দেশের প্রতিটি সংসদীয় এলাকায় আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের গণসংযোগ শুরু হয়ে গেছে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বর্তমান এমপিদের মধ্যে কারা মনোনয়ন পেতে পারেন আর কারা হারাতে পারেন দলীয় মনোনয়ন তাদের নামের তালিকাসহ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ছাপা শুরু হয়েছে। পোড় খাওয়া ছাত্র রাজনীতি হতে উঠে আসা ত্যাগী তরুণ নেতৃত্বকে এবার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনোনয়ন দেয়া হবে এমন কথাও আসছে। লবিংবাজ, ব্যবসায়ী নেতৃত্বের সাথে মনোনয়ন যুদ্ধে যারা বারবার হেরে যাচ্ছিলো তারা এবার মনোনয়ন পেতে পারেন।
সংসদ সদস্য পদে দলীয় মনোনয়ন একটি রাজনৈতিক পুরস্কার বটে। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ও নাটক চলচ্চিত্রে স্বীয় কর্মের জন্যই পুরস্কার প্রদান করা হয়। সাহিত্যে অবদান রাখলেই সাহিত্যে পুরস্কার জুটে, সঙ্গীতে অবদান রাখলেই সঙ্গীতে পুরস্কার জুটে। নাটক, চলচ্চিত্রেও তাই। সঙ্গীতের মানুষ বড় ব্যবসায়ী হলে কিংবা আরেকজন নামী সঙ্গীত শিল্পীর সন্তান কিংবা স্ত্রী হলে সেটা পুরস্কার প্রাপ্তির সহায়ক হয়না। কিন্তু রাজনীতিতে এমনটি ঘটে চলেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কাউকে নেতা বানানোর আগে তার পরিবারের খোঁজ নিন। ‘এটা অতি আবশ্যক নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে।’ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রেও এই প্রক্রিয়াটি মেনে চলা উচিত। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের পরিবার জামায়াত- বিএনপি কি না, স্বাধীনতা বিরোধী কি না, বঙ্গবন্ধুর খুনি চক্রের মিত্র কি না এগুলো বিবেচনা করা দরকার। আরও বিবেচনা করা দরকার মনোনয়ন প্রত্যাশীর রাজনৈতিক পথপরিক্রমা, বিভিন্ন সময়ে সক্রিয়তা ও নিস্ক্রিয়তার মূল্যায়ন। সেটা অবশ্যই রাজনৈতিক কর্মপ্রক্রিয়ার ভিত্তিতেই হতে হবে। এখানে তার ব্যবসা বাণিজ্য, অর্থবিত্ত ও পেশি শক্তির মূল্যায়ন হতে হবে পরিত্যাজ্য।
গত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৪ দলীয় জোটভিত্তিক। এ জোটের প্রতীক ছিল নৌকা। ওয়ার্কার্স পাটি ও জাসদের মূল নেতারা নৌকা প্রতীক নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। যদিও এ নিয়ে জোটভূক্ত শরীক দলগুলোতে ভিন্নমতও রয়েছে। তারা চান নিজ নিজ দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে। সেই ভিন্নমতের স্বপক্ষে অনেককেই দেখা গেছে হাতুড়ি (ওয়ার্কার্স পার্টির দলীয় প্রতীক) ও মশাল (জাসদের দলীয় প্রতীক) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে। এসব প্রতীকে দাঁড়িয়ে কয়েকজন জয়লাভ করে সাংসদও হয়েছেন। ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন। সেই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কারণ এই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ নেয়ার সম্ভাবনা আছে।
তাই ১৪ দল শরীকদের নির্বাচনী প্রতীকের বিষয়টারও সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ফয়সালা করা দরকার। সেটা হতে পারে নিজ নিজ দলীয় প্রতীক ও জোটগত একক সমর্থনভিত্তিক।অর্থাৎ যে আসনে যে দল মনোনয়ন পাবে সে দলের প্রতীকই থাকবে তবে সেখানে অন্য শরীক দল দাঁড়াবে না। সবাই মনোনয়নপ্রাপ্ত দলকে, তার প্রার্থী ও প্রতীককে সমর্থন জানাবে। নির্বাচনের আগেই কোন আসনে কোন দল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তা জোট শরীকদের বসে ঠিক করা উচিত। আর যদি নিজ নিজ দলীয় প্রতীক না রেখে জোটের একক প্রতীকের সিদ্ধান্ত হয় সেটাও নির্ধারিত হবে জোট শরীকদের সকলের মতের ভিত্তিতে।
বরাবর দেখি প্রতি দলই কেবল নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েই ব্যস্ত থাকে। আর আওয়ামী লীগ বড় দল বিধায় তাদের প্রার্থী মনোনয়নে শরীকদের মতামত উপেক্ষা করে। এ নিয়ে জোটে নিরব ক্ষোভও জন্ম নেয়। সে ক্ষোভেই হয়তো অনেককে দেখা যায় নিজস্ব দলীয় প্রতীক নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে। এবারে এমন বিশৃঙ্খল রীতি কাম্য নয়। মনোনয়ন চূড়ান্ত হতে হবে রাজনৈতিক নীতিনৈতিকতা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে। দল ও জোট শরীকদের সর্বসম্মত ভূমিকাতেই তা চূড়ান্ত হতে হবে। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দলের সুদিন দুর্দিনের ভূমিকা সবার আগে মূল্যায়ন করতে হবে।
দলে হাইব্রিড, মৌসুমী পাখি, কাউয়া ও ফার্মের মুরগী বিশেষণের নেতার উপস্থিতি দলের সাধারণ সম্পাদক অনেক আগেই স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু তাদের ব্যাপারে নূন্যতম কোন সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। হয়তো আসন্ন মনোনয়ন যুদ্ধেও তারা আটঘাঁট বেঁধে হাজির হবে। এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে রাজনীতিকে ও অতীত আমলনামাকে মনোনয়নের মূল মানদণ্ড হিসাবে দাঁড় করিয়ে।
১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ জন সাংসদ বিনাভোটে ও বিনাখরচে সংসদ সদস্য হয়ে গেছেন। এই উদাহরণটি প্রার্থীর নিকট ভোটারের গুরুত্বও হ্রাস করেছে। হয়তো এবারও তারা দলীয় প্রতীক নিতে চাইবে। মনোনয়ন দেয়ার আগে তাদের সাংসদকালীন আমলনামার পর্যালোচনা আবশ্যক। তাদের অনেকেই জনগণকে পাত্তা না দিয়ে নিজ নিজ কর্তৃত্ব ও আধিপত্যের সিন্ডিকেট নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন। চোখ, কান খোলা রেখে রাজনীতিকে রাজনৈতিকভাবে মূল্যায়ন করে এবারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে হবে।১০ম সংসদে যেভাবে খুব সহজে সাংসদ হওয়া গেছে এবারও সেভাবে হয়ে যাবেন এমনটি ভাবলে তা হবে বোকার স্বর্গে বসবাস। অতএব, সময় থাকতে সাধু সাবধান।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)









