সাবেক সিনিয়র সচিব ও লেখক ডক্টর রণজিৎ কুমার বিশ্বাসের(৬২) আকস্মিক প্রয়াণে তাকে স্মরণ করে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রবাসী ক্রীড়া বিশ্লেষক ফরহাদ টিটো। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রণজিৎ দা’র কাছে তিনি ক্ষমা চেয়ে লিখেন, এভাবে, এমনভাবে কোনোদিনও চাইনি আপনাকে দেখতে ! কোনোদিনও চাইনি আপনাকে নিয়ে এমন লেখা লিখতে !
“আমার দেখা সেরা ক্রিকেট সাহিত্যিক, ক্রিকেট লেখায় আমার প্রথম অনুপ্রেরণা” শিরোনামে ফরহাদ টিটো লিখেছেন,
“রণজিৎ বিশ্বাস-ই আমার মতে বাংলাদেশে সর্বকাল সেরা ক্রিকেট সাহিত্যিক । তাঁর লেখা পড়েই আমার ক্রিকেট সাহিত্য পাঠ শুরু । তাঁর লেখা পড়ে পড়েই ‘আমিও একদিন ক্রিকেট নিয়ে লিখবো’ ‘আমিও একদিন ক্রীড়ালেখক হবো’-এই স্বপ্ন দেখা শুরু ।
তারপর সাংবাদিকতার ছায়ায় অল্পবিস্তর যতটুকু লেখালেখি করেছি জীবনে, সবকিছুর মূলেই ছিলো রণজিৎ বিশ্বাসের সেই সব যাদুকরী লেখার প্রভাব ।
মহান ক্রিকেট লেখক রণজিৎ বিশ্বাস, আমার প্রিয়-শ্রদ্ধেয় “রণজিৎ দা” চলে গেলেন সবাইকে ছেড়ে । সাত-আট ঘন্টা ইন্টারনেটে ছিলাম না বলে খবরটা জানতে পারি অনেক পরে । তাঁকে নিয়ে দেখি ফেইসবুকের পাতা ভরে গেছে লেখায় লেখায় । “RIP” কলে ছেয়ে গেছে অনেক স্ট্যাটাসের আদ্যোপান্ত । আমার সমসাময়িক বা কিছু পরের সাংবাদিকদের কয়েকজন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাও প্রকাশ করেছেন স্মৃতিচারণ করে, রণজিৎ দা’র সংগে অতীতে তোলা তাদের ছবি ছেপে ।
প্রায় সবার লেখাতেই সিনিয়র সচিব, প্রখ্যাত ক্রীড়া লেখক, ক্রীড়া বিশ্লেষক, কলামিস্ট, রম্যলেখক, ভাষ্যকার রণজিৎ বিশ্বাস উঠে এসেছেন ।
অথচ আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে নব্বুইর শুরু তিনি ছিলেন কেবলই একজন ক্রিকেট লেখক (সচিবালয়ে চাকরি করতেন তখনো)। তখনকার দেশসেরা পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের সহযোগী ম্যাগাজিন সাপ্তাহিক রোববারের নিয়মিত ক্রীড়ালেখক । ক্রীড়া লেখক বলতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়েই লিখতেন তিনি । তাঁর সংগে ছিলেন সৈয়দ শহীদ নামের আরেকজন প্রতিভাবান লেখক যিনি শুধু ক্রিকেট না অন্যসব খেলা নিয়ে তথ্য নির্ভর প্রতিবেদন লিখতেন একই সাপ্তাহিকে ।
আমার সৌভাগ্য আমার ছাত্রজীবনে এবং সাংবাদিকতার এক বছরের মধ্যেই রণজিৎ বিশ্বাসের খুব কাছে যাওয়ার সুযোগ এসে গিয়েছিলো । আমার স্পোর্টস রিপোর্টার জীবনের শুরু যে সাপ্তাহিক (বিচিন্তা) দিয়ে হয়েছিলো তা অকস্মাৎ বন্ধ হয়ে গেলে (এরশাদ সরকারের নিপীড়ক সিদ্ধান্তে) রোববারে কন্ট্রিবিউট করতে শুরু করি আতাহার ভাইর অনুরোধে । আতাহার খান তখন ঐ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক, রফিক আজাদ মূল সম্পাদক । ‘৮৮ সালের কথা এটা । আগে যেমন বলেছি, রণজিৎ দা’ তখন প্রতিষ্ঠিত এবং নিয়মিত লেখক ওখানে । সেই সুবাদে তখনই পরিচয়, জানাশোনা আর ঘনিষ্ঠতা তাঁর সংগে ।
সত্যি বলতে কী, যাঁর লেখা পড়ার জন্যই প্রতি সপ্তায় রোববার প্রকাশের প্রহর গুনতাম..
তাঁরই সাহচর্য পাওয়া, তাঁর লেখার পাশে লিখতে পারা.. অপার আনন্দ আর গৌরব বয়ে এনেছিলো আমার জীবনে ।
সাপ্তাহিক রোববারেও বেশি মাস থাকা হয়নি আমার । কারন এটিও বন্ধ করে দিয়েছিলো এরশাদ প্রশাসন । সে কারনে রণজিৎ বিশ্বাসকেও কাগজছুট হয়ে পড়তে হয়েছিলো কিছুদিনের জন্য ।
এরপর থেকে রণজিৎ দা’র সংগে খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ হতো না । যা হতো তা মূলত: বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির অনুষ্ঠানে । সেখানে আসতেন তিনি । হঠাত হঠাত আমাদের পত্রিকা (দৈনিক) অফিসেও ঢুঁ মারতেন । পরম স্নেহে কথা বলতেন, আমার কাজের মনখোলা প্রশংসা করতেন । অতি উঁচু মাপের ভদ্রলোক আর বিনয়ী মানুষ ছিলেন রণজিৎ দা ‘। কোনোদিন তাঁকে বলতে শুনিনি “আমার ঐ লেখাটা পড়েছেন ? ” অথবা ” আমি তো অনেক বছর ধরে ক্রিকেট নিয়ে লিখছি “।
রণজিৎ দা’র সংগে দেখা-কথা হয়নি অনেক বছর । তাঁর ছবিও দেখিনি অনেক বছর । অথচ আজ ফেইসবুকে, পত্রিকা-পোর্টালের ফ্রেমে দেখা হয়ে গেল তাঁর অনেকগুলো ছবি !
ক্ষমা করবেন রণজিৎ দা..এভাবে, এমনভাবে কোনোদিনও চাইনি আপনাকে দেখতে !
কোনোদিনও চাইনি আপনাকে নিয়ে এমন লেখা লিখতে !”










