়ে। যাদের আশীর্বাদে অন্তর তৃপ্ত হয়। আমার লেখাটা সেই সিনিয়রদের বিপক্ষে যারা আদর্শের লেবাস ধরে সাংবাদিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, করেছেন এবং আগামীতে সাংবাদিকতাকে একটি অনিশ্চিত পেশায় পরিণত করার নেশায় বুঁদ।
আমি আতঙ্কিত, ভীত। আমার আহ্বান থাকবে- আদর্শিক লড়াইয়ে পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। আপনারা আসছেন না বলেই দখল হয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকদের সবগুলো সংগঠন। পরিণত হচ্ছে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। এদের প্রতিহত করতে হবে। দয়া করে কেউ কষ্ট পাবেন না, আমার কষ্টটা একটু অনুধাবন করবেন। একই সাথে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর সমস্যাগুলোকে যারা জঞ্জাল মনে করে দূরে সরে আছেন, তাদের প্রতি অনুরোধ থাকবে আসুন, দলবদ্ধভাবে এসব জঞ্জাল সরাই।
তা না হলে আগামীর প্রজন্মের চোখে আমরা কেউ চোখ রেখে কথা বলতে পারবো না। এ হেন দুর্দশা, সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের এ হেন সংকটে সত্যিই বড্ড অন্তর পোড়ে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








