ঠিক সামনের আসনে তিনি বসে আছেন। সেই তিনি! নব্বইয়ের দশকের অঞ্জন দত্তের গানটা মনে পড়ে তো? ‘তোমার জংলা পাড়ের ঢাকেশ্বরী শাড়ি/ তোমার পিসি চন্দ্রের ঝুমকো কানের দুল…….মালা তুমি কে, তুমি কে?/ তোমার কথা বলা যেন মধুবালা/ তোমার হাঁটা চলা সোফিয়া লরেন/ তোমার গন্ধ ফরাসী আনায় আনায়/ অভিমান অপর্না সেন।’
আশ্চর্য! টের পাওয়া যায়নি। আলিয়ঁস ফ্রাঁসেজের মূল মিলনায়তনে পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ঠিক তার পেছনে বসে পড়াটা কাকতালীয় নাকি পেরিয়ে যাওয়া বিশ বছর আগের অপূর্ণতার অভিমান এর হিসাব পূরণ, তা কে বলতে পারে!
যার জন্য বাড়ি থেকে পালানো বিশ বছর আগে। সীমানা পেরিয়ে কোলকাতা। আনন্দবাজার পত্রিকা অফিস খুঁজে বের করা অচেনা কোলকাতার প্রথম রাতে। অথচ তার দর্শন মেলেনি। যদিও দেখা মিলেছিল অনেক ঘটনা পরিক্রমায় শাহরুখ খানের সঙ্গে। তখনও কিং খান না হয়ে ওঠা শাহরুখ দর্শন। কিন্তু সত্যজিৎ রায় এর ‘তিন কন্যা’র নায়িকা কিংবা ‘পরমা’র নির্মাতাকে সামনা সামনি না দেখতে পাওয়ার অতৃপ্তিটা বয়ে চলা এতদিন। কমতো নয় বিশ বছর।
ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমায় নারী বিষয়ক সেমিনারের বিশেষ অতিথি হিসেবে ঢাকায় এসেছেন ৭৩ বছরেও মায়াবী অপর্ণা সেন। ১৫ জানুয়ারী সাংবাদিকদের সঙ্গে বিশেষ ‘মিট দ্য প্রেস’ হওয়ার কথা তার। সাংবাদিকতার সীমানায় থেকেও সাংবাদিকতার বাইরে কথা হয়। কথোপকথনে সাংবাদিকসুলভ প্রশ্ন উত্তরও থাকে। খুব বেশি সময় নয়। মিনিট পাঁচেক। এসময়টুকুও মহার্ঘ্য বললে অতিশয়োক্তি হবেনা।
তিনি যখন জানলেন বিশ বছর আগে সদ্য বিশ পেরনো কিশোর তার খোঁজে পাড়ি দিয়েছিল কাঁটাতারের সীমানা। তিনি সেই জাদুকরী হাসি হাসলেন। হাত মেলালেন। পাঁশে দাড়িয়ে ছবি তুললেন। আর বললেন, এবার দেখা হলতো। ‘বয়সকে নিছক সংখ্যা করে রাখলেন কি করে? তিনি মিষ্টি করে বললেন, ‘৭৩ কি খুব বেশি বয়স!’

সেমিনারে তার দিকে ছুঁড়ে দেওয়া এক প্রশ্নের উত্তরে ‘তিতলি’ অভিনেত্রী বলেছিলেন, ‘আমি তো প্রিভিলেজড পুরোটা অর্থে। বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্ত কোলকাতা ফিল্ম সোসইটির অন্যতম অগ্রনী একজন ছিলেন। ছোট থেকে বিশ্বের বিভিন্ন ধরণের চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ হয়েছে। আজ থেকে কত আগে। তাও তো ষাট বছর আগে। মা জীবনানন্দ দাশের বোন। বাসায় কবিতা হচ্ছে। গান হচ্ছে। আমার তো সিনেমার সঙ্গে না জড়ানোর কোন কারণই ছিলনা। দেখতে শুনতে খারাপও ছিলামনা। তারপরও যখন অভিনয়ের পথ ধরে নির্মাণে এলাম ১৯৮১ সালে। তাচ্ছিল্য সইতে হয়েছে ভালোরকম। জাতীয় পুরস্কারও মিলল। তাচ্ছিল্য কিছুটা কমলেও ৮৫তে পরমা’ মুক্তি পাওয়ার পর এর বিষয়বস্তু নিয়েতো জীবন যায় যায় যায় অবস্থা।
আফগানিস্তানে, ইরানে যারা কোন সুবিধা ছাড়াই আরো কঠিন পথ পার হয়ে চলচ্চিত্রের রাস্তায় হাঁটছেন তাদের জন্য অফুরন্ত সম্মান।’
সেমিনারে শোনা তাঁর কথাগুলো অলক্ষ্যে বাজছিল যেন। আর তাতে এমনিতে পরিস্কার, কেন বয়স শুধু তার জন্য সংখ্যা? বৈশ্বিক আলোয় যিনি তার জীবন সৃজনকে ভাবাতে এবং সাজাতে পারেন, তিনি জীবনের স্বাদ পরখ করে নিতে জানেন। তিনি বয়সকে তার অনুগতও করে নিতে পারেন।
নতুন করে ‘ঘরে বাইরে’ : আগামী কাজ সম্পর্কে জানতে সাংবাদিকতাসুলভ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘ঘরে-বাইরে করছি। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে-বাইরে’?’ ৩৪ বছর আগে ৮৪তে যে সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল, তার রিমেক? তিনি বলেন, ‘না। আমি করছি ট্যাগোর এর ‘ঘরে-বাইরে’। নতুন দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে চেষ্টা করব ট্যাগোরকে। ভেঙ্কটেশ ফিল্মস এটি প্রযোজনা করছে।’ 
বাড়তি আর কিছু বলেননা ‘অপরিচিত’। বাড়তি কথার কি দরকার। নতুন তথ্য যেটা মিলল তা্তেই সন্তুষ্টি।
এবং ‘সোনাটা’ : ১৫ জানুয়ারী সোমবার বিকাল সাড়ে ৫টায় পাবলিক লাইব্রেরির শওকত ওসমান মিলনায়তনে ‘উইমেন ফিল্মমেকার সেকশন’-এ প্রদর্শিত হচ্ছে অপর্ণা সেন এর নির্দেশনা ও অভিনয়ের সর্বশেষ চলচ্চিত্র ‘সোনাটা’। বিটোভেনের বিমূর্ত সঙ্গীত নোটেশন সোনাটার মতই মারাঠি সাহিত্যিক মহেশ এলকুঞ্চওয়ারের বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে তার অভিনীত ও পরিচালনায় প্রদর্শিত হবে ‘সোনাটা’ ছবিটি। 
২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া ১০৩ মিনিটের ছবিটির চিত্রনাট্য অপর্ণা সেনের নিজের। এতে সংস্কৃতের একজন অধ্যাপকের চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন। তার চরিত্রের নাম অরুণা চতুর্বেদী। শাবানা আজমি ও লিলেট দুবে। ভিন্ন মতাদর্শ সত্ত্বেও একে অন্যের বন্ধু মাঝবয়সী তিন নারীর একই বাড়িতে থাকা নিয়ে সিনেমাটির গল্প। অন্য দুই নারীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাবানা আজমী ও লিলেট দুবে। ইংরেজি ভাষার ছবিটিতে দুটি রবীন্দ্রসংগীতও গেয়েছেন শাবানা আজমি।








