কৃষিযন্ত্র পাওয়ার টিলারকে দেশীয় পদ্ধতিতে রূপান্তর করে কম খরচে ঘাস কাটার যন্ত্র আবিস্কার করেছেন টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার সহবদপুর ইউনিয়নের সারেংপুর গ্রামের অষ্টম শ্রেণী পাশ আশরাফুল। তার এ যন্ত্রে ৬৫ টাকার ডিজেলে ঘন্টায় এক একর সমপরিমানের ঘাস কাটা যায়। আবিস্কারক আশরাফুল পেশায় পাওয়ার টিলার চালক ও লেদ মেশিন অপারেটর। ঘাস কাটার যন্ত্র আবিস্কারের পর এখন আশরাফুল ইতিহাস গড়তে চান। এ যন্ত্রের সফলতায় তাকে নতুন কিছু তৈরির নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। জালানী খরচ বিহীন সেচ যন্ত্র আবিস্কার, বিনা খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র ও দেশীয় পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার তৈরির মাধ্যমে ইতিহাসে নাম লেখাতে চান আশরাফুল।
ঘাস কাটার যন্ত্র আবিস্কার ও ইতিহাস গড়ার বিষয় নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনের সাথে কথা বলেন আশরাফুল। তার ভাষায়‘ আমার বাবা খোকা মেকার বলতেন, মানুষ কয় দিন বাঁচে। মরার পর তার পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউ মনে রাখেনা। এমন কিছু করো যাতে মানুষ যুগ যুগ মনে রাখে। বাবা কৃষকের কথা চিন্তা করে অনেক কিছু করে গেছেন আমি তার স্বপ্ন পূরণে কাজ করছি। ১১ বছর ধরে সাধনা করছি জালানী খরচ বিহীন সেচ যন্ত্র আবিস্কার, বিনা খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র ও দেশীয় পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার তৈরির। আল্লাহ আমার উপর রহমত করলেই এইসব যন্ত্র তৈরি করে আমি ইতিহাস গড়তে পারবো।’
ঘাস কাটার যন্ত্র সম্পর্কে আশরাফুল বলেন, আমাদের এলাকার একপাশে ধলেশ্বরী আরেক পাশে যমুনা নদী। বর্ষার পানিতে সব তলিয়ে যায়। বর্ষা শেষে জমিতে যখন চাষাবাদের সময় হয় তখন জমিতে অনেক বড় বড় ঘাস জন্মায়। ঘাস না কাটলে জমিতে চাষ দেয়া যায়না। আমি যেহেতেু টিলার চালাই তাই চাষ দেয়ার জন্য আমার ডাক পড়ে। ঘাস কাটার শ্রমিক না পেয়ে জমির মালিক ঘাস কাটতে পারতো না। আর এজন্য দিনের পর দিন টিলার নিয়ে জমির পাশে বসে থাকতে হতো। চাষ দিতে না পারার জন্য আমারো যেমন লস হতো তেমনি অনেক মালিকে জমি পতিত থাকতো। এ থেকেই চিন্তা করি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করার। তখন আমার পাওয়ার টিলারকেই মনে হয়েছে উপযুক্ত মাধ্যম। আর এ কাজে আমি সফল হয়েছি। আমার আবিস্কৃত যন্ত্র দিয়ে চাষ’ও যেমন দেয়া যায় তেমনি ঘাষ’ও কাটা যায়। আগে যেখানে ৩০ শতাংশ জমির ঘাস কাটতে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হতো সেখানে আমাকে তিনশ টাকা দিলেই ২০ মিনিটে জমির সব ঘাস পরিস্কার করে দেই।
বিনা খরচে সেচ যন্ত্র আবিস্কারের হিসাবে আশরাফুল বলেন, বাবা কৃষকের কম খরচের কথা মাথায় রেখে সেচ যন্ত্রের একটি মডেল দাড় করিয়ে গেছেন। তিনি সব সময় চিন্তা করতেন কিভাবে কৃষকের কম টাকায় উৎপাদন করতে পারে। বাবার মডেলে সামন্য অর্থ ও শ্রমের প্রয়োজন হবে। কিন্তু আমি চাইছি এমন কিছু করতে যাতে বিনা শ্রমে সমাধান হয়। দীর্ঘদিনের সাধনায় একটি মডেল দাড় করিয়েছি। যেখানে আশি হাজার লিটারের একটি হাওয়া নিধোরক পানির ট্যাংক থাকবে। যার এক প্রান্তে ইনপুট আরেক প্রান্তে আউটপুট পাইপ থাকবে। ইনপুট পাইপটি চলে যাবে কয়েকেশ ফিট মাটির গভীরে আর ট্যাংকিটা এমন একটা ব্যবস্থায় থাকবে যে, আউটপুট দিয়ে যতোটুকো পানি বের হয়ে যাবে ইনপুট দিয়ে ততোখানি পানিই মাটির নীচ থেকে ট্যাংকিতে এসে ভর্তি হবে। এটাতেও সফলতা আসবে ইনশাল্লাহ। এই যন্ত্রে যদি সফলতা পাই তাহলে একবার সচল করলে মাটির নীচের পানির লেয়ার শেষ না হওয়া পর্যন্ত একটানা পানি পড়তেই থাকবে।
বিনা খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন যন্ত্র সম্পর্কে বলেন, ঘাস কাটা যন্ত্র আবিস্কারের আগেই এটার সফলতা আসার কথা ছিল। কিন্তু ফাইনাল পরীক্ষার দিন আমি অসফল হই। যে প্রক্রিয়ায় এটি কাজ করবে তার ২টা ধাপ ঠিকই কাজ করে ৩ নাম্বারে গিয়ে আটকে গেছি। এতে কয়েক লাখ খরচ হয়েগেছে। আর্থিক অনটনের জন্য ওটার সমাপ্তের কাজে হাত দিতে পারছিনা। আল্লাহপাক আবার হাতে কিছু টাকা দিলেই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবো। 
দেশীয় পদ্ধতিতে হেলিকপ্টার তৈরির বিষয়ে আশরাফুল বলেন, বাবা ছিলেন মেকার। এলাকায় তখন কোন কারেন্ট ছিলনা। এই মেকারী করতে গিয়ে ছোট-খাট বিষয়ে তাকে সমস্যায় পড়তে হতো। ৫ টাকার কাজের জন্য হলেও টাঙ্গাইল অথবা মানিকগঞ্জ যেয়ে সমাধান করতে হতো। একেতো যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপ ছিল তার উপর অনেক সময় নষ্ট হতো। টাকা ও আর সময়ের কথা চিন্তা করে সেই সময় বিনা জালানী খরচে বাবা একটি লেদ কারখানা তৈরি করেন আর চলাচলের জন্য হেলিকপ্টার তৈরির কথা ভাবেন। আমি তার দেখানো পথেই হাটছি। মটরসাইকেলের ইঞ্জিন দিয়ে একটি হেলিকপ্টার বানানোর পথেই আছি। যাতে তিনজন মানুষ অনায়াসেই উড়তে পারবে।
আশরাফুলের ঘাসকাটা যন্ত্রের বিপনণকারী প্রতিষ্টান টাঙ্গাইলের জামান এন্টারপ্রাইজের রেজাউল করিম বলেন, আশরাফুলের প্রতিভা জম্মগত। তার ধ্যান-জ্ঞাণ এসব নিয়েই। সে যে ঘাস কাটার যন্ত্র আবিস্কার করেছে তা খুবই সহজলভ্য ও স্বল্প খরচের। যার একটি পাওয়ার টিলার আছে সে চাইলেই ২৫ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করে ঘাস কাটা যন্ত্রে রূপান্তর করতে পারে। আবার তা খুলে পাওয়া টিলারের অন্যান্য কাজেও ব্যবহার করতে পারে। এ যন্ত্র দিয়ে ৬৫ টাকার ডিজেলে ঘন্টায় এক একর সমপরিমান স্থানের ঘাস পরিস্কার করা যায়। বঙ্গবন্ধু সেনানিবাসসহ বেশ কয়েকটি স্থানে আশরাফুলের ঘাস কাটার যন্ত্র সরবরাহ করেছি। নতুন নতুন চাহিদাও তৈরি হচ্ছে। সরকারি-বেসকারী কোন প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেলে আশরাফুল সত্যি সত্যিই একদিন ইতিহাস গড়বে বলে আমি বিশ্বাস করি।










