২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি পদে বসেন কাজী সালাউদ্দিন। তাকে ঘিরে স্বপ্নের ফানুসও উড়েছিল। শুরুটা ভালোই হয়েছিল। দেশের মৃতপ্রায় ফুটবলে অনেক বড় স্পন্সর এসেছিল তার টানে। খেই হারিয়ে বসতেও সময় লাগেনি। চার মেয়াদে টানা ১৬ বছর বাফুফে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন সমানতালে। কিছু সাফল্য পেলেও ব্যর্থতা আর বিতর্কের পাল্লা ভারী রেখে বাফুফে সভাপতি পদে এবার আর নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন কৃতি এ সাবেক ফুটবলার।
সভাপতি পদ থেকে কাজী সালাউদ্দিনের পদত্যাগের দাবি উঠেছিল বিভিন্ন সময়েই। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তা আরও জোরাল হয়। তখন বাফুফের আসন্ন নির্বাচনে সভাপতি পদে পুনরায় লড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন সালাউদ্দিন। সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে গেছেন শনিবার। আগামী ২৬ অক্টোবর বাফুফের পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না তিনি। তাতে বর্তমান মেয়াদ শেষে বাফুফেতে ১৬ বছরের রাজত্ব শেষ হচ্ছে সালাউদ্দিনের।
১৯৮৪ সালে ফুটবলার হিসেবে অবসর নেন লাল-সবুজদের কিংবদন্তি সালাউদ্দিন। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন কোচিংয়ে। আবাহনী, জাতীয় দল, মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া চক্রে কোচিং করিয়েছেন। পরবর্তী ৯ বছর ফুটবল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ২০০৩ সালে বাফুফে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। জাতীয় দল কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন সভাপতি এসএ সুলতানের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সহ-সভাপতি থেকে পদত্যাগ করেন। পরে ২০০৮ সালে সভাপতি পদে নির্বাচন করেন সালাউদ্দিন।
সেবার আমিন আহমেদ চৌধুরীকে ভোটে হারিয়ে প্রথমবার বাফুফে সভাপতি হন। ২০০৮ সালের ২৮ এপ্রিল প্রথম দফায় সভাপতির চেয়ারে বসেন সালাউদ্দিন। এরপর চমক দেখাতে শুরু করেন। জাতীয় দলের স্পন্সর হিসেবে আনেন টেলিকম কোম্পানি সিটিসেলকে। ২০০৯ সালে সুপার কাপ আয়োজনে সফল হয়েছিলেন। পরের বছর এসএ গেমসে স্বর্ণ জিতে নেয় বাংলাদেশ। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল আসে ঢাকায়। নাইজেরিয়ার সঙ্গে প্রীতি ম্যাচ খেলে। চমক দেখিয়ে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন সালাউদ্দিন। ২০১২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি নির্বাচিত হন।
২০১৬ সালের নির্বাচনে অবশ্য কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন সালাউদ্দিন। প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন। তবে কামরুল আশরাফ খানকে হারিয়ে তৃতীয়বার বাফুফে সভাপতির পদে বসে যান। ২০২০ সালে চতুর্থ দফায় নির্বাচনে সাবেক ফুটবলার বাদল রায় ও কোচ শফিকুল ইসলাম মানিককে হারিয়ে সিংহাসন ধরে রাখেন তিনি।
সালাউদ্দিনের ১৬ বছরের আমলে ছেলেদের ফুটবলে খুব একটা উন্নতি হয়নি। প্রথম দফায় তিনি যখন চেয়ারে বসেন, ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮০তে। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৪তে। ১৬ বছরে মাত্র চার ধাপ নিচে নেমেছে, চিত্রটা এমন দেখালেও ২০১৭ সালে ১৯৭তে নেমেছিল বাংলাদেশ। সালাউদ্দিনের আমলে আটবার সাফ খেলেছে বাংলাদেশ। সর্বোচ্চ সাফল্য সেমিফাইনালে দুবার, ২০০৯ ও ২০২৩ সালে। গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নিয়েছে পাঁচবার।
প্রথমদফায় সালাউদ্দিন বাফুফে সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর এপর্যন্ত সবধরনের প্রতিযোগিতামূলক ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দল খেলেছে ১২৮ ম্যাচ। ৩৩টি জয়ের বিপরীতে ৬১ ম্যাচে হেরেছে লাল-সবুজের দল। ড্র করেছে ৩৪ ম্যাচে। অবশ্য অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে একবার শিরোপা এসেছে বাংলাদেশে। গতমাসে নেপালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে লাল-সবুজের দল।
মেয়েদের ফুটবলে স্বস্তিদায়ক ফলাফল এসেছে সালাউদ্দিনের আমলে। বেশকিছু সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশের মেয়েরা। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে খেলেছে। সাফে বয়সভিত্তিক (অনূর্ধ্ব-১৬ ও অনূর্ধ্ব-১৯) টুর্নামেন্টে সাফল্য রয়েছে। জাতীয় দলের শিরোপাও এসেছে একবার। ২০২২ সালে নেপালে ভারতকে হারিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়ন হন সাবিনা খাতুনরা।
ছেলেদের জাতীয় দলের জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করেছেন সালাউদ্দিন। দীর্ঘমেয়াদী অনুশীলন, বিদেশে ক্যাম্প, বিদেশি কোচ, সবই দিয়েছেন। তবে সাফল্য আসেনি। খেলোয়াড়দের মানগত সীমাবদ্ধতা উত্তরণে বাফুফে ঠিকঠাক কাজ করেনি। ছিল না ফুটবল একাডেমিও। একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ একাডেমির প্রতিশ্রুতি দিয়ে পূরণ করতে পারেননি সালাউদ্দিন। কয়েকদফা একাডেমি উদ্বোধন করে কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে। সর্বশেষ কমলাপুরে এলিট একাডেমিতে গত দুবছর ৪০-৫০ জন ফুটবলার নিয়মিত আবাসিক ক্যাম্প করছে।
গত সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলেছেন সালাউদ্দিন। তবে ফুটবলের জন্য একটা নিজস্ব স্টেডিয়াম তৈরি করাতে পারেননি। সংস্কারের নামে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম খেলাহীন পড়ে আছে তিন বছর ধরে। সারাদেশে বিভাগভিত্তিক ফুটবল সেন্টার করার কথাও রাখতে পারেননি। ফিফার অর্থায়নে ট্রেনিং সেন্টার করা যায়নি এখনো। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার থেকে দুটির বেশি পূর্ণাঙ্গ টার্ফ আনতে পারেননি। সে দুটিও নষ্ট হয়ে গেছে।
নিচের লিগগুলোর দিকে খুব একটা নজর দেয়া হয়নি সালাউদ্দিনের। জেলা লিগগুলো অনিয়মিত। ঢাকার পাশের জেলা নায়ায়ণগঞ্জে ছয় বছর ধরে ফুটবল লিগ হয় না। সারাদেশে ফুটবল জাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাফুফের জেলা লিগ কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন সালাউদ্দিন। কিন্তু দুবছরে কোনো সভা হয়নি কমিটির।
সালাউদ্দিনের মেয়াদে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বারবার। বাফুফের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তদন্ত করে শাস্তিও দিয়েছে ফিফা। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে গতবছর এপ্রিলে বাফুফের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে দুবছর নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। পদত্যাগ করা সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদীকে ১৩ লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা ও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। অর্থ কর্মকর্তা আবু হোসেন, অপারেশন্স ম্যানেজার মিজানকে নিষিদ্ধ করেছে ফিফা। সালাউদ্দিনের গায়ে দুর্নীতির কালো দাগ না লাগলেও তার সময়ে ঘটেছিল বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের এসব অমোচনীয় ঘটনা। এর দায় এড়াতে পারেন না তিনিও।
গতবছর নারী অলিম্পিক বাছাইয়ে দল না পাঠিয়ে বিতর্কিত হয়েছিলেন সালাউদ্দিন। এরকম আরও অনেক ঘটনার নজির রয়েছে গত ১৬ বছরে। সেসব সঙ্গী করে অথবা পেছনে ফেলে বাফুফের সর্বেসর্বা থেকে সরে যাচ্ছেন খেলোয়াড়ি জীবনে খ্যাতির শীর্ষে ওঠা তারকা।








