ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা মাদ্রাসার তরুণদের পাশাপাশি এখন সক্রিয় রয়েছে সমাজের ‘এলিট’ শ্রেণীর শিক্ষিত যুবকদের তথাকথিত জেহাদি কাজে ব্যবহারের জন্য। যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫ এর বেশি হবে না। বিগত কয়েক বছরের অপপ্রয়াসে তারা সফলও হয়েছে অনেকটা।
বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসছে, ধনীর আদরের ওইসব দুলালরা, মা-বাবা, পরিবার-পরিজন, চেনা পরিবেশ, জন্ম হতে লালিত ভাবনা-চিন্তাকে জলাঞ্জলি দিয়ে পা বাড়িয়েছে তথাকথিত জিহাদের পথে। ইতিমধ্যে কেউ কেউ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘নিখোঁজ’ হয়েছে, কেউ কেউ অন্ধকার আস্তানা থেকে ট্রেনিং নিয়ে ফেরত এসেছে।
ফিরে এসেই হত্যা করছে লেখক, বুদ্ধিজীবি, শিক্ষক, পুরোহিত, ধর্মযাজক, সেবায়েতকে; আবার বেছে বেছে হত্যা করছে বিদেশীদেরকে।
সর্বশেষ তারা হলি আর্টিজান বেকারি ও শোলাকিয়া ঈদ জামাতে ভয়াবহ হামলা করে চূড়ান্ত রূপে পৌঁছেছে। তারুণ্যের অবাধ সাহসিকতা আমাদের মাতৃভাষা বাংলার সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিল, তারুণ্যের নির্দ্বিধায় বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার যে মানসিকতা, সেই মানসিকতাই ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছিল।
‘৫২, ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭১, ‘৯০ কে স্মরণ করলে যে তারুণ্যের জয়গান গাইতে হয়, বাংলা ও বাঙালির সেই সাহসী শক্তিকে জঙ্গিগোষ্ঠী টার্গেট করেছে। প্রথমত একটি জাতিকে পর্যুদস্ত করতে গেলে তারুণ্যশক্তিকে পরাভূত করা প্রয়োজন সেটা জঙ্গিগোষ্ঠী ভালো করেই জানে। এজন্যই তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে তরুণদেরকেই টার্গেট করে এগোচ্ছে।
অতীতে তেজোদীপ্ত তারুণ্য জাতির সকল সংকটে, সকল সংগ্রামে সাহস জুগিয়েছে, পথ দেখিয়েছে। তাই, আজকের দিনেও আমরা বিশ্বাস করি, জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে তরুণরাই অগ্রপথিক হয়ে আলো হাতে এগিয়ে যাবে। আঁধার দূর করবে। এটাও বিশ্বাস করি, সেদিন খুব বেশি দূরে নয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৪ সালে বিজয় দিবসের ভাষণে বলেছেন, “একটি কথা আমি প্রায়ই বলে থাকি আজও বলছি, সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই।” সেদিন তিনি আরোও বলেছিলেন, “চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এ অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কিনা সন্দেহ।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের “শিক্ষা নীতি-২০১০” এ ‘শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য’ তিন অংশে বলা হয়েছে ; ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করে তোলা ও চিন্তা-চেতনায় দেশাত্মবোধ, জাতীয়তাবোধ এবং তাদের চরিত্রের সুনাগরিকের গুণাবলি (যেমন: ন্যায়বোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনাবোধ, কর্তব্যবোধ, মানবাধিকার সচেতনতা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, শৃঙ্খলা, সৎ জীবন যাপনের মানসিকতা, সৌহার্দ, অধ্যাবসায় ইত্যাদি) বিকাশ ঘটানো’ হবে।
তরুণদের ‘দেশপ্রেমিক’ নাগরিক বা ‘সোনার মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সদিচ্ছার পাশাপাশি আমাদের পরিবেশ-প্রতিবেশ, পরিবার-পরিজন এর ভূমিকাও অনস্বীকার্য। সমাজের বৃহৎ গোষ্ঠীও এর দায় এড়াতে পারে না। রাষ্ট্রের ভূমিকার পাশাপাশি তরুণদের বিপথে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করতে পরিবারের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী, গোষ্ঠী, দলের আজ অনেক বড় ভূমিকা রাখার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে তরুণদের বিপথে যাওয়ার পথ রূদ্ধ করতে এবং যারা ইতিমধ্যে পথচ্যুত হয়েছে তাদেরকে মোকাবিলা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে তরুণরাই।
সেক্ষেত্রে আজকের তরুণদের কথা বলা ও অধিকার আদায়ের মূল প্লাটফর্ম হচ্ছে বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন। সংঘবদ্ধভাবে তরুণদের এই প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমস্বরে জেগে ওঠে, জ্বলে ওঠে ; তবে এ আঁধার দূর হবেই। ভুলে গেলে চলবে না, এই আজকের তরুণরাই, এই ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরাই ১/১১ পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল, তাদের নেতৃত্বেই অবরুদ্ধ গণতন্ত্র মুক্ত হয়েছিল।
ভুলে গেলে চলবে না, এই আজকের ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতৃত্বেই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ এর সৃষ্টি হয়েছিল।
এই মুহূর্তে প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনগুলো দুটি ধারায় জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করার সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করতে পারে।
১. যেসব তরুণ জঙ্গিবাদীদের দ্বারা ইতিমধ্যে সরাসরি বিপথে গেছে, যারা তথাকথিত জেহাদের জন্য প্রস্তুত; তাদের মোকাবেলা করার জন্য সন্ত্রাসী-জঙ্গি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে সদা সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রতিরোধে সোচ্চার হয়ে সাধারণ মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে। বিশেষ করে জঙ্গি-টার্গেটে থাকা বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের পুরোহিত, সেবায়েত, মসজিদের ঈমাম, লেখক, বুদ্ধিজীবীদের পাশে থেকে ভ্যানগার্ডের ভূমিকা পালন করতে হবে। জঙ্গিদের বিভিন্ন হুমকি-বার্তায় যেন তারা আতঙ্কিত না হয়, সেজন্য তাদেরকে পাশে থেকে সাহস জোগাতে হবে। জঙ্গি-সন্ত্রাস বিরোধী জনসচেতনতামূলক নানাবিধ কর্মসূচি হাতে নিতে হবে; যা জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, গ্রাম, পাড়া, মহল্লায় ছড়িয়ে দিতে হবে।
২. যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জঙ্গি-সন্ত্রাসীরা জঙ্গি-সন্ত্রাসী উৎপাদনের অভয়ারণ্য মনে করছে, সেই সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ওইসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছে যেতে হবে। জঙ্গিদের মগজ ধোলাই এর বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের সত্য গল্পগুলো তাদেরকে শোনাতে হবে, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আমাদের সংস্কৃতি, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষা-সংক্রান্ত দৃষ্টান্তগুলো তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে।
আমাদের প্রিয় বাংলাদেশটি যে আমাদের সবার কাছে মায়ের সমান, সেই আবেগটুকু তাদের সংবেদনশীল হৃদয়ে স্থান পাক, তার জন্য এইসময়ে পরিবারের পাশাপাশি ছাত্রবন্ধু হিসেবে ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারে। কেননা ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা যতো দ্রুত ওইসব শিক্ষার্থীদের কাছে যেতে পারবে, বোঝাতে পারবে, ভালবাসা-পাশে মিশে গিয়ে আত্নার আত্নীয় হয়ে উঠতে পারবে, নিশ্চই তত দ্রুত অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরাই শিক্ষার্থীদের আবেগ-প্রত্যাশা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত।
তাই সরকারের পাশাপাশি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা সেই মহৎ কর্মোদ্যোগকে এই মুহূর্তের করণীয় কর্ম জ্ঞান করে সেই সেই মহান ব্রতে ঝাপিয়ে পড়তে পারে। তরুণদের প্রথম ও প্রধান শিক্ষালয় হচ্ছে পরিবার। জীবন-যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে বর্তমান এই যুগে বাবা-মা কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকবেন, এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু এটাও সত্য, আজকের বাচ্চারা বাবা-মায়ের সেই ব্যস্ততার কারণে মা-বাবার কাছ থেকে আদর্শিক শিক্ষা; ভালবাসা, আদর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
যার কারণে শৈশব থেকে তারুণ্যে পর্দাপন করা তরুণদের ভেতর একধরনের শূন্যতা, অবসাদগ্রস্ততাগ্রাস করে, এটিও মিথ্যা নয়। অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালয়ে তরুণদের শিল্প-সংস্কৃতি থেকে দূরে থাকা এবং খেলাধুলা ও বিনোদনের অনুপস্থিতিও তাদেরকে প্রত্যাশিত ইতিবাচক কর্মচাঞ্চল্য থেকে দূরে রাখছে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, সংবেদনশীল বয়সে তরুণদের যখন-তখন প্রয়োজন হতে পারে পরামর্শের, পথের দিশার। ছাত্রসংগঠনগুলো ছিল জাতির সকল সংকট মোচনের পথপ্রদর্শক। তাই, ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা আজকের দিনে একাধারে জঙ্গি-সন্ত্রাস মোকাবিলায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তেমনি শৈশব থেকে তারুণ্যে পদার্পণ করা সংবেদনশীল হৃদয়কে জয় করে তাদেরকে অন্ধকারের পথে না ঝুঁকতে সহায়তা করবে, এটাই আজ সকলের প্রত্যাশা।
তারুণ্যের শক্তি যেকোনো দেশের মানব সম্পদের প্রাণ। যেকোনো সভ্যতার, যেকোনো বিপ্লবে তখনই সাফল্য আসে, যখন সেখানে তারুণ্য শক্তি যোগ হয়। তারুণ্য শক্তি হচ্ছে আগুনের মতো। আসুন, তারুণ্যের আগুনের শক্তি দিয়ে নতুন সভ্যতা বিনির্মাণ করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








