অঙ্গদানের মাধ্যমে একজন মূমূর্ষ রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব। ব্রেন ডেড বা কার্ডিয়াক ডেড হলে চিকিৎসক মৃত্যু সার্টিফিকেট লেখেন। এরপর মৃতের যদি অর্গান ডোনেশান কার্ড থাকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের মতামত থাকে তবেই মৃতব্যক্তির দেহ থেকে অঙ্গসংগ্রহ করা হয়। অঙ্গ সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময়ের দেহে তাদের প্রতিস্থাপন করা হয়। জীবিত ব্যক্তিও অঙ্গদান করতে পারেন। শারীরিক সক্ষমতার উপর নির্ভর করে অঙ্গদানের অনুমতি দেয়া হয়। সাধারণ কিডনি, হৃদপিন্ড, লিভার, ফুসফুস, হাড়, অগ্নাশয়, অস্থি-মজ্জা, ত্বক এবং কর্নিয়া দান করে রোগীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
আমাদের দেশে অঙ্গদান সম্পর্কে নানান রকম ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে। ধর্মীয় এবং সামাজিক এসব কুসংস্কারের কারণে কেউ অঙ্গদান করতে চাইলেও পরিবার বাঁধা দেয়। এমনকি মরণোত্তর অঙ্গদানের অঙ্গিকার করার পরও মৃত্যুর পর পরিবারের বাঁধার কারণে অঙ্গ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। জেনে নিন অঙ্গদানের ব্যাপারে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা সম্পর্কে।
ভুল: অঙ্গদান করলে শরীর বিকৃত হয়ে যায়!
অভিজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা অপারেশনের মাধ্যমে শরীর থেকে অঙ্গ আলাদা করা হয়। এরপর মৃতদেহের সৎকারের আগে কাপড় পেচিয়ে দেয়া হয়। ফলে শরীর থেকে অঙ্গ আলাদা হওয়ার বিষয়টি বোঝা যায়না। যারা চোখ দান করেন তাদের চোখের স্থানে নকল চোখ বসিয়ে চোখের পাতা বন্ধ দেয়া হয়। এতে মৃতদেহের চেহারার কোনও পার্থক্য বোঝা যায় না। হাড় দান করলে হাড়ের স্থানে রড লাগিয়ে দেয়া হয়। ফলে মৃতদেহের ভারসাম্য নষ্ট হয় না।
ভুল: অঙ্গদানে ধর্মীয় বাঁধা আছে!
মৃত্যুর পরেও যদি কারো অঙ্গ একটি জীবন বাঁচাতে পারে, তাহলে অবশ্যই তা মহৎ কাজ। যদি কারো ধারণা থাকে যে অঙ্গদানে ধর্মীয় বাঁধা আছে, তাহলে সে নিজ ধর্মের অভিজ্ঞ কাউকে জিজ্ঞেস করে দ্বিধা দূর করে নিতে পারে।
ভুল: যে কেউ চাইলে অঙ্গদান করতে পারেন!
যে কেউ চাইলেই অঙ্গদান করতে পারেন না। অঙ্গদান করার জন্য শারীরিক ভাবে সুস্থ হতে হয়। বিশেষ করে এইচআইভি পসিটিভ, হেপাটাইটিস, ক্যান্সার অথবা অন্য কোনও ইনফেকশন থাকলে অঙ্গদান করা যায় না। এছাড়াও যেসব অঙ্গ জীবনাবস্থায় দান করা হয় সেগুলোর ক্ষেত্রে অপর অঙ্গটিও পুরোপুরি সুস্থ থাকতে হয়। নাহলে যিনি অঙ্গ দান করবেন তার জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে।
ভুল: মৃত্যুর অনেকক্ষণ পরেও অঙ্গদান করা যায়!
মৃত্যুর পর কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সব অঙ্গের কার্যকারীতা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নির্দিষ্ট সময় পর অনেক অঙ্গ সংগ্রহ করে প্রতিস্থাপন করার মত কার্যক্ষম থাকে না। সাধারণত স্বাভাবিক মৃত্যুতে ব্রেন ডেড হওয়ার ৬ ঘন্টার মধ্যে ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড, ১২ ঘণ্টার মধ্যে অগ্নাশয়, ও ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিডনি সংগ্রহ করে প্রতিস্থাপন করা যায়।
ভুল: ১৮ বছর বয়সের কম হলে অঙ্গদান করা যায় না!
প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়া না গেলেও অভিভাবকের অনুমতি থাকলে অঙ্গদান করা যায়। কারণ অনেক সময় ছোট শিশুদেরও অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের অঙ্গ প্রতিস্থাপনযোগ্য হয় না অধিকাংশ সময়।
ভুল: ডাক্তার যদি জানে আমি অঙ্গদান করবো, তাহলে তারা আমার চিকিৎসা করবে না!
এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আপনি যদি অসুস্থ থাকেন তাহলে ডাক্তারের সর্বপ্রথম চেষ্টা থাকবে আপনার জীবন বাঁচানো। অঙ্গ সংগ্রহের জন্য আপনার জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলবেন না ডাক্তাররা। শুধুমাত্র মস্তিষ্কের মৃত্যু নিশ্চিত করার পরেই ডাক্তার আপনার শরীর থেকে অঙ্গ সংগ্রহ করতে পারবেন।
ভুল: অঙ্গদানের সিদ্ধান্ত পরিবারকে না জানালেও চলবে!
আপনার অঙ্গদানের ইচ্ছার কথা অবশ্যই পরিবারকে জানিয়ে রাখতে হবে। কারণ আপনার অঙ্গদানের ইচ্ছার কথা মৃত্যুর আগেই পরিবারের জানা থাকলে সঠিক সময়ে অঙ্গদান করা সম্ভব হবে। অন্যথায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
ভুল: অঙ্গদান শুধু ধনী এবং নায়ক-নায়িকারাই করতে পারে
অনেক বিখ্যাত মানুষেরাই মরণোত্তর অঙ্গদান করেন। তাই সাধারণ মানুষের মাঝে কেউ কেউ ভাবেন শুধু ধনী এবং নায়ক-নায়িকারাই অঙ্গদান করতে পারেন। কিন্তু এটা ভুল ধারণা। যে কোনও সুস্থ মানুষই অঙ্গদান করতে পারেন।
অঙ্গদানের মাধ্যমে একজন মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্নটাকে সত্য করা সম্ভব। জীবিত অবস্থায় কিংবা মরণোত্তর অঙ্গদানের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য চাই প্রচারণা। সমাজের সব স্তরের মানুষের মাঝে অঙ্গদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে প্রচার করলে ভ্রান্ত ধারণাগুলো দূর করা সম্ভব হবে।









