চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মধুচন্দ্রিমা শেষে কঠিন চ্যালেঞ্জ

২৯ বছরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে ৩২ ওয়ানডে ম্যাচের ৩১টিতেই হার। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে নর্দাম্পটনে ৬২ রানের একমাত্র জয়ের পর ১৬ বছরে টানা ২৫ ম্যাচে শুধুই মাথা নীচু করে মাঠ ছাড়া। টেস্ট কিংবা টি-টুয়েন্টির পরিসংখ্যান আরো করুণ! টেস্টে আট আর টি-টুয়েন্টির সাত মোকাবেলার সবগুলোতেই পরাজয়।

আইসিসি টেস্ট র‌্যাংকিং-এ চারের বিপরীতে নবম, ওয়ানডেতে অষ্টমের বিপরীতে দশ, কিংবা টি-টুয়েন্টিতে তিনের বিপরীতে দশ। পরিসংখ্যান কিংবা র‌্যাংকিং, কোনো মানদন্ডেই ক্রিকেট মাঠে পাকিস্তানের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বাংলাদেশ। তারপরও পাকিস্তানের সঙ্গে এবারের হোম সিরিজে ফেভারিট মানা হচ্ছে টিম-টাইগার্সকে।

এই মূল্যায়ন কোন পাঁড় সমর্থকের আবেগী কথার ফুলঝুড়ি নয়। যারা বাংলাদেশকে ফেভারিট মানছেন তাদের ক্রিকেট-বোধ প্রশংসিত দুনিয়া জুড়ে। সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান, বিশ্বকাপের সেনসেশন মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ কিংবা বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার ও সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ যখন আসন্ন সিরিজে  বাংলাদেশকে পাকিস্তানের  উপরে রাখেন, তখন তাকে কথার ফানুস বলে কোন মূর্খ? এমনকি বাংলাদেশের বাস্তববাদী শ্রীলংকান কোচ চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহর চোখেও নতুন কিছুর স্বপ্ন। পাকিস্তানের নতুন ওয়ানডে অধিনায়ক আজহার আলি, কোচ ওয়াকার ইউনুসও বাংলাদেশ দল সম্পর্কে সতর্ক করেছেন শিষ্যদের।

তিন ফরমাটে একটি মাত্র জয় যাদের সম্বল, সেই বাংলাদেশ কোন মন্ত্রের জোরে এবার ফেভারিট? উত্তর একটাই। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ আসর আমূল পাল্টে দিয়েছে লাল-সবুজকে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ আর পাকিস্তান, দু’ দলের দৌড় শেষ হয় কোয়ার্টার-ফাইনালে। তারপরও টিম-টাইগার্সের অর্জন পেছনে ফেলেছে ৯২’র বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে।

মাশরাফি’র বাংলাদেশ এমন একটি দল যেখানে সাকিব-তামিম কিংবা মুশফিকুরের মতো বিশ্বমাপের তারকারাই শেষ কথা নয়, পুরো দলটাই এমন একটা ইউনিট, যারা সময়ের প্রয়োজনে নিজের সেরাটা মেলে ধরতে শিখেছে। উদাহরণ হাতের কাছেই। ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে পরপর দুই ম্যাচে মাহমুদুল্লাহ’র অসাধারণ সেঞ্চুরি কিংবা অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পেসার রুবলের ম্যাচ-জেতানো বিধ্বংসী সেই স্পেল। এছাড়া সাব্বির রহমান, নাসির হোসেন, তাসকিনদের দ্যুতি ছড়ানো পারফরম্যান্সও দেখছে ক্রিকেট দুনিয়া।

টিম-টাইগার্সের একাদশের দিকে তাকান। দেখবেন সাকিবের পাশাপাশি মাহমুদুল্লাহ, নাসির, সাব্বির, মাশরাফির মতো চার/পাঁচ অলরাউন্ডার  আছেন। ব্যাটিং কিংবা কিপিং মিলিয়ে মুশফিকুরের অবদান যে কোনো অলরাউন্ডারের চাইতে কম নয়। এমন মাল্টি ট্যালেন্ডেড-ভার্সেটাইল দল ক্রিকেট দুনিয়ায় খুব কি বেশি আছে?

আর লড়াকু অধিনায়ক মাশরাফি? ইনজুরিতে ক্ষতবিক্ষত দুটি পা নিয়েও নিজের সেরাটা বিলিয়ে দেয়ার পাশপাশি পুরো দলকে উজ্জীবিত করার অসাধারণ ক্ষমতা মনে করিয়ে দেয় আহত-বাঘের বিক্রমের কথা।  

তুলনায় পাকিস্তানের ক্রিকেট অতিক্রম করছে ক্রান্তিকাল। অস্থির রাজনীতি, নজীরবিহীন সহিংসতায় ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট চর্চা কিংবা নিজেদের মাঠে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের নিরন্তর চেষ্টা হাসপাতালের আইসিইউতে ঠাঁই পাওয়া মুমূর্ষু রোগীর মতো। উঠে আসছেন না ইমরান, ওয়াসিম আকরাম কিংবা মিয়াদাঁদ, ইনজামামের যোগ্য উত্তরসূরি। যার প্রতিফলন বিশ্বকাপে পাকিস্তানের মতো ফেভারিট দলের সাদামাটা পারফরম্যান্সে।  

প্রতিক্রিয়ায় তিন ফরমাটে তিন অধিনায়ক নিয়ে পুনর্গঠিত পাকিস্তান দল বাংলাদেশ সফর দিয়ে শুরু করছে নতুন করে পথ চলা। মিজবাহ. ইউনিস, আফ্রিদি, উমর আকমাল, নাসির জামশেদের মতো অভিজ্ঞরা নেই ওডিআই দলে। এহসান অদিল, মোহাম্মদ রিজওয়ান, সাদ নাসিম, সামি আসলাম, বাবর আজম কিংবা মুখতার আহমেদের মতো একঝাঁক নতুন মুখ এই সিরিজ দিয়েই পা রাখবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। তুলনায় সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাশরাফি’রা দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলে আজ পরিণত, অভিজ্ঞ। কেনো বাংলাদেশকে ফেভারিট বলা হচ্ছে তার উত্তর তো এখানেই।

এরপরও সংশয়বাদীদের আশ্বস্ত করতে পারে ফতুল্লায় গা-গরমের ম্যাচে সাব্বির রহমানের সেঞ্চুরিতে বিসিবি একাদশের দারুণ এক জয়। ২০১২’র এশিয়া কাপ ফাইনাল কিংবা ২০১৪’র একই টুর্নামেন্টে ৩২৬ রান করেও হেরে যাওয়ায় মনে হচ্ছিলো পাকিস্তান নামটাই বোধহয় ‘টিম-টাইগার্সের’ কাছে মনস্তাত্বিক বাধা। এবার সিরিজের শুরুতে এই জয় ‘টিম-বাংলাদেশের’ পাকিস্তান জুজু’র ভয় অনেকটা কাটিয়ে দেবে।

তবে বিসিবি একাদশের জয় দেখে নিউজিল্যান্ড কিংবা জিম্বাবুয়ের মতো আরো একটি ‘বাংলা-ওয়াশের’ দিবাস্বপ্ন যারা দেখছেন, তাদের রাশ টেনে ধরার অনুরোধই করবো। আজহার আলির এই পাকিস্তান দল যতোই নবীন, অনভিজ্ঞদের সমাবেশ হোক; তাদের পরিণতি নিউজিল্যান্ড কিংবা জিম্বাবুয়ের মতো হবে না। বরং বাংলাদেশের আবহাওয়া, উইকেট কিংবা কন্ডিশন পরিচিত বলে সিরিজ যতোই এগোবে ততোই খোলতাই হবে পাকিস্তান দলের পারফরম্যান্স। এমনকি পাকিস্তানিরা শেষ হাসি হাসলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু থাকবে না।

এই সিরিজে তিন ফরমাটেই দল নির্বাচনে দূরদর্শিতা দেখিয়েছে পিসিবি’র নির্বাচকমন্ডলী। ব্যাটিংয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকলেও, বোলিং ডিপার্টমেন্টে অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রতিভার দারুণ পাকিস্তান দলে। এপ্রিল-মে’র শুস্ক আবহাওয়ায় ভঙ্গুর উইকেটের কথা চিন্তা করে সাঈদ আজমাল, ফাওয়াদ আলম, মোহাম্মদ হাফিজদের  মতো স্পিনারদের সঙ্গে পেস ডিপার্টমেন্টের শক্তি বাড়াবেন জুনাইদ খান, ওয়াহাব রিয়াজদের মতো পরীক্ষিত পারফরমার। টেস্ট সিরিজে ইউনিস খান, মিজবাউল হক কিংবা টি-টুয়েন্টি স্কোয়াডে শাহীদ আফ্রিদি এবং উমর গুলের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে বাংলাদেশ দলকে পড়তে হবে কঠিন পরীক্ষার সামনে।

ওয়ার্ম-আপ ম্যাচে পাওয়া জয় আত্মবিশ্বাস যোগালেও বাংলাদেশ দলের সামনে কঠিন এক চ্যালেঞ্জই অপেক্ষা করছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস নয়, লাল-সবুজের ক্রিকেটারদের জন্য চাই পরিণত পারফরম্যান্স। তাহলেই বিশ্বকাপ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে বাংলাদেশ।

(সাইদুর রহমান শামীম, স্পোর্টস ইন-চার্জ, চ্যানেল আই)