রাজধানীর শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ডিজিটাল স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে ঘুমের ঘাটতি, স্থূলতা, চোখ ও মাথাব্যথার সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআর,বি । সংস্থাটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার অধিকাংশ শিশু প্রতিদিন মোবাইল, টেলিভিশন, ট্যাব বা কম্পিউটারে দীর্ঘ সময় কাটাচ্ছে।
২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার ছয়টি স্কুলের তিনটি বাংলা মাধ্যম ও তিনটি ইংরেজি মাধ্যম ৬ থেকে ১৪ বছর বয়সী ৪২০ জন শিশুর ওপর গবেষণাটি পরিচালিত হয়। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব মেডিকেল ইন্টারনেট রিসার্চ (জেএমআইআর) হিউম্যান ফ্যাক্টরস-এ।
গবেষণায় শিশুদের সাক্ষাৎকার, শারীরিক পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কয়েকটি প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে তাদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়, ঘুমের মান, ওজন এবং আচরণগত ও মানসিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এ ক্ষেত্রে পিটসবার্গ স্লিপ কোয়ালিটি ইনডেক্স (পিএসকিউআই), স্ট্রেংদস অ্যান্ড ডিফিকাল্টিস কোয়েশ্চেনেয়ার (এসডিকিউ) এবং ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং অ্যাসেসমেন্ট (ডিএডব্লিউবিএ) ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে ৪ জন বা ৮৩ শতাংশ শিশু প্রতিদিন দুই ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিন ব্যবহার করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিনোদনমূলক স্ক্রিন ব্যবহারের সীমার চেয়ে বেশি। গড়ে একজন শিশু প্রতিদিন প্রায় ৪ দশমিক ৬ ঘণ্টা স্মার্টফোন, টিভি, ট্যাবলেট, কম্পিউটার ও গেমিং ডিভাইসে সময় কাটায়।
এতে দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় ভুগছে এবং প্রায় ৮০ শতাংশ শিশু নিয়মিত মাথাব্যথার অভিযোগ করেছে। দিনে দুই ঘণ্টার বেশি স্ক্রিন ব্যবহারকারী শিশুরা গড়ে মাত্র ৭ দশমিক ৩ ঘণ্টা ঘুমায়, যেখানে এই বয়সী শিশুদের সুস্থ বিকাশের জন্য ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, প্রায় ১৪ শতাংশ শিশু অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের ঘাটতি শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক বৃদ্ধি ও সামগ্রিক মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এছাড়া প্রতি ৫ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ২ জন দুশ্চিন্তা, অতিচঞ্চলতা বা আচরণগত সমস্যার মতো অন্তত একটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, রাতে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার মস্তিষ্ককে উত্তেজিত করে এবং ঘুমের স্বাভাবিক চক্র ব্যাহত করে। একই সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে খেলাধুলা ও শারীরিক পরিশ্রম কমে গিয়ে স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি, মাথাব্যথা এবং মনোযোগ কমিয়ে দেওয়ার কারণও হতে পারে। পাশাপাশি সরাসরি সামাজিক মেলামেশা কমে যাওয়ায় শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বি -র অ্যাসিস্ট্যান্ট সায়েন্টিস্ট ডাঃ শাহরিয়া হাফিজ কাকন বলেন, “বাবা-মায়েদের উচিত শিশুদের দেরিতে ঘুমানো, ঘনঘন মাথাব্যথা, চোখের অস্বস্তি, খিটখিটে আচরণ, বাইরের খেলাধুলায় অনীহা কিংবা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা। এগুলো অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ইঙ্গিত হতে পারে।”
শিশুদের চোখের সুরক্ষায় গবেষকরা ‘২০-২০-২০’ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট স্ক্রিন ব্যবহারের পর ২০ ফুট দূরের কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকতে হবে।
আইসিডিডিআর,বি-র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ডিজিটাল ডিভাইস এখন জীবনের অংশ হলেও শিশুদের সুস্থতার জন্য এর ব্যবহার সীমিত রাখা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী স্কুলগামী শিশুদের বিনোদনমূলক স্ক্রিন টাইম দিনে দুই ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত।
তিনি আরও বলেন, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাইরের খেলাধুলা, পর্যাপ্ত ঘুম, পারিবারিক সময় এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে। বিতর্ক, দলবদ্ধ পড়াশোনা, লাইব্রেরিতে যাওয়া কিংবা গাছের যত্ন নেওয়ার মতো কার্যক্রমে শিশুদের সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
গবেষকদের মতে, প্রযুক্তি পুরোপুরি বন্ধ করা নয়, বরং শিশুদের জন্য বাড়ি ও স্কুলে স্বাস্থ্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও সহজ নির্দেশিকা চালুর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।








