চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সত্য নয়, বিভ্রান্তির ইতিহাস

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শিরোনামে ডাক অধিদপ্তরের প্রকাশ করা স্মারক ডাকটিকেট, উদ্বোধনী খাম প্রকাশের পর সমালোচনার মধ্যে পড়ে প্রায় চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার মত বলছেন ইতিহাসের সত্যের মুখোমুখি হতে।

মন্ত্রী একের পর এক এই বিষয়কে যেভাবে জায়েজিকরণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন তাতে বাস্তবতাবিবর্জিত এক সত্যকে সামনে নিয়ে আসছেন। এখানে প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতার সংশ্লেষ নাই, কারণ ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনায় তৎকালীন নামের পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা হলেও ইতিহাসের প্রয়োজনেই সে নাম হারিয়ে গেছে। এরপর আরও অনেক নামে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রতিষ্ঠাকালের নামের যে অংশ আছে সেটা কেবলই ‘ছাত্রলীগ’।

বিজ্ঞাপন

এই সময়ে ছাত্রলীগের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি হারিয়ে গেছে, ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দদ্বয়ও হারিয়ে গেছে। এখন এই সংগঠনের নাম ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’। সে হিসেবে ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকাল হলেও সংগঠনের ওই নাম থেকে অন্তত তিনটি শব্দ হারিয়ে গেছে, দেশীয় প্রেক্ষাপটে চরিত্রও পালটে গেছে; এবং এটাই স্বাভাবিক।

ছাত্রলীগের নামের ইতিহাসের সঙ্গে অনেক নাম জড়িত। এই নামের সংগঠনটির সঙ্গে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রের যোগ আছে। নামের সঙ্গে আছে ব্রিটিশ আমলেরও যোগ, ব্রিটিশ আমলের ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে শেখ মুজিবের সম্পৃক্ততাও ছিল। নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ- এই এত নামের যোগ রয়েছে সংগঠনটির। ডাক অধিদপ্তর যদি ইতিহাসের সত্যকে সামনে আনে তাহলে ছাত্রলীগের নামের সঙ্গে সেই ব্রিটিশ আমলের ছাত্রলীগকে কি টেনে আনার চেষ্টা হচ্ছে না? ব্রিটিশ আমলের ছাত্রলীগ নামকে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি যদিও ভাবছি না, তবে মন্ত্রী যখন তার ভাষায় ‘ইতিহাসের সত্যের মুখোমুখি’ দাঁড় করাতে যান তখন সেটা সামনে আসাটাই ত স্বাভাবিক।

মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধিকার-স্বাধীনতার আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের প্রতি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কারণে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সরকারি আয়োজনে কোন কিছু করার সময়ে যদি পাকিস্তান আমলকে মুখ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উল্লেখ করা হয় তখন আদতে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়; বর্তমান অবস্থান, অদ্যকার নামকে গৌণ হিসেবে দেখানো হয়। ডাক অধিদপ্তরের পক্ষে মন্ত্রীর যুক্তিকে যদি অকাট্য যুক্তি হিসেবে হয় তাহলে একটা সংগঠনের সময়-সময়ে একেক নামের সঙ্গে সঙ্গে একেক জন ব্যক্তির তৎকালের পরিচিতিই মুখ্য হয়ে ওঠে।

শোনা যাচ্ছে, এই বছরের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ডাক অধিদপ্তর ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে স্মারক ডাকটিকেট ও উদ্বোধনী খাম প্রকাশ করবে। এটা যদি সত্যি সত্যি ঘটে যায় তবে আরও এক লজ্জার কারণ হবে আওয়ামী লীগের। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার আমাদেরকে ইতিহাস শেখাতে গিয়ে কি পূর্ব পাকিস্তান নামকেই মহিমান্বিত করছেন না? এরমাধ্যমে কি একাত্তরের শহীদ, একাত্তরের বীরাঙ্গনা, একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের সেই ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন না? কারণ পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রের গঠন ও অর্জনে আমরা যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও রক্তের ইতিহাস গড়েছিলাম সেটা কি ডাক অধিদপ্তরের ইতিহাসের কথিত সত্য উন্মোচনের সঙ্গে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র রক্তের অক্ষরে অঙ্কিত হয়েছিল সেই রাষ্ট্রের নাম স্বাধীন বাংলাদেশে সরকারি তরফে আনুষ্ঠানিকরণ কি আমাদের পরাজয় নয়? যে বা যারা পূর্ব পাকিস্তান নামে এখনও স্মৃতিকাতর তারা কি ভুলে যাচ্ছেন একাত্তরের ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে পরিচিত হবে বলেও এই বার্তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ইতিহাসই আন্দোলন, সংগ্রাম, রক্তদানের ধারাবাহিকতায় অর্জিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সত্যিকারের ইতিহাস।

ডাক অধিদপ্তর পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের নাম স্মরণ করেছে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ইতিহাসের স্মরণ হয়ত করতে চায়; এরই ধারাবাহিকতায় তারা কি ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাসকেও স্মরণ করবে? তারা কিংবা অন্য কেউ কি বলবে- ‘‘পাকিস্তানের জন্ম না হলে পূর্ব পাকিস্তান হতো না, পূর্ব পাকিস্তান না হলে এই অঞ্চলের মানুষদের ওপর নিপীড়ন চলত না, নিপীড়ন না চললে এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগত না, মুক্তিযুদ্ধ হতো না, বাংলাদেশের জন্ম হতো না!’’ ধারণা করি তারা কিংবা নীতিনির্ধারকদের কেউ চাইলেও এসব বলতে ও করতে পারবে না। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস এই দেশে কখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করা হবে না জানি, তবে ডাক অধিদপ্তরের স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশের পর মন্ত্রীর যুক্তিগুলোকে যদি কেউ যৌক্তিক ভাবে সেও কিন্তু পালন করার পক্ষের লোক হিসেবে দাঁড়িয়ে যায়। জানি প্রসঙ্গক্রমে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালনের উল্লেখের কথাটাও খোড়া যুক্তি, কিন্তু কোনো খোড়া যুক্তির বিপক্ষে কথা বলতে মাঝেমধ্যে এমন খোড়া যুক্তি প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করতে হয় বৈকি! এতে করে আদি ও খোড়া যুক্তিদাতার যুক্তিগুলোর অসারতা প্রমাণ হয়।

লেখক হাসান মোরশেদ ফেসবুকে ‘একটা দুষ্টু চিন্তা’ শিরোনামে ছোট্ট করে তাৎপর্যপূর্ণ একটা প্রশ্ন করেছেন। তিনি লিখেছেন- ‘‘এ বছর সরকারিভাবে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম শতবার্ষিকী’ উদযাপন হয় কী করে? সরকারের মন্ত্রী জব্বার সাহেবের যুক্তি অনুযায়ী ‘মূল’ বিবেচনা করতে হবে। ২০২১ এর ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের নয়, উদযাপন করতে হবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী- যেহেতু ১৯৪৮ সালে উহা বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছিলো না। ১৯২০ সালে শেখ মুজিবুর রহমানও তো জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন না! ডিয়ার মিনিস্টার, ফাঁকগুলো বুঝেন? ফাঁদগুলো? কীসব লজিক্যাল বিপদ ডেকে এনেছেন?’’

ডাক অধিদপ্তর ও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কথিত সত্য ইতিহাস দেশবাসীকে বিভ্রান্তির মুখে ফেলছে। ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া পূর্ব পাকিস্তানকে সামনে আনতে গিয়ে বাঙালির দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধের গৌরবকে কি আড়াল করছে না? কারও ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় বিভ্রান্তিকর এসব উদ্যোগ, জায়েজিকরণের খোড়া যুক্তিগুলোকে এখনই থামিয়ে দেওয়া জরুরি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন