চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মোহময়ী’ একজন কবরীর বিদায়

চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টি মেয়ে’ খ্যাত সেরা অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী মৃত্যুঅব্দি চলচ্চিত্র, রাজনীতি, নারী অধিকার- সবকিছুতেই দারুণ এক আভিজাত্য নিয়ে অগ্রগামী ছিলেন। দেশের অন্য যে কোন অভিনেত্রীর বেলায় ঠিক এমন একাগ্রতা ও সার্বিক পরিপূর্ণতা চোখে পড়ে নি। কবরী’র প্রয়াণের কয়েকদিন পর এই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলাম বর্ষিয়ান সিনে সাংবাদিক আব্দুর রহমানের কাছে। যিনি সাংবাদিকতার সূত্রে রুপালী পর্দার সেরা অভিনেত্রী কবরীকে চিনেন- জানেন কবরীর ক্যারিয়ারের প্রায় পুরো সময়টা ধরেই। কবরী মারা যাওয়ার আগে যিনি বেশ কয়েকবার চ্যানেল আই-এর ‘সাময়িকী’ নামক অনুষ্ঠানে তার দীর্ঘ সাক্ষাৎকারও নিয়েছেন।

সাংবাদিক আব্দুর রহমান প্রশ্ন শুনে প্রথমেই ‘অনন্য অসাধারণ এক জীবন’ এই কথাগুলো উচ্চারণ করে বললেন, ‘চলচ্চিত্রের অনেককেই কাছ থেকে দেখলাম, জানলাম। কিন্তু কবরী আপা একেবারেই ডিফরেন্ট, এক আলাদা সত্তা। আমৃত্যু হৃদয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে থাকলেন। চলচ্চিত্রের মাঝেই ভেসে বেড়ালেন এবং সেটা বিরামহীন। তার এই ডেডিকেশন মাইলস্টোন হয়ে থাকলো।’ ফের যোগ করলেন এই বলে, ‘বয়স সত্তুর পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনি ‘এই তুমি সেই তুমি’ নামে চলচ্চিত্র তৈরিতে হাত দিলেন। শুটিংও শেষ করে ফেলেছিলেন। হয়ত আর কিছুদিন বাঁচলে তিনি নিজের কাজটির শেষটুকু দেখে যেতে পারতেন। বলতে পারি এ দেশে আর কোনো একজন কবরীর জন্ম হবে না।’

সারাহ বেগম কবরী প্রয়াত হয়েছেন গত ১৭ এপ্রিল। তিনি করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন, ৫ এপ্রিলের ফলাফলে যা নিশ্চিত হয়েছিল। এরপর দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। সবার বিশ্বাস ছিল তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু শেষমেশ তার জীবনাবসনের সংবাদ দেশের কোটি কোটি মানুষের হ্নদয়কে ভারাক্রান্ত করে। ষাট-সত্তর-আশির দশক জুড়ে কবরী নামটি উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত পেরিয়ে সাধারণ পরিবারের সবার কাছেই হয়ে উঠেছিল এক প্রিয় নাম। শান বাঁধানো ঘাটে তরুণীদের আলোচনা থেকে শুরু করে ঘরের নববধূকে নায়িকা কবরী অভিনীত একটি ছবি দেখানোর বিষয়টি মধ্যবিত্ত পরিবারের রেওয়াজে পরিণত হয়ে উঠেছিল সেসময়। সত্তর-আশির দশকে স্বামীর কাছে স্ত্রীর কবরী অভিনীত একটি ছবি দেখার আবদার ছিল অনিবার্য।

ক্যারিয়ারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রুপালি পর্দায় নিঁখুত অভিনয় দিয়ে কবরী জনমানসে বরাবরই অন্যরকম এক অনুভূতি তৈরিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সিনেমায় রোমান্স,মান-অভিমান, রাগ-অনুরাগ, প্রেম-বিরহ ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি নিজস্ব অনবদ্যতায়। পোশাকে-সংলাপ চয়নেও কবরী নিজের একটা আলাদা ট্রেন্ড বা ধারাও তৈরি করেছিলেন। ৬৪ সালে ‘সুতরাং’ ছবি দিয়ে চলচ্চিত্রে পা রাখেন চট্টগ্রামের মেয়ে মীনা পাল (কবরী)। এই ছবিতে নাম লেখানোর পর তার পারিবারিক নাম বদলে দেন ছবির পরিচালক সুভাষ দত্ত। আত্মজীবনী স্মৃতিটুক থাক গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘‘আলো ঝলমল ঢাকা শহর। মীনার চোখে স্বপ্ন। ‘সুতরাং’ দিয়ে বাংলার মানুষের মনে এক চিলতে ঠাঁই করে নেওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম, অনেক সংগ্রাম। কত নতুন কিছু বুঝতে হবে, জানতে হবে, শিখতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে। এক হাজার এগারো টাকা পূুঁজি নিয়ে বাংলার সাতকোটি মানুষের হ্নদয় দখল নেয়া ছিল অনেক কঠিন কাজ। পুলসিরাত পার হতে লেগেছিল অনেক বছর। ফিল্মে কাজ করতে চট্টগ্রামের ফিরিঙ্গিবাজারে বেড়ে ওঠা কিশোরী মীনার নাম বদলে দত্ত দা রাখলেন- কবরী। রুপালি পর্দার নায়িকা ‘কবরী’ নামই হয়ে গেল আমার নতুন জীবনের পরিচয়। আমিও ধীরে ধীরে মিনার খোলস ছেড়ে কবরী মোড়কে বন্দী হয়ে গেলাম।’’

সুতরাং ছবির পরে অভিনয় করেন ‘সাতভাই চম্পা ছবি’ দিয়ে। দ্রুতই চলচ্চিত্রাঙ্গনে ‘মিষ্টি মেয়ে’ হিসেবে খ্যাতি পান তিনি। এরপর নায়ক রাজ্জাকের সাথে প্রথম ‘আবির্ভাব’ ছবিতে জুটি হন। এই জুটি সবার মন জয় করে ফেলে নিমিষেই। এরপর কবরী নায়ক রাজ্জাকের সাথে জুটি বেধে অভিনয় করেন ময়নামতি (১৯৬৯), নীল আকাশের নীচে ( ১৯৬৯). ক খ গ ঘ ঙ (১৯৭০), দর্পচূর্ণ (১৯৭০), কাঁচ কাটা হীরে ( ৯৭০), স্মৃতিটুকু থাক (১৯৭১), রংবাজ ( ১৯৭৩), গুন্ডাসহ আরও অনেক ছবি। ওপারের উত্তম-সূচিত্রা জুটির মতো এপারে রাজ্জাক-কবরী জুটিও প্রভাবিত করে মধ্যবিত্ত মনকে। ৭৩ সালে কবরী ঋত্তিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে অভিনয় করে আরও অনন্য সাক্ষর রাখেন। ৭৫ সালে প্রমোদকরের পরিচালনায় ‘সুজন সখি’ ছবি তাঁকে সবশ্রেণীর মানুষের হ্নদয় মন্দিরে পৌঁছে দেয়। এই রেশ কাটতে না কাটতেই ৭৮ সালে আব্দুল্লাহ আল মামুনের ‘সারেং বউ’ তাকে নিয়ে যায় আরেক নতুন মাত্রায়। ৮২ সালে চাষী নজরুল ইসলামে দেবদাসে পারুর অভিনয় করেন। ‘সুজন সখি’-‘সারেং বউ’- দেবদাস-‘কবরী’ সমার্থক হয়ে উঠে। এসবের বাইরে বিনিময়, কত যে মিনতি, যে আগুনে পুড়ি, দ্বীপ নিভে নাই, আমার জন্মভূমি, ব্ঈেমান, মাসুদ রানা, বলাকা মন, আকাবাঁকা, সাগরভাসা, তৃষ্ণা, কুয়াশা, লাভ ইন সিমলা, প্রেমবন্ধন, কলমীলতা, আরাধনা, ছোট মা, বধুবিদায়, দুই জীবন-প্রভৃতি ছবিতে তার অনবদ্য অভিনয় সমাদৃত হয় সর্বত্র। আর তাই ক্যারিয়ারের এই সন্ধিক্ষণে এসে স্বীকৃতি স্বরুপ একের পর এক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারসহ নানাবিধ পুরষ্কারে তিনি ভূষিত হন।

বিজ্ঞাপন

কবরী সম্পর্কে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘‘কবরী আসলে বাঙালি নারীর উৎকৃষ্ট এক প্রতিনিধি। মধুমিতা সিনেমা হলে ‘সুতরাং’ ছবিতে প্রথম তাকে দেখি। তিনি শুধু অভিনয় জগতে নয়, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে সমাজ উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন এবং রাজনীতিতেও অনেক অবদান রেখেছেন। একজন জনপ্রিয় নায়িকা হওয়ার পরও তাকে দেখেছি সবসময় সাধারণভাবে চলতে, কথা বলতে। আলাপে-আচারণে সবসময় সাধারণ থেকেছেন। রাজনীতিতে তিনি আরও অনেক অবদান রাখতে পারতেন।নায়িকা কবরী সরাসরি রাজনীতির ময়দানে আসেন ২০০৮ সালে। অবশ্য আগে থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট করতেন সক্রিয়ভাবে। ২০০৮ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন পান।

দলীয় মনোনয়ন পেলেও নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের ভেতর থেকে তীব্র বাধার সম্মুখীন হন। ওসমান পরিবার তাকে নির্বাচনে হারাতে মরিয়া হয়ে উঠে। কিন্তু সব বাধা ষড়যন্ত্র ছিন্ন করে শেষ পর্যন্ত সারাহ বেগম কবরী বিজয়ী হন। বিএনপির দলীয় প্রার্থী মো. শাহ আলমকে মাত্র ২৩৮৯ ভোটে পরাজিত করেন। তিনি মোট ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৭৫ ভোট পান। মো. শাহ আলম পান ১ লক্ষ ৩৮ হাজার ৬৮৬ ভোট। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের অন্য চারটি আসনেই আওয়ামী লীগের অন্যান্য প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজী, মো. নজরুল ইসলাম বাবু, আব্দুল্লাহ আল কায়সার, নাসিম ওসমান গড়ে ৫০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ীহন। এই বিজয়ের পর কবরী বলেছিলেন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি কত কঠিন তা তিনি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন। রাজনীতি করতে গিয়ে তিনি ওসমান পরিবার থেকে মারাত্মক রকম বাধার সম্মুখীন হোন। এই পরিবারের সাথে অনেক বিষয় নিয়ে তার তিক্ততারও সৃষ্টি হয়। ২০১১ সালে ১৮ জুন নারায়ণগঞ্জ ডিসি অফিসে একবার অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছিল। বাসভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে প্রতিবাদ জানালে কবরীর দিকে তেড়ে আসেন শামীম ওসমান। সেসময় কবরীও শামীম ওসমানের দিকে তেড়ে যান।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের যে আসনে (ফতুল্লা) কবরী জয়ী হন সেই আসনে ৯১ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন সেই সময়কার তারকা ফুটবলার আশরাফ আহমেদ চুন্নু। কবরী সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ষাট-সত্তর-আশির দশকে এ দেশে ফুটবল যেমন জনপ্রিয় ছিল, তেমনি ভীষণরকম জনপ্রিয় ছিল সিনেমাও। খেলার মাঠ ছেড়ে নতুন সিনেমা না দেখলে একদমই ভালো লাগতো না। ছোটবেলায় যেমন ফুটবল পাগল ছিলাম তেমনি সিনেমা পাগলও ছিলাম। আমাদের নারায়ণগঞ্জে ছিল হংস, গুলশান, নিউমেট্রো সিনেমা হল। এসব সিনেমা হলে নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো ঢাকার সাথে একযোগে প্রদর্শন হতো। কবরী আপা অভিনীত প্রথম সিনেমা দেখি ‘নীল আকাশের নীচে’। তার মিষ্টি অভিনয় আর লক্ষী চেহারার মাঝে এক অদ্ভূত আলোড়ন ছিল। এ কারণেই কবরী আপা শুধু সে সময়ের তরুণদেরই নয়- আমাদের মা, খালাদেরও ভীষণ প্রিয় নায়িকা ছিলেন। চলচ্চিত্রের সাথে সাথে তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গনে আসাটাও ছিল খুব তাৎপর্যপূর্ণ। মজার ব্যাপার হলো- নারায়ণগঞ্জের যে আসনটিতে (ফতুল্লা) আমি ৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে পরাজিত হয়েছিলাম সেই আসনে তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। মৃত্যু অব্দি তিনি নিজ কর্ম দিয়ে মানুষের মাঝে থেকেছেন। শেষজীবনে তিনি একটি সিনেমা তৈরির কাজও প্রায় সমাপ্ত করে এনেছিলেন। তার এই বিষয়টি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে যে তিনি সবসময় কাজের মধ্যে ডুবে থেকেছন। সিনেমাজগতের অন্য সেলিব্রিটির সাথে তাঁর এটি মৌলিক পার্থক্য। সবচেয়ে বড় কথা তিনি কখনই হারিয়ে যাননি।

বর্ষীয়ান সিনে সাংবাদিক আব্দুর রহমানের কাছে আরেকটি প্রশ্ন ছিল: কবরীর মাঝে আপনি আর এমন কী দেখতে পেয়েছেন যা মৃত্যুর পরেও তাকে অমরত্ম দিয়ে রাখবে। আব্দুর রহমানের জবাব: ‘‘তিনি ‘মোহময়ী’। আপন কর্মের মধ্যে দিয়ে যিনি এক ‘জাদুকরী দর্শন’ তৈরি করতে পেরেছিলেন। ৭১ বছরের জীবনে ৫৮ বছরই তিনি সিনেমাতে সক্রিয় থেকেছেন। একটি সুন্দর সিনেমার জন্য সচেষ্ট থেকেছেন। নারীর অধিকারের জন্য কথা বলেছেন। কর্মই কবরীর জীবনের বড় আভিজাত্য-অহংকার। ‘মোহময়ী’ হিসেবেই তিনি থাকবেন সবার হ্নদয় মাঝে এবং চলচ্চিত্র ইতিহাসের পাতায়।’’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন