আশ্বিনের মাঝামাঝিতেও আষাঢ় মাসের মতো বৃষ্টি। শুক্রবার নগরবাসীর সকাল শুরু হয়েছে রিমঝিম বৃষ্টির শব্দে। প্রাকৃতিক এই বাধাকে উপেক্ষা করেও সকাল থেকে মণ্ডপে মণ্ডপে ভিড় করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
শুক্রবার ছিল দুর্গোৎসবের মহানবমী। রাজধানীর রমনার কালিমন্দিরে সকালে আরতি বন্দনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পূজার কার্যক্রম। দিনব্যাপী ‘আনন্দময়ী’র অর্চনা করছেন তারা। সকালে প্রায় হাঁটুপানি ডিঙিয়ে আসতে হচ্ছিল। পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতেই মন্দির ভক্তদের আনাগোনায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফুল, ফলসহ নানা উপাচারে ভরে উঠে দুর্গা দেবীর চরণ। এসময় তারা প্রার্থনা করেছেন দেশের মঙ্গলের জন্য।
রমনার কালিমন্দিরে পূজা করতে আসা নিপু বিশ্বাস বলেন, ‘নিজের জন্য প্রার্থনা করছি। পরিবারের জন্য প্রার্থনা করছি। সবাই যেন শান্তিতে বসবাস করতে পারে সেই প্রার্থনা মায়ের কাছে।’
রমনা কালিমন্দির পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক উৎপল সাহা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘প্রায় চারশো বছরের পুরনো এই মন্দির এবার নতুন রূপে সেজেছে। দেশের পাশাপাশি ভারত থেকে দর্শনার্থী এসেছে। খুব শান্তিপূর্ণভাবে আমরা পূজা উদযাপন করছি। আমি চাই দেশের সবাই যেন মিলেমিশে তাদের ধর্ম পালন করতে পারে এমন পরিবেশ সবসময় বিরাজ করুক দেশে। সম্প্রীতি বজায় থাকুক প্রিয় স্বদেশে।’
এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব ‘অসাম্প্রদায়িকতার এক নতুন বার্তা’ দিয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এবার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কথা মাথায় রেখে পূজার খরচ যত সম্ভব কম করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এসময় ঢাকা মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি ডি এন চ্যাটার্জি বলেন, ‘দুর্গোৎসবের আচার অনুষ্ঠান শুধু আমাদের, কিন্তু উৎসব সবার। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলে মন্দিরে আসছেন। উৎসবে সামিল হয়ে সবাই এক হয়ে আনন্দ করছেন। এই অসাম্প্রদায়িকতার চিত্রটিই তো বাংলাদেশকে তুলে ধরে।’
প্রার্থনা করা হয় কক্সবাজার, বান্দরবনে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য। রমনা কালিমন্দিরের পুরোহিত এবারের মহা নবমীর আয়োজন নিয়ে বলেন, ‘আজ আমরা দেবীকে ষোড়শ উপচারে বন্দনা করছি। তারপর মহাস্নান। দেবী আর মাত্র একদিন থাকবেন মর্ত্যে। মায়ের কাছে আমরা প্রার্থনা করছি, ধরায় যেন সর্বদা শান্তি বিরাজ করে। কোথাও যেন কোনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত না বাধে।’
তিনি জানান, শাস্ত্র বলছে, সপ্তমী, অর্থাৎ দেবীর আগমনের দিন বুধবার এবং ফেরার দিন শনিবার হওয়ায় দুর্গা এবার আসছেন নৌকায় চড়ে, যাবেন ঘোড়ায়।

দুর্গার নৌকায় চড়ে মর্ত্যে আসার অর্থ হল- ‘শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম’। অর্থাৎ শস্যবৃদ্ধির সম্ভাবনা। আর ঘোড়ায় চেপে দেবীর বিদায়ের মানে হল- ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’; মানে রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যুর শঙ্কা।
বিপদ কাটাতে মায়ের কাছেই প্রার্থনা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ’মা স্বয়ং বিপদনাশিনী। আর মাত্র একটি দিন মা থাকবেন মর্ত্যে। আজ মাকে বলব, মা যেন কৈলাসে যাওয়ার আগে মর্ত্যবাসীকে রাঙিয়ে দিয়ে যান। দুর্গোৎসব শেষে মা চলে গেলেও যেন তার আশীর্বাদ সবসময় আমাদের ওপর থাকে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে দেখা যায় জমজমাট পূজা উৎসব। বাহারি আলোক সজ্জায় সজ্জিত পুরো হল এলাকা। দেবিকে সামনে রেখে বাজতে থাকে ঢাক, ঢোল। বিকালে আবহাওয়া ভালো থাকায় দলবেঁধে আসতে থাকে ভক্তরা। মায়ের নিটক প্রার্থনাসহ মুঠোফোনে পূজা উৎসবকে ধারণ করতে দেখা যায় তাদের।

এ মন্দিরের পুরোহিত দশমীর কর্ম পরিকল্পনার বিষয়ে জানান, ‘শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় শুরু হবে বিজয়া দশমীর আনুষ্ঠানিকতা। শনিবার সকালে দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে দুর্গোৎসবের সব আনুষ্ঠানিকতা। দুপুর ১২টায় মণ্ডপে মণ্ডপে হবে সিঁদুর খেলা। বিকাল ৩টায় শোভাযাত্রাসহ নগরীর প্রতিমাগুলো যাবে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে। এছাড়াও নগরীর তুরাগ, শীতলক্ষ্যা,বালু নদীতেও প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে। ‘
বিসর্জন উপলক্ষে প্রতিটি ঘাটে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা থাকার কথা জানিয়েছেন মহানগর পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক শ্যামল কুমার রায়।








