চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সম্পর্ক

ওর কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। ওর সঙ্গে যে আমার মধুর একটা সম্পর্ক আছে তা বন্ধুমহলে প্রায় সবাই জানে। বয়সে আমার চেয়ে বছর চারেকের ছোট। তারপরও ও আমার বন্ধু। খুব ভালো বন্ধু। এক সময় ছিল পত্রমিতা। তারপর জীবনের ব্যস্ততায় পত্র বিনিময় দূর। চাকরি সূত্রে দেশের বিভিন্ন স্থানে ওর বিচরণ। ওর দুটি আস্তানায় আমার উপস্থিতি ছিল। স্বল্প সময়ের জন্য।

মূলত আমার বন্ধু ছিল দিয়া। দিয়াকে সপ্তাহে দুই দুইটা চিঠি লিখতাম। ওর সুন্দর হস্তাক্ষরের মিষ্টিমাখা জবাবও পেতাম। দিয়াই পত্র মারফত জয়িতার কথা জানায়। জয়িতা যদি আমাকে চিঠি লিখে তবে উত্তর দিব কিনা জানতে চায়। আমি সবুজ সংকেত দিলে জয়িতা চিঠি লিখে আমাকে। আমি চিঠির জবাব দেই। আমি চিঠি লিখি ওকে। ও জবাব দেয়।

বিজ্ঞাপন

দিয়া জয়িতা দুজনই সাহিত্য ভীষণ ভালোবাসে। আমি সাহিত্যের ছাত্র। বিজ্ঞান বিভাগ ছেড়ে বাংলায় পড়াশোনা করছি। বাবা-মায়ের আশাকে জলাঞ্জলি দিয়ে আমি অনেকটা না ঘর না ঘাটকা। বাসায় আমার কদর কমে গেছে। আম্মা-আব্বা আগের মতো তেমন আন্তরিকভাবে কথা বলেন না। ভাইবোনেরাও কেমন যেন দূর গ্রহের বাসিন্দা।

আমি তখন ফ্যান্টাসির জগতে। লেখালেখি করি। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দৈনিকে ছড়া-গল্প-কবিতা-ফিচার ছাপা হচ্ছে। ক্লাসে রবীন্দ্র-নজরুল-মাইকেল-জীবনানন্দ দাশদের পোস্টমর্টেম করি। বাংলা সাহিত্যের রথী-মহারথীদের কালজয়ী রচনা নিয়ে ভালোমন্দ মতামত যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করি।

আমি যে সময়ের কথা বলছি সেই সময় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে সমরেশ মজুমদার ও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়।  সমরেশ মজুমদারের কালবেলা, কালপুরুষ ও গর্ভধারিনী এবং শীর্ষেন্দুর মানবজমিন, যাও পাখি পড়ে যারপর নাই অভিভূত। আমার আর জয়িতার চিঠিতে সমরেশ-শীর্ষেন্দুর উপন্যাসের চরিত্ররা নতুনত্ব পেত। জয়িতার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ার পর দিয়ার সঙ্গে পত্র-যোগাযোগ অনেকটা কমে যায়। মাসে একটা পত্রতাও কেমন আছো-কি করছ-ইত্যাদিতেই সীমাবদ্ধ থাকত।

দিয়া-জয়িতা দুজনই খুব ভালো। সুন্দর মনের অধিকারী। তবে দিয়া চুপচাপ-জয়িতা প্রাণচঞ্চল। উড়ু উড়ু আমি জয়িতার সঙ্গে পত্র যোগাযোগ আরো বাড়িয়ে দেই। একদিন পর পর চিঠি পাওয়া চাই দুজনেরই। তা না হলে কি যেন নেই নেই মনে হয়।

বিজ্ঞাপন

জয়িতার আমন্ত্রণে হাজির হয়েছিলাম ওদের শহরে। দিয়াকে জানানো হয়নি আমার আসার খবর। জয়িতাকে নিয়ে বেউথা নদীপাড়ে ঘুরেছি। বেউথার জলে গা ভিজিয়েছি জয়িতার। আমার হাতে হাত রেখে জয়িতা বলেছিল-জানিস মিতু, আমি কোনোদিন বিয়ে করব না। বিয়ে জিনিসটা আমার একদম পছন্দ না।
আমি অবাক হয়ে জয়িতার দিকে তাকিয়েছিলাম। প্রশ্ন করেছিলাম-তোর কি কোনো সেক্সুয়াল অনুভূতি নেই?
না। আমার কোনো সেক্সুয়াল অনুভূতি নেই।
আমি হো হো করে হেসেছিলাম।
জয়িতা এতে রাগ করেনি। আমার হাতটা ওর হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল, আমি যখন চাকরি করব-সুন্দর একটা বাসা নিব। ওই বাসার একটা চাবি থাকবে আমার কাছে-আর একটা তোর কাছে।
আমি মিটি মিটি হাসি।
আর শোন-তোকে নিয়ে একদিন বলধা গার্ডেনের পদ্মপুকুর পাড়ে বসে থাকব সারা বিকেল।
হু। তারপর… আমি জানতে চাই।
তোকে নিয়ে বগালেকে যাব। ক্রেওকাডাং পাহাড়ে চড়ব।
তারপর…
আরো আরো অনেক কিছু। আমার হাতটায় জোরে ঝাঁকি দিয়ে বলল, সন্ধ্যা হতে চলল-বাড়ি ফিরব।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আমার একটা অ্যাকাউন্ট আছে। অফিসে কাজের ফাঁকে ওখানে একবার উঁকি দেওয়া হয়। সে রকম উঁকি দিতে গিয়ে নজরে পড়ল জয়িতা জয়ন্তি নামটা। অ্যাকাউন্টে ঢুকে দেখার ইচ্ছে হলো বন্ধুকে। খবর জানার আগ্রহ হলো।

জয়িতা-সুমন্তর ৭ম বিবাহবার্ষিকী। বেশ কিছু ছবি আপলোড করা আছে বিবাহবার্ষিকীর। অনেক ছবিতে জয়িতার সঙ্গে দিয়াকেও দেখলাম। জয়িতার পাশে দাঁড়ানো ওর স্বামী-সামনে বছর পাঁচ-ছয়ের একটি ছেলে। ছবি দেখে আনন্দিত হলেও মনে মনে হাসলাম। ভাবলাম-এই তো জীবন-যার শেষ বলে কিছু নেই।
দিয়ার ভাই আকাশ আমার সহপাঠী। একসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। যদিও ও বিজ্ঞান বিভাগে আর আমি মানবিকে। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে কথা হয়। জাস্ট হাই-হ্যালো, কুশল বিনিময়।
আকাশকে ফোন করে দিয়ার মোবাইল নম্বর নিলাম।

অনেকদিন পর দিয়া আমার ফোন পেয়ে বেশ খুশি হলো। জানতে চাইল আমার খবরাখবর। আমিও ওর খবর নিলাম। যদিও ওর সব খবর আমি আকাশের কাছেই পেয়ে যাই। দিয়াকে বললাম জয়িতার মোবাইল নম্বর দিতে। দিয়া ম্যাসেজ করে নম্বর পাঠিয়ে দিল।

জয়িতাকে ফোন করার লোভ সামলাতে পারছিলাম না। খুব কৌতূহল হচ্ছিল সেক্সুয়াল অনভূতিহীন মানুষটি কীভাবে সংসারে জড়ালো-সন্তানের মা হলো। আমার ফোন পেয়ে জয়িতার বাঁধ ভাঙা খুশি। আমার বিয়ের কথা জয়িতা জানত। এখন জানতে চাইল সন্তানের কথা। জানালাম পরীর কথা-আমার প্রিয় আত্মজার কথা।
তারপর-তুমি জয়িতা জয়ন্তী-বলতেই হেসে উঠল জয়িতা। বলল, একসঙ্গে চাকরি। পাশাপাশি টেবিলে বসা। চাকরিসূত্রে একসঙ্গে দেশের নানা জায়গায় যাওয়া-আসা। ব্যস-হয়ে গেল।
আমি হো হো করে হেসে উঠলাম।

একদিন তিন বন্ধু জয়িতার বাসায় একত্রিত হলাম। বাড্ডায় তিন রুমের ফ্ল্যাট নিয়ে জয়িতার ঢাকার জীবন। ঘুরে ঘুরে বাসা দেখাল। এক রুমে ছেলে অয়নকে নিয়ে ও থাকে। পাশের রুমে থাকে সুমন্ত। ওর স্বামী। আরেকটা গেস্টরুম।
আমি জয়িতার দিকে হাত বাড়িয়ে বরলাম, বাসার একটা চাবি দে।
জয়িতা হেসে উঠল। দিয়া তাকাল আমাদের দুজনের দিকে। এ বিষয়টা ওর জানা নেই।
কাজের ব্যস্ততায় নিজের বৃত্তে হারিয়ে যাই। দিয়া-জয়িতা দূরে পড়ে থাকে।
রাতে বাসায় ফেরার পথে দিয়ার ফোন।
কিরে কেমন আছিস?
ভালো। তুই?
আমি ভালো। তা জয়িতার বাসায় বেরিয়ে এলি-কেমন লাগল আমাদের সান্নিধ্য তা তো জানালি না।
দিয়ার কথায় একটা প্রশ্ন মনে পড়ে গেল। যা জয়িতার বাসা থেকে আসার পর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
আচ্ছা-জয়িতার সঙ্গে ওর হাসব্যান্ডের রিলেশন কেমন রে?
আমার প্রশ্ন শুনে দিয়া কিছু সময় চুপ করে থাকল। তারপর বলল, হঠাৎ এ প্রশ্ন করছিস কেন?
না, মানে ওরা আলাদা রুমে থাকে কিনা তাই।
হা হা হা করে হেসে উঠল দিয়া। আমার কান ফেটে যাবার উপক্রম।
খুব যে হাসলি। আমি জানতে চাই।
না-এমনি।
এমনি কেন? বলতে সমস্যা।
না, কোনো সমস্যা নেই বলতে। তবে না জানলেই বোধ হয় ভালো।
আমি কখনও কারো বিষয়ে অতটা কৌতূহল দেখাই না। যদি কেউ কোনো প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যেতে চায় তবে আমি সে সুযোগ দেই।
থাক-না বলতে চাইলে বলিস না।
না, মানে…। দিয়া নীরব।
ঠিক আছে। বলার দরকার নেই।
না, ঠিক নেই। অনেকদিন ভেবেছি তোকে বলব ব্যাপারটা। তারপর মনে হয়েছে-না বলাই ভালো। এতে তোর মন খারাপ হবে।
আমি শুনে যাই। কোনো কথা বলি না।
কী-চুপ মেরে গেলি যে। দিয়ার জিজ্ঞাসা।
না-তোর কথা শুনছি।
দিয়া বলে, জয়িতার ছেলে অয়ন, সুমন্তর ছেলে নয়।
তাহলে কার। আমি জানতে চাই।
জয়িতা যে সংস্থায় চাকরি করে সেই সংস্থার কানাডীয় ডোনার মিস্টার এডগারের।
মানে! আমি অবাক হই।
এডগারের সঙ্গে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয় জয়িতার। ওদের সংস্থার কার্যক্রম দেখাতে এডগারকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এডগার ওকে এতটাই মুগ্ধ করে যে ও এডগারের সঙ্গে স্বর্গবাস করে। সেই স্বর্গবাসের ফসল অয়ন।
এতটুকু বলে থেমে যায় দিয়া।
তারপর… আমার জিজ্ঞাসা।
বাংলাদেশ পর্ব শেষে এডগার দেশে ফিরে যায়। জয়িতার গর্ভে রেখে যায় ওর চিহ্ন। জয়িতা বুঝতে পারেনি এরকমটা হবে। সতর্ক থেকেও সন্তান ধারণ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেনি। ও তো বরাবর অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। তাই সন্তান নষ্ট করার কথা ভাবেনি। কুমারী মাতা হলে কেমন হয়-এই বোধে সিদ্ধান্ত নেয় সে মা হবে।
ওর পাশে বসা-মানে ওর সহকর্মী সুমন্ত ব্যাপারটা বুঝতে পারে। ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে দেয় জয়িতার দিকে। জয়িতা সুমনকে বার বার বুঝিয়েছে-তুমি অবিবাহিত। তোমার সামনে সুন্দর ভবিষ্যত। সুন্দর একটা মেয়েকে বিয়ে করবে। ঘর আলো করে সন্তান আসবে। আমি তো তোমাকে কিছুই দিতে পারব না। সেক্স ব্যাপারটা আমি একদম অপছন্দ করি। আমার যা হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত।
সুমন জয়িতার সঙ্গে বাসায় এসেছে। জয়িতার মাথায় হাত রেখে বলেছে-আমি কখনও কোনোদিন তোমাকে সেক্সুয়ালি ডিস্ট্রার্ব করব না।
জয়িতা জানতে চায়-কেন করবে না। তুমি কি সিদ্ধ পুরুষ।
সুমন্ত জানালার দিকে তাকিয়ে চোখের জল লুকায়।
তোমাকে ডিস্ট্রার্ব করার মতো কিছুই যে আমার নেই।
মানে? সুমনের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায় জয়িতা।
সুমন মাথা নিচু করে বলে, ছোটবেলায় একটা এক্সিডেন্টে আমি আমার পুরুষত্ব হারিয়েছি। জয়িতা-তুমি শুধু আমাকে তোমার বুকে ঠাঁই দিও।
জয়িতা দুহাতে সুমনকে জড়িয়ে ধরে।
কিন্তু তোমার পরিবারকে আমার সন্তানের কি পরিচয় দিবে?
সেটা আমার উপর ছেড়ে দাও।
জয়িতা দুহাতে সুমন্তর মুখটা তুলে ধরে ঠোঁটে একটা দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দেয়।
জয়িতার মনে হলো ওর শরীরের ভেতরটা বুঝি বেশ একটা ঝাঁকুনি খেল।
দিয়া আর কিছু বলে না। লাইনটা কেটে দেয়।
বাসের কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে ওঠে-কমলাপুর, কমলাপুর। অ্যাই নামেন কমলাপুর।
আমি তন্দ্রাহতের মতো বাস থেকে নামি। হাঁটতে থাকি চেনা পথে অচেনা পথিক। আর ভাবতে থাকি সম্পর্কের সংজ্ঞা নিয়ে।