বাংলাদেশের নতুন সরকারের সামনে পথ ‘অত্যন্ত কঠিন’ এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে দেশে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের নতুন সরকার কাজে নেমে পড়েছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনে আইসিজি বলেছে, নির্বাচনের পরবর্তী এই শুরুর সময়টিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত অর্থনীতি, সুশাসন ও নিরাপত্তা খাতে সংস্কার শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তুলনামূলক শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক ভোটারের অংশগ্রহণ ছিল। এর মধ্য দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর সরকারের পতনের পর দীর্ঘ অন্তর্বর্তী শাসনের অবসান ঘটে। তবে নতুন সরকারকে এখন অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা মোকাবেলার মতো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
আইসিজি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় এসে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র উচিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো পর্যালোচনা করা।
দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইসিজি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত করা রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় মনে হলেও বাস্তবে তা অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে। দলটির পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সজীব ওয়াজেদ জয়-এর মতো সম্ভাব্য উত্তরসূরি সামনে এলে দলটির সমর্থকদের জন্য পরিবর্তন মেনে নেওয়া সহজ হতে পারে। তবে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য দায় স্বীকার করাও জরুরি।
আইসিজি বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছিল একটি বড় অভিযোগ। নতুন সরকারের জন্য এটি পুনরুদ্ধার করা বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ মনে করছে, সরকারের সামনে একটি সীমিত সময়ের সুযোগ রয়েছে, এই সময়ের মধ্যেই কার্যকর সংস্কার পদক্ষেপ নিয়ে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে না পারলে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আবারও তীব্র হয়ে উঠতে পারে।








