ভাল কাজের প্রশংসা আর মন্দ কাজের নিন্দা জগতের ললাটলিপি । প্রশংসা পেলে খুশিতে অতি গদগদ আর নিন্দা পেলে রাগে অতি গরগর করাটা কখনোই শোভন হয় না। এই নিরিখে অতি সম্প্রতি দেশে এবং বিদেশে সংঘটিত কতিপয় বিষয় দেখা যাক।
বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ঈদুল আজহা উৎসব উদযাপিত হলো নানাভাবে। উদযাপনের শ্রেণভাগ রয়েছে। অতি উচ্চ এবং উচ্চবিত্তের ঈদ দেখার সুযোগ দেশে বিদেশে কোথাও সাধারণের নেই। ছোট্ট একটি মানচিত্র দিয়ে ওরা নিজেদের মাপে না, আবদ্ধ করে রাখে না। প্রকৃত অর্থে ওরাই আন্তর্জাতিক। ওরা কখন কোথায় ছুটে বেড়ায়, কখন কোথায় প্রমোদে হারিয়ে যায়! সংখ্যায় অবশ্য ওরা গৌণ। তবে পৃথিবীর প্রায় সব অর্থবিত্তই ওই ধরণের টাইকুনদের হাতে। আবার পৃথিবীর বড় বড় অনর্থই ওরা ঘটিয়ে চলছে ।
বাংলাদেশে ঈদ আসলে আম মধ্যবিত্ত আর নিম্ন বিত্তের। গ্রামের সঙ্গে মানুষের শিকড়ের টান কতো প্রবল, ঈদ আমাদের তা বুঝিয়ে দেয়। কমলাপুর রেল স্টেশনে সারারাত লাইনে দাঁড়িয়ে সকালে একটি টিকিট কেনার সুযোগ পাওয়াটা যেন বিশাল এক অর্জন, সে কি সাফল্য আর পরিতৃপ্তির হাসি। এমন দৃশ্য পৃথিবীতে আর কোথাও দেখিনি। জীবিকার জন্য নগর-রাজধানী, আর উৎসবের জন্য আপনজনের সাথে উৎস-গ্রাম।
উৎসবে একসাথে হবার জন্য কতো কষ্ট কতো ঝুঁকি মানুষের। যার যেরকম সাধ্যই থাকুক, আত্মত্যাগের কোরবানিতে ভাগাভাগি করেই অংশ নেয় বাংলার অধিকাংশ মানুষ। মনের তাগিদে, বাস্তব প্রয়োজনে তারা ‘যৌথ’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। জোর করে চাপিয়ে দিয়ে জবরদস্তির যে ‘যৌথতার’ কার্যক্রম পৃথিবী দেখেছে , তা কেন মানুষের মন জয় করেনি, সেটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পণ্ডিতেরা আজো তেমন ভাবছেন তার প্রমাণ দেখছি না।
একসময় দেশের বিপুল অতি গরীব মানুষগুলোর বাৎসরিক আমিষ প্রাপ্তির বড় উপলক্ষ ছিল এই কোরবানির ঈদ। তখন হাজারে হাজারে গরীবেরা পাগল হয়ে কোরবানির গোশত সংগ্রহ করতো জরাজীর্ণ পোশাকে। দুয়ারে দুয়ারে ধাক্কা গুঁতা খেয়ে। এবারও দেখলাম গোশত প্রার্থীর সংখ্যা অঢেল, তবে ওদের পোশাকের মান আগের চেয়ে ভাল। আহা যদি দেখতে পেতাম এদেশে ঈদের দিনে গোশত-ভিক্ষুক আর নেই, তেমন দিন আসতে কতো দেরী?
পথ দুর্ঘটনাতো সারা বছর লেগেই আছে। উৎসবের সময়েতো আরো বেশি। তবে এখনও সান্তনা, বড় ট্র্যাজেডি ঘটেনি। একই সময়ে পৃথিবীর কয়েকটি প্রান্তরে বিশেষতঃ সিরিয়ার মানুষেরা কী অভাবনীয় দুর্গতির ভেতর বনে বাদাড়ে, পাহাড় পর্বতে, সমুদ্রে, সীমান্তে সীমান্তে কুকুর বিড়ালের মতো তাড়া খেয়ে খেয়ে পথ চলছে, বেধড়ক মরছে। ইসলামি উম্মার ধনী কুবেরের দেশেও ওদের ঠাঁই মিলছে না। সৌদি শাসকেরা বলেছে, জার্মানি, তোমার দেশে আশ্রয় প্রার্থী সিরীয় শরণার্থীদের জন্য দু শত মসজিদ বানিয়ে দেবো। এক্ষেত্রে যে মন্তব্য প্রতিক্রিয়াটি কি-বোর্ডে চলে আসছে, তা প্রকাশ করছি না আইসিটি ৫৭ নামক একটি অবিবেচনাপ্রসূত খাড়ার ভয়ে। তবে সৌদি বাদশা পশ্চিমের একটি দেশে সাম্প্রতিক সফরে যেভাবে বিশেষ হোটেলের পুরোটা বেশ কয়েক দিনের জন্য ভাড়া করে লক্ষ লক্ষ ডলার অপচয় করেছেন, তাতে ধর্মীয় বাণী অপচয়কারীরা কিসের ভাই, তা মনে পড়ে যাওয়ায় হে প্রশাসন হাতে কড়া পরাবেন নাতো!
একটি পরিবারের হাতে সৌদি বাদশাহী মহা অগণতান্ত্রিক শাসন। ‘গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মহান সংগ্রামে’ আমাদের বিএনপি-জামায়াত জোট-ঘোঁট আবার অমন সৌদি নোটেরই অপেক্ষায় থাকে। এসব মস্করা-গণতন্ত্রের সংগ্রামের কথা একপাশে রেখে আমরা আজ বরং এবারের হজ-ট্র্যাজেডি নিয়ে কিছু কথা বলি।
প্রতি বছর সময় করে টেলি পর্দায় আরাফাতের হজ সম্মিলনী দেখি। এতো বিশাল জমায়েতের আইন শৃংখলা নিরাপত্তার দিকটা কেমন করে আয়োজিত হয়, সেটার দিকে বিশেষ নজর রাখি। ভয় হয়, কখন না জানি কি ঘটে যায় এই মহাভিড়ে! আমাদের দেশের বিশাল জমায়েতের ইস্তেমা নিয়েও একই শংকা হয়।
এবার প্রথমে মসজিদুল হারামে মুসল্লিদের উপর হঠাৎ এক ক্রেন এসে পড়ে । কাবা শরীফঘেরা ওই মসজিদ বর্ধিতকরণের নির্মাণ কাজ চলমান। বিন লাদেন কোম্পানি ওই কাজ পেয়েছে। শত শত পুণ্যার্থী এতে হতাহত হন। সৌদি সরকার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা দেয়। হজ্বব্রত পালনের কাজ এগিয়ে চলে।
এদিকে হঠাৎ এক বজ্রপাতসম মহাবিপাকের খবর ছড়িয়ে পড়ে দুনিয়াময়। হজব্রত পালনের এক বিশেষ কর্তব্য হচ্ছে মক্কার অদূরে মিনায় প্রতীকী শয়তানের উপর ঘৃণার প্রতীক ঢিল ছুঁড়ে মারা। আমার বড় ভাই বছর কয়েক আগে হজব্রত পালন করেছেন। তিনি স্বীয় অভিজ্ঞতায় বলেছেন, মিনার ওখানে গিয়ে বিশাল ভিড়েও পূণ্যার্থীরা, বিশেষতঃ আফ্রিকা আর তুরস্কের কমবয়সীরা শারীরিক শক্তি আর উন্মাদনায় অন্যদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে এগিয়ে যায়। অনেকেই এদিক সেদিক পড়ে যায়। ভাইও পড়ে গিয়েছিলেন সেখানে। নব্বইয়ের দশকে আমার আব্বাও পড়ে গিয়েছিলেন মিনায়। সেই মিনায় এবার ঘটে গেছে এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। ভিড়ে পদদলনে মারা গেছেন শত শত। খবর মিলছে না হাজার জনের। দেশে ফেরা একজন হাজী বললেন, তার কাছে মনে হয়েছে কেয়ামতের মতো। এমনটা হলো কেনো?
প্রবল ভিড় বরাবরের মতোই। কিন্তু তীব্র গরম। পানি ছিটানোর ব্যবস্থা ছিল না। পানির অভাবে সেই কারবালাসম পরিস্থিতি। হঠাৎ ভিড়ের চাপে মুহূর্তে ঘটে গেল এমন মহাদুর্যোগ। এমনি ভিড়ের চাপ বেড়ে যাবার কারণ হিসাবে পরে জানা গেল সৌদি নব বাদ্শা সালমানের যুবরাজ ছেলে বিন সালমান একই সময়ে রাজকার্যে যাচ্ছিলেন মিনার কাছ দিয়ে । সেজন্য মিনা অভিমুখী দুটি সড়ক হঠাৎ বন্ধ করে দেয়াতেই এই বিপত্তি। নতুন যুবরাজ ক্ষমতা পাবার পর সে ক্ষমতার প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিপত্তির দাপটে সেদেশ এখন অস্থির। তারই হুলস্থুলি প্রকাশে এমনটা ঘটে গেল। এই ব্যাখ্যা যদি সত্য হয়, সৌদি একজন ঊঁচুমাপের আলেম স্বয়ং যে ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত, তাহলেতো এটি গণহত্যাসম অপরাধেরই সমতুল্য।
তবে সৌদি সরকারের একজনকে পেয়েছে বাংলাদেশী আলতাফী ভূতে। পটুয়াখালির আসমানি পাহলোয়ান আলতাফ মিয়া যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন, তখন সন্ত্রাসীদের গুলিতে একটি শিশু মারা গেলে অকুস্থলে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ্ নিয়ে গেছেন, দুঃখ করে আর কি হবে ! সৌদি বাদশাহি কর্তাও একপ্রকার আলতাফি ভাষাতেই বলেছেন, যা ঘটেছে আল্লাহ’র ইচ্ছাতেই ! তবে সৌদি আলেম বলেছেন, ওকথা বলে দায়িত্ব থেকে পার পাওয়া যাবে না।
সৌদি শত্রু ইরানই শুধু নয়, বিশ্ব জুড়েই সর্বপ্রকার মিডিয়াতে, বাংলাদেশে ফেরৎ হাজীদের প্রত্যক্ষ বিবরণীতে সৌদি অব্যবস্থাপনার অভিযোগ জোরেশোরে উঠেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষ এসবকে ‘রাজনীতিকরণ’ বলে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছে। একইসঙ্গে পুরোনো কথা নতুন করে উঠেছে, সৌদি আরবের একটি বংশ কিংবা পরিবারের উপর কাবা শরীফ এবং হজকার্য সমাধার দায়িত্ব পালনের এই পর্ব আর কতোকাল? এই সুবাদে ইসলামি উম্মাহর অঘোষিত এক নম্বর মুরুব্বী হিসাবে আর কতোকাল? মার্কিনি মদদে মাতব্বরীর এই তৃপ্তি ঢেঁকুর আর কতোকাল? কাবা শরীফের যৌথ রক্ষণাবেক্ষনের নতুন কাঠামোর দাবী এখন জোরদার হয়ে উঠবে বৈকি !
দুর্ঘটনাউত্তর সৌদি ব্যবস্থাপনা নিয়েও লাশের অবমাননার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব কিছুর প্রকৃত সত্য যাচাইয়ে ইসলামি উম্মাহর পক্ষ থেকে একটি উচ্চ ক্ষমতা ও নখদন্তসম্পন্ন তদন্ত কমিটিরও দাবি উঠেছে বিক্ষিপ্তভাবে।
পরিশেষে ফিরে আসি দেশে। আমাদের প্রিয় সন্তানদের একটি দল ঈদের দিনেও উৎসব করেনি, করতে পারেনি। এবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র যে ফাঁস হয়েছে তা র্যাবের গ্রেপ্তারি অভিযানের মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে। অথচ আমাদের অতি স্মার্ট স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ফাঁস অভিযোগ অস্বীকার অগ্রাহ্য করে তড়িঘড়ি ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের এখন প্রবল ক্ষোভ, গভীর হতাশা। এই জটিলতার সুরাহা কী ?
হে সরকারি কর্তৃপক্ষ ক্ষেপে যাবেন না। মক্কাতে হোক আর ঢাকাতে হোক, প্রশ্ন উঠবেই। প্রশ্নের সঠিক উত্তর না দিয়ে গোঁজামিলে পরিস্থিতি বরং জটিল হয়েই উঠবে।
ভালো কাজের প্রশংসা আর মন্দ কাজের নিন্দা যে জগতেরই ললাটলিপি।







