আজকের দিনটা দুটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৭৫৭ সালের এই দিন বাংলার স্বাধীনতার সূর্য বৃটিশদের হাতে অস্ত গিয়েছিল। মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতায় লর্ড ক্লাইভদের কাছে হার মেনেছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ উদ দৌলা। আর বাংলা চলে গেল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে। এটা ছিল ভারতকে উপনিবেশ করার দীর্ঘমেয়াদী বৃটিশ পরিকল্পনার সফল সূচনা।
এর প্রায় ১৯২ বছর পর। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন, পাকিস্তানের পরাধীনতা থেকে বাংলাকে মুক্ত করে স্বাধীনতার সূর্য উদয়ের নতুন লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। এই দলটিই পরবর্তীতে নেতৃত্ব দিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে, মহান মুক্তিযুদ্ধে।
নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পার করতে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু ৬৯ বছরে আওয়ামী লীগ কতটা এগুলো প্রগতির পথে? নাকি সংখ্যাটির মতই উল্টা পাল্টা কিছু ঘটছে?
১৯৪৯ সালে, মুসলিম লীগের অপূর্ণতা আর ব্যর্থতা থেকেই জন্ম নিলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। এর পেছনে বড় অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে পাকিস্তানে মুসলিম লীগের প্রথম পরাজয়। শামসুল হক মুসলিম লীগ প্রার্থী খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করে নির্বাচিত হলেন এমএলএ। বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে বলছেন, ‘১৯৪৭ সালে যে মুসলিম লীগকে লোকে পাগলের মত সমর্থন করছিল, সেই মুসলিম লীগ প্রার্থীর পরাজয় বরণ করতে হল কী জন্য? কোটারি, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ না করার ফলে। ইংরেজ আমলের সেই বাঁধাধরা নিয়মে দেশ শাসন চলল। স্বাধীন দেশ, জনগণ নতুন কিছু আশা করছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষণ থাকবে না। আজ দেখছে তার উল্টো।’ নতুন স্বপ্ন নিয়ে হাজির হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। খুব দ্রুতই সাড়া পেল জনগণের।
দল প্রতিষ্ঠার সময়, যে ভাবনাটা অনেক আগেই জেলে বসেই ভেবেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার বাস্তবায়ন ঘটলো প্রায় পাঁচ বছর পর ১৯৫৫ সালে। দলের নাম নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে বলছেন, ‘আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনো আসে নাই, তাই যারা বাইরে (জেলের বাইরে) আছেন তারা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন।’ দল থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটা বাদ দিয়ে দলকে দেয়া হল অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। কিন্তু ৬৯ বছরে এসে, সেই চরিত্র কতটা ধরে রাখতে পেরেছে আওয়ামী লীগ, সে প্রশ্ন এখন অনেকেই তুলছেন। বিশেষ করে, হেফাজতের সাথে সরকারের সম্পর্ক, তাদের দাবি দাওয়ার প্রতি সরকারের বিশেষ অনুরাগে, আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরাও সংশয় জানাচ্ছেন।
ক্ষমতার রাজনীতিতেও দীর্ঘসময় উল্টো স্রোতেই সাঁতার কাটতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদ্যের নৃশংস হত্যার মধ্য দিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে আওয়ামী লীগ। সংগ্রাম আর আপোষ, নীতি আর কৌশল দু’টোকেই সাথী করতে হয়েছে দলটিকে। যেকোন দলের জন্যই তা নির্মম বাস্তবতা। কিন্তু ইতিহাস এ শিক্ষাটাও আমাদের দেয় যে, রাজনীতিতে সব কৌশল সব সময় সফল হয় না।
ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে আওয়ামী লীগও একটা বিশেষ সময় পার করছে। কারণ দেশে এখন শক্তিশালী কোন বিরোধী দল নেই। আর এটা যেকোন গণতন্ত্রের জন্যই ভাল কিছু নয়। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ নিজেও এটা জানে। কারণ শক্তিশালী বিরোধী দলই পারে ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে। সেটা না হলে ক্ষমতার পাগলা ঘোড়া ক্ষমতাসীন দলকে বিপজ্জনক কোথাও নিয়েও ফেলতে পারে।
খুব হাস্যরসাত্মক মনে হলেও আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মাঝে মাঝেই দলে ‘মুরগি, কাউয়া’ ঢুকে পড়েছে বলে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তার অনেক রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। যে শব্দ দিয়েই আওয়ামী লীগে সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশকে ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, সেটা অবিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। কিন্তু এটা যে শুধু ক্ষমতার মৌ-লোভীরাই ঘটাচ্ছেন তা নয়। গণতন্ত্রহীনতার কারণে এমন ঘটছে কিনা, আওয়ামী লীগকে এখনই সেটা ভেবে দেখতে হবে। নতুবা একটা সময় কিন্তু ‘মুরগি বা কাউয়া’রাই দলকে ভীষণ ধাক্কা দিয়ে দেবে।
খুব কাছের মানুষের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস কিন্তু আওয়ামী লীগের আছে। যেমন এই দিনে, মীরজাফরের হাতে যুদ্ধের নেতৃত্বের ভার দিয়ে ভুল করেছিলেন সিরাজ উদ দৌলা। বিশাল সংখ্যার সেনাবহর নিয়ে অল্পসংখ্যক ইংরেজদের কাছে পরাজিত হতে হয়েছে বাঙ্গালিদের।
আওয়ামী লীগকে তাই মাথায় রাখতে হবে, রাজনীতির হিসাবটা যাতে কোনক্রমেই উল্টাপাল্টা বা ৬৯ না হয়ে যায়!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)









