মতের সঙ্গে না মেলায় প্রচণ্ডভাবে উগ্রপন্থী ও সহিংস মৌলবাদীরা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়সহ মুক্তমনা লেখক-ব্লগারদের হত্যা করছে।
নেপথ্য হত্যাকারীদের ধরতে সরকার ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশ এক আতঙ্কের ক্রান্তিকাল পার করছে বলে মনে করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও নিহত লেখক অভিজিতের বাবা অজয় রায়।
মঙ্গলবার একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত কবীর চৌধুরী স্মারক বক্তৃতায় মৌলবাদ এবং ছেলের হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলেন তিনি।
অধ্যাপক অজয় রায় মৌলবাদের রূপটি তুলে ধরে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে বলেন, ‘মৌলবাদ বিশেষ করে ধর্মীয় মৌলবাদ ভয়ানক ভাবে উগ্রবাদের চেতনায় সম্পৃক্ত বা এই বিশ্বাসের অনুসারীরা প্রচণ্ডভাবে উগ্রপন্থী এবং সহিংস তাদের গ্রুপের সাথে একমত না হলে বিরুদ্ধবাদীদের শুধু তত্ত্বীয়ভাবে নয় পার্থিব বা দৈহিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে পিছপা হয় না।’
‘বাংলাদেশের মৌলবাদীরাও বিশেষ করে ধর্মান্ধ সহিংস ইসলামী মৌলবাদীরাও এর থেকে আলাদা নয়। গত বছর (২০১৫) ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় উগ্রপন্থীদের হাতে বিজ্ঞান মনষ্ক লেখক ও জনপ্রিয় ‘মুক্তমনা’ ওয়েব সাইটের প্রতিষ্ঠাতা ডক্টর অভিজিৎ রায়ের নিহত হওয়াটা এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ ও উদাহরণ’।
একজন ব্যক্তিকে তার ভিন্ন মতের জন্য হত্যা করা অযৌক্তিক এবং আইনের অবমাননা বলে মনে করেন দুইবার নোবেলের জন্য মনোনীত এই অধ্যাপক।
তিনি বলেন, ‘অভিজিতের দোষ সে নাকি নাস্তিক ঈশ্বর বিশ্বাসহীন। সো হোয়াট? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেয়া হয় যে তার ঈশ্বরে আস্থা নেই, তাহলে ইসলামীবাদীরা আইন নিজের হাতে তুলে নেবে? তাকে চাপতির আঘাতে প্রকাশ্যে হত্যা করা কী ইসলাম ও কোরআন সম্মত বিধান!’
‘দেশে কি আইনের শাসন নেই- সরকার নেই? সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা সংগঠন আইনের আশ্রয় নিতে পারতেন- আদালতের আশ্রয় নিতে পারতেন, এই অভিযোগ করে যে অভিজিত ধর্মের, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছে’।
এই হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশ এক সম্ভাবনাময় লেখক হারিয়েছে মন্তব্য করে অধ্যাপক অজয় রায় আরও বলেন, ‘কিন্তু সংক্ষুব্ধরা সে পথে হাটে না, নিজ হাতে চাপাতি তুলে নিয়ে দেশের একজন প্রথিতযশা মুক্তচিন্তার ধারক ও অমিত সম্ভাবনাময় লেখকের জীবনাসন করেছেন। আমি প্রশ্ন তুলতে চাই এই হত্যাকাণ্ডের মধ্যদিয়ে কতজন নব্যমুসলিমের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়েছে? বিশ্বে কোটি কোটি লোক ইসলামের পরিমণ্ডলের বাইরে আছেন, হয় তারা ভিন্নধর্মী বা নিরীশ্বরবাদী, তাদের হত্যা করা বা তাদের বিরুদ্ধে জেহাদে যাওয়া কী ইসলামী মৌলবাদীদের ফরজ’?
ভিন্ন চিন্তার জন্য হত্যার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘বিশিষ্ট পদার্থবিদ, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ পল কুর্জ অ্যাগনস্টিক অর্থাৎ গড আছেন কি না তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। এই মতাদর্শের কারণে কী মৌলবাদীরা তাকে হত্যা করবেন? রিচার্ড ডকিন্স একজন বিশ্বসেরা জীববিজ্ঞানী- কিন্তু ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই, এ কারণে খ্রিশ্চিয়ান বা ইসলামী মৌলবাদীরা এই শ্রেষ্ঠ জীববিজ্ঞানীকে হত্যায় অগ্রসর হবেন? স্যাম হ্যারিস বিশিষ্ট আমেরিকান চিন্তাবিদ, দার্শনিক ও লেখক কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠিত ধর্মে আস্থা নেই- এ কারণে তাকে হত্যা করতে হবে? ভেক্টর জে স্ট্রেঙ্গার হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যেতির্বিজ্ঞানের ইমারিটাস অধ্যাপক। তার কালজয়ী লেখা `God : The Failed Hypothesis – How Science shows that God does not exist’- এ বই লেখার কারণে তাকে হত্যার কথা ভাবতে হবে? এরকম অসংখ্য বুদ্ধিদীপ্ত নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদী লেখক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও বুদ্ধিজীবী রয়েছেন- তাদের বৈপরিত্যময় চিন্তাধারার জন্য হত্যা করতে হবে? তাহলে গ্যালিলিওর বিচার পরিচালনা পর্ষদ আর কী দোষ করেছিল’!
মৌলবাদ চরমে, জঙ্গিবাদের উত্থানে সংকটে থাকা দেশকে নিয়ে নিজের আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন বিজ্ঞান ও যুক্তির লড়াই চালিয়ে যাওয়া এই অধ্যাপক।
তিনি বলেন, ‘আমরা বর্তমানে একটি ক্রান্তিকাল বা সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলেছি। গত কয়েক বছরে উত্থান ঘটেছে সশস্ত্র মৌলবাদের― যাদের এক কথায় বলা যায় জঙ্গীবাদের অভ্যুদয়, গোষ্ঠী হিসেবে আবার সংগঠন হিসেবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত ও শিবিরের অস্তিত্ব সকলের জানা সংগঠন হিসেবে রয়েছে। ‘বাংলা ভাই’, ‘আনসারুল্লাহ বাংলা’ (যারা দাবি করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়দার আশীর্বাদপুষ্ট সংগঠন হিসেবে), আইএস বা ‘ইসলামিক স্টেট’র বাংলাদেশে সাংগাঠনিক অবস্থান স্পষ্ট নয়, যদিও এর অস্তিত্ব সরকার অস্বীকার করে।’
‘জঙ্গী সংগঠনের তৎপরতায় সশস্ত্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর কর্মতৎপরতা প্রবলভাবে বেড়েছে। এরা স্থানীয়ভাবে ‘হত্যা কোষ’ গঠন করে তথাকথিত নাস্তিক, মুক্তচিন্তার অধিকারী ও তথাকথিত ব্লগারদের তালিকা তৈরি করে অভিলক্ষ্য ব্যক্তিদের নিশ্চিহ্ন করায় লিপ্ত।’
‘এই সশস্ত্র জঙ্গি সংগঠনগুলো ৮০ জন ব্যক্তির তালিকা করেছে যাদের নিশ্চিহ্ন করা হবে। ইতোমধ্যেই তালিকার কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে- ড. অভিজিৎ রায়, ওয়াশেকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাস, নিলাদ্রী নিলয় চ্যাটার্জী প্রমুখকে ইতোমধ্যেই হত্যা করা হয়েছে; জাগৃতি প্রকাশনার মালিক দীপনকে হত্যা ও শুদ্ধস্বর প্রকাশনার মালিক টুটুল ও কর্মকর্তা রনদীপম বোসসহ কয়েকজনকে গুরুতরভাবে আহত করে। ড. অভিজিৎ রায়ের সহধর্মিনী বন্যাকেও গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে অভিজিতের সাথে গুরুতরভাবে ক্ষতবিক্ষত করে মৌলবাদী জঙ্গীরা। এই হত্যকারীরা এখনও পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই ব্যর্থতা আমাদের আরও আতঙ্কিত করে’।







