১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হয়। ভয়াবহ সেই দিনটির কথা উঠে এসেছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সাক্ষীদের জবানবন্দিতে। জবানবন্দি থেকে পাওয়া যায় সেদিনের ভয়াবহতার চিত্র। জানা যায় ঠিক কী ঘটেছিল সেদিন ৩২ নম্বরের বাড়িটির ভেতরে-বাইরে। সাক্ষীদের জবানবন্দির ভিত্তিতে চ্যানেল আই অনলাইনের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের ষষ্ঠ পর্ব।
প্রসিকিউশনের ৮নং সাক্ষী মেজর সাহাদৎ হোসেন খান আদালতকে জানান, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টে অ্যাডজুটেন্ট/ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি। লে. কর্নেল মতিয়ার রহমান তাদের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। ১৫ আগস্ট সকাল ৬/৬:৩০টার দিকে মেসের বাইরে হৈচৈ শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায় তার। বাইরে এসে ২ ফিল্ড আর্টিলারির ফোর্সসহ অফিসার ও গাড়ি সশস্ত্র অবস্থায় দেখেন। তারা বলে, সব শেষ করে দিয়ে এসেছি, আর তোমরা এখনও ঘুমিয়ে আছো! ইউনিফরম পরে তাড়াতাড়ি ইউনিটে রিপোর্ট করো।
৭.৩০ টার দিকে ইউনিটে রিপোর্ট করে পরে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহসহ উর্ধতন অফিসাররা আস্তে আস্তে তাদের কমান্ডিং অফিসারের রুমে সমবেত হন। সেখানে ইউনিফরম পরা সশস্ত্র অবস্থায় মেজর রশিদকে দেখেন। তার কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল মতিয়ুর রহমান রুম থেকে বের হয়ে ২ জন অফিসার নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের অবস্থা দেখে রিপোর্ট করার জন্য তাকে নির্দেশ দেন। সকাল প্রায় পৌনে ৯টায় বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান তিনি। পথে রোডের মাথায় ট্যাংক, জিপ গাড়িসহ কালো খাকী পোশাকধারী ফোর্স দেখেন। পরিচয় ও উদ্দেশ্যের কথা বললে তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যেতে দেয়া হয়। গেটের সামনে রাস্তায় ও ভেতরে বেশ কিছু সশস্ত্র সৈনিক দেখেন তিনি।
গেটের পশ্চিম দিকে দাঁড়ানো অবস্থায় কয়েকজন সিভিলিয়ানকেও দেখেন। গেটে মেজর নূর ও মেজর হুদা তাদেরকে রিসিভ করে। তারা চিফ অফ আর্মি স্টাফ জেনারেল শফিউল্লাহর নির্দেশে আসেন জানালে মেজর নূর তাদেরকে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের ভেতর দেখানোর জন্য ক্যাপ্টেন হুদাকে বলে। ক্যাপ্টেন হুদা ভিতরে নিয়ে গেলে রিসিপশন রুমে শেখ কামালের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখেন। শেখ কামালকে কেন মেরেছ জিজ্ঞাসা করলে বজলুল হুদা বলে, শেখ কামাল ফোনে বাইরে খবর দিচ্ছিল। সেজন্য তাকে মেরেছি।
মেজর সাহাদৎ হোসেন খান এরপর জানান, সেই রুমে লুঙ্গি পরা অবস্থায় আরেকজনের মৃতদেহ দেখতে পাই। মেজর হুদা বলে, সে পুলিশের লোক, তাকে চলে যেতে বললে সে তর্ক শুরু করে দেয়। সেজন্য তাকে মেরেছে। তারপর সিঁড়ির দক্ষিণ দিকে বাথরুম দেখিয়ে বলে, এখানে শেখ নাসেরের লাশ আছে। তারা বাথরুম খোলে। সেখানে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত অবস্থায় শেখ নাসেরের লাশ দেখে। তাকে কেন মেরেছ জিজ্ঞাসা করলে ক্যাপ্টেন হুদা কোন উত্তর দেয় না। তারপর সিঁড়ির কয়েক ধাপ উঠে বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ দেখে হতভম্ভ হয়ে যান মেজর সাহাদৎ। বুকে, পেটে ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত অবস্থায় বঙ্গবন্ধুকে পড়ে থাকতে দেখেন। দেশের প্রেসিডেন্টকে কেন এভাবে মারলে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে ক্যাপ্টেন হুদা বলে: আমি যখন দলবলসহ বঙ্গবন্ধুর কাছে যাই তিনি তখন বলেন– তোমরা কেন আমার বাসায় এসেছ? কে তোমাদেরকে পাঠিয়েছে? শফিউল্লাহ কোথায়? এই বলে আমাকে ঝটকা মারে তখন আমি পড়ে যাই। এরপর আবার বঙ্গবন্ধুকে গুলি করি।
তারপর বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের দরজায় বেগম মুজিবের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ দেখেন সাহাদৎ। বঙ্গবন্ধুর বেডরুমে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত অবস্থায় আরো ৪টি মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। কেন এদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছ জিজ্ঞাসা করলে ক্যাপ্টেন হুদা বলে, সশস্ত্র সৈনিকরা আউট অব কন্ট্রোল হয়ে এদেরকে হত্যা করে লুটপাট করেছে। ক্যাপ্টেন হুদা আরো জানায়, কর্নেল জামিলকে বাইরে মেরে তার মৃতদেহসহ গাড়ি বাড়ির ভেতরে পিছনে রাখা হয়েছে। ‘ইতোমধ্যে এতগুলি মৃতদেহ দেখে আমরা মানবিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে কর্নেল জামিলের মৃতদেহ দেখার জন্য যাইনি। এরপর ইউনিটে ফিরে লে. কর্নেল মতিয়ুর রহমানকে মৌখিকভাবে ঘটনার কথা ও ক্যাপ্টেন হুদার বক্তব্য বিস্তারিতভাবে জানাই।’
৯নং সাক্ষী লে. কর্নেল হামিদ
প্রসিকিউশনের ৯নং সাক্ষী লে. কর্নেল হামিদ আদালতকে জানান, ঘটনার সময় ঢাকায় স্টেশন কমান্ডার ছিলেন তিনি। তার সিনিয়র অফিসাররা ক্যান্টনমেন্ট লন টেনিস খেলত। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বিকাল বেলা টেনিস খেলার সময় লক্ষ্য করেন যে, চাকুরিচ্যুত মেজর ডালিম ও মেজর নুর টেনিস কোর্টের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এটা তাদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়, কারণ তারা ছিল চাকরিচ্যুত জুনিয়র অফিসার। একদিন জেনারেল শফিউল্লাহ তাকে বলেছিলেন, এরা চাকরিচ্যুত জুনিয়র অফিসার। এরা কেন এখানে টেনিস খেলতে আসে? এদেরকে জানিয়ে দিবেন এরা যেন না আসে। খেলা শেষে তিনি মেজর নূরকে জিজ্ঞাসা করেন- তোমরা কার অনুমতি নিয়ে এখানে খেলতে আস? জবাবে নুর জানায়, তারা জেনারেল জিয়ার অনুমতি নিয়ে এখানে খেলতে আসে।
পরের দিন অর্থাৎ ১৫-৮-৭৫ তারিখ সকাল প্রায় ৬টার সময় কর্নেল আবদুল্লাহ টেলিফোন করার পর কর্নেল হামিদ রেডিও অন করে মেজর ডালিমের কণ্ঠে শোনেন ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’ তিনি চমকে উঠলেন এবং তাড়াতাড়ি অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। এমন সময় জেনারেল শফিউল্লাহ টেলিফোনে বললেন- ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্টিলারি আর্মাররা বাইরে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তোমরা কিছু জান? তিনি বললেন, জানি না। তবে রেডিওতে ঘোষণা শুনেছি, অফিসে যাচ্ছি। যদি কিছু থাকে জানাব। লে. কর্নেল নূর উদ্দিনের অফিসের সামনে জিপ থেকে নেমে সেখানে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেঙ্গল ল্যান্সারের কমান্ডিং অফিসার কর্নেল মোমিনের সাথে কথা বলছিলেন। এমন সময় কালো পোশাক পরা কিছু সৈনিকসহ ২টি জীপ শোঁ-শোঁ করে প্রধান গেট দিয়ে আর্মি হেড-কোয়ার্টারে ঢুকে পড়ে। কর্নেল মোমিন হাত দিয়ে ইশারা দিয়ে একটি জিপ থামাতে বলে।
সঙ্গে সঙ্গে জিপ থেকে উন্মুক্ত স্টেনগান হাতে মেজর ডালিম নেমে পড়ে এবং চিৎকার করে বলে Shut up! get away from here. এতে করে তখন সেখানে এক ভয়ংকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অফিসাররা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে যে যেদিকে পারে ছুটে পালায়। মেজর ডালিম সশস্ত্র অবস্থায় সরাসরি জেনারেল শফিউল্লাহর রুমে ঢুকে পড়ে। তখন সময় প্রায় ৮:৩০ টা। ‘কিছুক্ষণ পরে দেখলাম জেনারেল শফিউল্লাকে মেজর ডালিম স্টেনগানের মুখে রুম থেকে বাইরে নিয়ে আসে। পিছনে জেনারেল জিয়াসহ অন্যান্য সিনিয়র অফিসার ছিল। সেখানে অপেক্ষমান প্রথম গাড়িতে জেনারেল শফিউল্লাহ উঠলেন, দ্বিতীয় গাড়িতে মেজর ডালিম সশস্ত্র অবস্থায় ছিল। তৃতীয় গাড়িতে জেনারেল জিয়া, ৪র্থ গাড়িতে মেজর ডালিমের সশস্ত্র লোকজন ছিল। ৪টি গাড়ির কনভয় সেনা সদরের আউটার গেট দিয়ে দক্ষিণ দিকে ব্রিগেডে চলে যায়। ১০/১৫ মিনিট পর সেনা সদর হতে তার অফিসে এসে ১০টার দিকে রেডিও সংবাদে তিন বাহিনীর প্রধান, পুলিশ ও বিডিআর প্রধানের আনুগত্য ঘোষণার কথা শোনেন।
পরবর্তী পরিস্থিতি বর্ণনা করে কর্নেল হামিদ আদালতকে জানান, এরপর বেলা ৩টার দিকে জেনারেল শফিউল্লাহ টেলিফোনে তাকে শহরের ও বঙ্গবন্ধুর বাড়ির অবস্থা দেখে রিপোর্ট দিতে বলেন। নির্দেশমতো বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখেন চতুর্দিকে সশস্ত্র আর্টিলারি ও আরমারের লোকজন অবস্থান করছে। তার পরিচয় পেয়ে রাস্তা ছেড়ে দেয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটে মেজর আজিজ পাশা এবং মেজর হুদা তাকে রিসিভ করে। মেজর আজিজ পাশার নির্দেশে মেজর হুদা তাকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায় এবং রিসিপশন রুমে শেখ কামাল ও একজন পুলিশ অফিসারের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। দোতলার সিঁড়িতে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। দোতলায় বাম দিকের রুমে দেউরিতে বেগম মুজিবের এবং রুমের ভিতরে শেখ জামাল, মিসেস জামাল, মিসেস কামাল, শেখ রাসেলের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখেন। নিচে বাথরুমে শেখ নাসেরের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখেন। বাইরে বাড়ির পশ্চিম দিকে আঙ্গিনায় একটি লাল কারে কর্নেল জামিলের গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ দেখেন। এই দেখা শোনার পর ফিরে এসে জেনারেল শফিউল্লাকে টেলিফোনে ঘটনার বর্ণনা দেন।
১৫ আগস্ট দিবাগত রাত ৩টায় বঙ্গভবন থেকে মেজর এম. এম. মতিন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ জানিয়ে বলেন, শেখ সাহেবের বাড়ি থেকে তার লাশ বাদে বাকি সব লাশ নিয়ে সূর্য উঠার আগে বনানী গোরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে। নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। তাছাড়া ডিউটি ব্যাটালিয়ন কমান্ডার এম. এ. রবকে তাড়াতাড়ি বনানী গোরস্থানে লাশ দাফনের নির্দেশ দেন। তিনি জিপে করে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে দেখে লাশ আলাদা আলাদা বাক্সে রাখা হয়েছে। মেজর হুদা সেখানে উপস্থিত ছিল। একটি বাক্স বারান্দায় রাখা ছিল। মেজর হুদা ‘এটা বঙ্গবন্ধুর লাশ’ বললে তিনি সেটা খুলে দেখেন বঙ্গবন্ধুর লাশ নয়। সেটা শেখ নাসেরের লাশ বলে পরে বঙ্গবন্ধুর লাশ খুঁজে বের করে সেখানে রাখেন। বাকি লাশগুলি বনানীতে দাফনের জন্য পাঠান। সেরনিয়াবাতের বাসায় নিহতদের লাশ পুলিশ স্টেশনে খুঁজে মর্গ থেকে বের করে বনানীতে দাফনের জন্য পাঠান। নিজেও বনানীতে যান। মোট ১৮টি লাশ বনানীতে দাফন করা হয়। বঙ্গভবনের তত্ত্বাবধানে ও ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টার দিয়ে বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়া পাঠানো হয়।
বনানীতে কবরস্থ লাশগুলি কর্ণেল রব-এর তত্ত্বাবধানে দাফন করা হয়। দাফনের পূর্বে আইন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয়েছে কিনা সেটা কর্নেল রব বলতে পারবেন। গেরিলা ডিউটি অফিসার মেজর মহিউদ্দিনের (অর্ডিন্যান্স) তত্ত্বাবধানে হেলিকপ্টারে বঙ্গবন্ধুর লাশ টুঙ্গিপাড়া পাঠানো হয়। ফ্লাইট লেঃ শমসের আলী হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন।








