দাপুটে ব্যাটিংয়ের পর প্রথম ইনিংসে দুর্দান্ত বোলিং ছিল বাংলাদেশের। ২৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে পঞ্চম দিনের মধ্যাহ্ন বিরতির খানিক আগে পাকিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জিং লক্ষ্য ছুঁড়ে দেন নাজমুল হোসেন শান্ত। পরে আগুনঝরা বোলিংয়ে সফরকারীদের ধসিয়ে দেন নাহিদ রানা। ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বার ৫ উইকেট শিকার করেছেন চাপাইনবাবগঞ্চ এক্সপ্রেস। ১০৪ রানের বড় জয়ে সিরিজ শুরু করেছে টিম টাইগার্স। পাকিস্তানের বিপক্ষে টাইগারদের টানা তৃতীয় ও ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় এটি। ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে স্বাগতিকদের ২-০তে হোয়াইটওয়াশ করেছিল লাল-সবুজের দল।
শুক্রবার মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টসে হেরে আগে ব্যাটে নেমেছিল বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৪১৩ রানে অলআউট হন শান্তরা। জবাবে ৩৮৬ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারী দল। ২৭ রানের লিড তুলে দ্বিতীয় ইনিংসে ৭০.৩ ওভারে ৯ উইকেটে ২৪০ রান করে ইনিংস ঘোষণা করে স্বাগতিকরা। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৬৭ রান। লক্ষ্যতাড়ায় নেমে দিনের খেলা ২৩ ওভার বাকি থাকতে ৫২.৫ ওভারে ১৬৩ রানে থামে পাকিস্তানের ইনিংস।
লক্ষ্যতাড়ায় পাঠিয়ে ইনিংসে প্রথম ওভারেই ব্রেক থ্রু এনে দেন তাসকিন আহমেদ। ৫ বলে ২ রান করা ইমাম-উল-হককে লিটনের ক্যাচ বানান তারকা পেসার। ৫৭ রানে দ্বিতীয় সাফল্য আসে। মেহেদী হাসানের মিরাজের মিডল স্টাম্পের উপরের বল হালকা বেরিয়ে যাচ্ছিল, কাট শট খেলতে চেয়েছিলেন আজান আওয়াইস। ব্যাটের সংযোগ না ঘটে সরাসরি অফস্টাম্পে আঘাত হানে। ৩৩ বলে ১৫ রান করে ফেরেন পাকিস্তান ওপেনার।
৬৮ রানে তৃতীয় উইকেট হারায় সফরকারীরা। নাহিদ রানার রাউন্ড দ্য উইকেট থেকে ব্যাক অব আ লেংথের বল, অফ স্টাম্পের পাশ দিয়ে কোনাকুনিভাবে ভেতরে ঢুকলেও লাইনের উপর দিয়ে সোজা চলে যায়। বল শান মাসুদের ব্যাটের বাইরে কানায় লাগে এবং স্টাম্পের পেছনে থাকা লিটন গ্লাভসে লুফে নেন। ২ রান করে যান অধিনায়ক।
একপ্রান্ত আগলে রেখেছিলেন আব্দুল্লাহ ফজল। ৩১.৫ ওভারে ১১৯ রানের সময় তাকে ফেরান তাইজুল। বাঁহাতি স্পিনারের বল অফ স্টাম্পের বাইরের পিচ করে হালকা ইনসুইংয়ে ফজলের প্যাডে আঘাত করে। আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার। পরে রিভিউ নেন শান্ত। লেগ স্টাম্পে আঘাত করছিল বল। ১১ চারে ১১৩ বলে ৬৬ রানে ফেরেন ফজল।
১২১ রানে পঞ্চম উইকেট হারায় পাকিস্তান। তাসকিন আহমেদের ব্যাক লেন্থের ডেলিভারিতে গাালিতে সাদমানের হাতে ক্যাচ দেন সালমান আলি আগা। ৩৯ বলে ২৬ রান করে ফেরেন।
পাকিস্তানের স্কোর ১৫২ রানে ছিল ৫ উইকেট। ১১ রান যোগ করতে বাকি ৫ ব্যাটার হারায় দলটি। বাজিমাতের শুরুটা করেন নাহিদ। ৪৪.৩ ওভারে তার অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করা বল সোজা বেরিয়ে যাচ্ছিল। সৌদ শাকিল আলগা শট খেলতে প্রলুব্ধ হন। ব্যাটারের পায়ের নড়াচড়া একেবারে ছিল না। বল ব্যাটের কানায় লেগে লিটনের গ্লাভসে জমা পড়ে। ১৫ রানে বিদায় নেন শাকিল।
পরের ওভারে ঘণ্টায় ১৪৭ কি.মি. গতির বলে মোহাম্মদ রিজওয়ানের স্টাম্প ভেঙে দেন নাহিদ। ১৫ রান করা রিজওয়ান কিছুটা আড়াআড়ি পা বাড়িয়ে তিনি বল ছেড়ে দিলে মিডল স্টাম্পের ওপরে আঘাত হানে। তাতে জয়ের সুবাস পেতে থাকে বাংলাদেশ। ১ রান যোগ করতেই তাইজুলের বলে লেগ বিফোরে কাটা পড়েন হাসান আলী। রিভিউ নিলেও কাজ হয়নি।
এরপর নোমান আলিকে ফিরিয়ে চতুর্থ সাফল্যের দেখা পান নাহিদ। টাইগার পেসারের ডেলিভারি পায়ের উপর ভর করে খেলছিলেন। বল পেছনের হাঁটুর ওপরের দিকে আঘাত করে। এলবিডব্লিউর আবেদনে সাড়া দেননি আম্পায়ার। রিভিউ নেয় বাংলাদেশ। পরে বল ট্র্যাকিংয়ে দেখা যায় স্টাম্পের ওপরের অংশে আঘাত করছিল। ১৫৮ রানে পাকিস্তানের নবম উইকেটের পতন ঘটে, ৪ রান করে মাঠ ছাড়েন নোমান। শেষ উইকেটেও নাহিদ ঝলকে ১৬০ রানে গুটিয়ে যায় ইনিংস।
৯ ওভার ৫ বল করে দুই মেডেনসহ ৪০ রান খরচায় ৫ উইকেট নেন নাহিদ। তরুণ পেসারের দ্বিতীয় ফাইফার এটি। ২০২৪ সালে কিংস্টনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। তাসকিন ও তাইজুল ২টি করে এবং মিরাজ ১টি উইকেট নেন।
এর আগে ১৭৯ রানের লিড সঙ্গী করে শান্ত ৫৮ এবং মুশফিক ১৬ রানে মঙ্গলবার পঞ্চম দিনের খেলা শুরু করেন। প্রথম বলেই হাসান আলীর বলে অল্পের জন্য টিকে যান মুশফিক। তার ব্যাটের কানায় বল লাগে। স্লিপে থাকা সালমান ঝাপিয়ে পড়েও অল্পের জন্য বলের নাগাল পাননি। পাওয়ায় বল থার্ড ম্যান অঞ্চল দিয়ে সীমানার বাইরে যায়।
মুশফিক অল্পসময় পরই ড্রেসিংরুমের পথ ধরেন। ৩৭ বলে ৪ চারে ২২ রান করে। হাসানের ফুল লেংথ ডেলিভারিতে আক্রমণাত্মক শট খেলতে গিয়ে ড্রাইভের চেষ্টা করেন। মিড অফের উপর দিয়ে মারতে গিয়ে শান মাসুদের তালুবন্দি হন।
এরপর রক্ষণাত্মক ব্যাট করতে থাকা লিটন ২৮ বলে এক চারে ১১ রানে ক্রিজ ছাড়েন। শাহিন শাহ আফ্রিদির শর্ট পিচ ডেলিভারিতে পুল করতে গিয়ে টাইমিং ঠিকঠাক করতে পারেননি। ডিপ ফাইন লেগে থাকা হাসান আলী বাঁদিকে সরে বাউন্ডারি লাইনে হাত বাড়িয়ে বল তালুবন্দি করেন।
২১৬ রানে এলবিডব্লিউ হয়ে সেঞ্চুরির জন্য ১৩ রানের আক্ষেপ নিয়ে মাঠ ছাড়েন নাজমুল হোসেন শান্ত। নোমান আলীর রাউন্ড দ্য উইকেটে করা মিডল স্টাম্পে ফুল লেন্থ ডেলিভারিতে রিভার্স-সুইপ করতে গিয়ে মিস করেন। বল প্যাডে লাগলে আম্পায়ার আউট দেন। রিভিউ নিয়েও রক্ষা পাননি অধিনায়ক, ১৫০ বলে ৭ চারে ৮৭ রানে থামেন। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন, ১০১ রান।
বাংলাদেশের লিড আড়াইশ ছাড়ানোর পর সাজঘরে ফেরেন মেহেদী হাসান মিরাজ, টেস্টে শততম উইকেটের মাইলফলকে পা দেন নোমান আলী। অফ স্টাম্পের খানিক বাইরে বল পিচ করে ঘুরে লাফিয়ে উঠেছিল। মিরাজ রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকেছিলেন। বলের স্পিন ও বাউন্স সামলাতে পারেননি। বল বাতাসে ভাসিয়ে ভেতরে ঢুকে আসার পর বাইরের দিকে টার্ন করে ব্যাটের ওপরের অংশে লাগে। স্লিপে দাঁড়ানো সালমানের হাতে সহজ ক্যাচ তুলে দেন। ৩ চার ও এক ছক্কায় ২৭ বলে ২৪ রান করে যান মিরাজ। খানিক পর তাইজুল ইসলাম ৩ রান করে নোমানের বলে বোল্ড হন।
শেষে তাসকিন আহমেদ ৫ বলে এক চার ও এক ছক্কায় ১১ রান করে লিড আরও বাড়িয়ে নেন। নবম ব্যাটার হিসেবে হাসান আলীর বলে ইমাম-উল-হকের হাতে ধরা পড়া মাত্র বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করে।
দ্বিতীয় ইনিংসে পাকিস্তান বোলারদের মধ্যে হাসান আলি ও নোমান আলি ৩টি করে উইকেট নেন। শাহিন আফ্রিদি দুটি ও মোহাম্মদ আব্বাস নেন একটি করে উইকেট।
এর আগে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান করেন নাজমুল হোসেন শান্ত। ১৩০ বলে ১০১ রান করেন অধিনায়ক। ২০০ বলে ৯১ রান করেন মুমিনুল হক। ১৭৯ বলে ৭১ রান করেন মুশফিকুর রহিম।
প্রথম ইনিংসে পাকিস্তানের মোহাম্মদ আব্বাস ৫ উইকেট নেন। শাহিন আফ্রিদি নেন ৩ উইকেট। হাসান আলি ও নোমান আলি একটি করে উইকেট নেন।
জবাবে পাকিস্তানের হয়ে আজান আওয়াইস ১৬৫ বলে ১০৩ রান করেন। আব্দুল্লাহ ফজল ৬০, মোহাম্মদ রিজওয়ান ৫৯, সালমান আঘা ৫৮ এবং ইমাম উল হক ৪৫ রান করেন।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের মেহেদী হাসান মিরাজ ৫টি, তাসকিন ও তাইজুল ২টি করে উইকেট নিয়েছেন। নাহিদ রানা নেন ১টি উইকেট।








