চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতিবেশী শহরের গল্প (পর্ব-১)

পাল্টে যাচ্ছে কলকাতা। ‘তিন’শ বছর বুকে নিয়ে’ পথচলা এই শহরে ট্রামকে একমাত্র আশির্বাদ মনে করা হয় না। এখন আর গাড়ি বলতেই অ্যামব্যাসেডার, সাধারণের চলাচলের টানা রিক্সা, রাস্তার ধারে মাটির ভাড়ের চা আর ঐতিহ্যের প্রধান স্মারক হয়ে নেই। চায়ের সাথে শুকনো টোস্ট ডুবিয়ে খেয়ে সারাটি দিন না খেয়ে থাকার সেই হিসেবি তকমাও এখন কলকাতার মানুষকে আর দেবার জো নেই। ‘খেয়ে এসছেন নাকি গিয়ে খাবেন’ কৃপণের সেই সেকেলে উদাহরণ আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য খাটে না।

সবার চোখের সামনে আকস্মিকই পাল্টে গেছে কলকাতা। এখন রেস্টুরেন্টে রকমারি খাবার খেতে মানুষের ভীড়, তরুণদের হাতে হাতে দামী মোবাইল আর রাস্তায় দামী দামী সব গাড়ি। বাইরে থেকে আমদানি করা গাড়ি যেমন আছে একইভাবে আছে নিজেদের বানানো হরেক রকমের গাড়ি। চীন জাপানের সঙ্গে পাল্লা চলছে প্রতিদিন। এখন কলকাতার নারী পুরুষের পোশাকের বাহাদুরিও আছে। আছে সহজ সাবলীল জীবন যাপনের নিয়মিত অনুশীলন। কারো নেই নেই, চাই চাই স্বভাবটা তেমন চোখে পড়ে না। সবার মধ্যে এক স্বস্তিবোধ আছে।

বিজ্ঞাপন

হাতে টানা রিক্সায় উঠে অপরাধবোধ হচ্ছিল। তারপরও প্রাচীন এই বাহনটির সঙ্গে আলাদা এক প্রেম আছে। এর ওপরে উঠে যতক্ষণ যাই, শুধু বৃদ্ধ মানুষটার দিকে তাকাই। এখন এই টানা রিক্সা যারা চালায় তাদের কারোরই বয়স পঞ্চাশের নীচে না। কোনো তরুণ টানা রিক্সা চালায় না। কারণ এটি প্রাচীন এক বাহন। এই মানুষগুলো যখন তরুণ ছিল তখন পৈত্রিক পেশা হিসেবেই ধরেছিল এই কাজ। আজকের তরুণরা পেশা বদল করছে।

এই রিক্সাঅলাদের সন্তানেরা কেউ লেখাপড়া শিখে ছোটখাটো চাকরি করে, কেউ দোকানদারি করে, কেউ গাড়ি চালায়। ইচ্ছে জাগলো মানুষগুলোর কষ্টের কথা শুনি। উষ্কে দেয়ার জন্য বললাম, এখন নানা রকমের গাড়ি, অটোরিক্সা এসব আসার পর তো আপনাদের উপার্জন কমে গেছে। কাকা, কেমন চলছে দিনকাল? বললেন, খুব ভালো। গাড়ির ইনকাম গাড়ি করছে, আমাদের ইনকাম আমরা করছি। আমি টাশকি খেয়ে গেলাম। আবার প্রশ্ন করলাম, আছেন কেমন? বললেন ভালো আছি। মনে করেছিলাম, হুড়মুড়িয়ে রিক্সাঅলা কেঁদে কেঁদে নিজের দুঃখের কথা বলবে। যা হোক, খুব বেশি সুবিধা হলো না। কয়েকটি ছবি তুলে মীর্জা গালিব স্ট্রিটে মেনে পড়লাম। কলকাতায় একসময় মোড়ে মোড়ে হাতে টানা রিক্সার ভিড় দেখতাম। দিন যত যাচ্ছে এটি কমছে। যতদূর জেনেছি ১৬ শতকে জাপানে এই রিক্সা উদ্ভাবন করা হয়। ১৮৮০ সালে হিমাচল প্রদেশের সীমলায় এই রিক্সা চালু হয়। দিনে দিনে এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই ছড়িয়ে পড়ে এই রিক্সা। পরে এই রিক্সা থেকেই প্যাডেল চালিত রিক্সা আসে। কিন্তু কলকাতায় এর ঐতিহ্য বহুকাল জীবন্ত। এখন বিলুপ্তপ্রায় সভ্যতার কথা একটু হতাশার সঙ্গে তুলে ধরার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু রিক্সার ওই চালকের স্বস্তিকর কথাবার্তায় সেটি আর সম্ভব হলো না।

সারাপৃথিবীতেই এখন শহরের ভেতরে যাতায়াতের অন্যতম এক যানবাহন সার্ভিসের নাম উবার। কলকাতার সাধারণের মধ্যে এই সার্ভিসটি পরিচিত পেয়েছে ‘উবের’ হিসেবে। কেউ কেউ ইউবার এবং উবারও বলে। সেখানে ওলা সার্ভিসও জনপ্রিয়। কলকাতায় এই উবার সার্ভিসটি এখন বিস্ময়কর রকমের স্বস্তিদায়ক। যেকোন সময় যেকোন মোড়ে দাঁড়িয়ে কল দিলে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ‘উবার’ হাজির। গাড়ি এবং চালকের পরিমাণ বেশি থাকার কারণে সবার জন্যই দারুণ সুবিধা হয়েছে। কলকাতার মানুষের জীবন যাপন ও চলাচলে গতি এসেছে। আগে অভিজাতরা অ্যামব্যাসেডরে উঠতেন, আর সাধারণ মানুষ সিটি সার্ভিস বাসে। এখনও সিটি সার্ভিস চালু তবে যাত্রীর পড়িমরি ভীড় নেই। সাধারণ মানুষও রাস্তায় হাত উচিয়ে ট্যাক্সি থামিয়ে উঠে যাচ্ছে। আমি বারবার পার্ক স্ট্রিট থেকে পার্ক সার্কাসে যাচ্ছি। উবার নিচ্ছি। স্বস্তির সাথে পৌঁছে যাচ্ছি গন্তব্যে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, যানজট কোনোকিছুতেই আমার উদ্বেগ নেই। কারণ, প্রায় ঘন্টাব্যাপী যানজটে থেকে উবার থেকে নেমে ভাড়া উঠলো মাত্র ১’শ ৬০ টাকা। রিকোয়েস্টের সময় আনুমানিক ভাড়া দেখেছিলাম ১’শ ৪০ টাকা। মাত্র ২০ টাকা বেশি কোনো ব্যাপার মনে হলো না। তা ছাড়া কোনো ক্ষেত্রেই বাড়টি টাকা নেয়ার মতো ব্যক্তিত্বহীন করুণ মানসিকতা কলকাতার চালকদের দেখলাম না। একবার উবারে উঠলো ১’শ ৪০ টাকা আমি ১’শ ৫০ টাকা দিয়ে নেমে গেলাম। দেখি পেছনে জোরে জোরে হর্ণ বাজছে। আমি ঘুরে গেলাম। চালক বললেন, আপনি তো দশ টাকা বেশি দিয়ে চলে যাচ্ছেন। আমি বললাম, ওটা আমি এমনিই দিয়েছি। আপনার কাছে রাখুন। তিনি বললেন, তা দরকার হবে না। কিছু মনে করবেন না, এই টাকা আমি নিতে পারবো না। ইনফ্যাক্ট এই প্রাকটিসটা আমার নেই। আমি আরেকবার একটু ধাক্কা খেলাম। থ্যাংক য়্যু বলে নিজেকে সামলে নিলাম। ভালো লাগলো, কী দারুণ ব্যাপার।

বিজ্ঞাপন

কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোয়েস্ট মলের উদ্বোধন করা হয়
কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে ২০১৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কোয়েস্ট মলের উদ্বোধন করা হয়

রাতে সামান্য দূরে যাবো। পথটি হেঁটে যাওয়ার মতো নয়, আবার উবার ডাকবো, তেমনটিও নয়। তাই একটি ট্যাক্সি হাত তুলে দাঁড় করালাম। বললাম যাবেন? ব্রীজের ওই মাথায়। মানে ‘কোয়েস্ট মল’-এ। চালক বললেন, উঠুন। যা হোক একটা কিছু দিয়ে দিয়েন। আমি নেমে পঞ্চাশ টাকা দিলাম, তিনি সন্তুষ্ট চিত্তে চলে গেলেন। রীতিমত এসি ট্যাক্সি, প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ, মাত্র পঞ্চাশ টাকা। তিনি তো জেনেশুনেই নিলেন। খুশি মনেই নিলেন। ড্রাইভারের নাম অনিল। এই অনিলকে নিয়ে আরো গল্প আছে সেটি পরে বলছি।

কোয়েস্ট মলে যাবার উদ্দেশ্য ছিল সিনেমা দেখা। ইচ্ছেটা এমন ছিল – যে মুভি চলে সেটিই দেখবো। মলে ঢুকে তো হা হয়ে যাবার যোগাড়। এটি কলকাতা নাকি ব্যাঙ্গালোর? কি ঝলমলে পরিপাটি শপিংমল। বড় বড় ব্র্যান্ডশপগুলো অভিজাত্য আর রংচং প্রদর্শনের পাশাপাশি জানান দিচ্ছে অনেক কিছু। বিশ্বায়ণের বাতাস যখন ঢুকেছে তখন ব্যক্তি উদ্যোগ আর বাণিজ্যচিন্তায় ইউরোপ আমেরিকার গতি এখানেও বর্তমান। সময়ের ব্যাপার শুধু, সবকিছু পাল্টে যাবে।

লক্ষ্য করলাম, শপিং মলে যে শ্রেনীটি ঘুরছে ও কেনাকাটা করছে তাদের পোশাক আশাক চলাফেরা একেবারে ভিন্ন। কোলকাতারই মানুষ তারা। কিন্তু আভিজাত্য আর বেশভুষায় ইউরোপিয় হতে বাকি নেই। অর্থ খরচের উদারতা আর পৃথিবীর ব্র্যান্ডগুলো বেছে নেয়ার যে বিলাসিতা তা তাদের মধ্যে এসে গেছে। সেখানে হিন্দি আর ইংলিশ চলছে। বাংলার ব্যবহার নেই বললেই চলে। শুধু ভারতীয় একসেন্টের কারণে ইংলিশ শুনে বোঝা যাচ্ছে কলকাতাতেই আছি, এখনও অন্য কোথাও যাইনি। যে কথা না বললেই নয়, কলকাতায় পর্যটকরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। আমি এবং আমার স্ত্রী লাইলা মুভি দেখার জন্য টিকেট কাটতে গিয়েছি। নিয়ম মেনে কেউতে দাঁড়িয়েছি। লক্ষ্য করলাম আমাদের সারিতে ৪০ ভাগ বিদেশি পর্যটক। তারা একেবারে স্বাচ্ছন্দ্য। তাদের মধ্যে কোনো সংশয় নেই, বিদেশ আসলে যে জড়তা থাকে তাও নেই। কয়েকজন ছেলেমেয়ে টিকেটের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে পেছনে বেশ নেচে নেচে কৌতুক করছিল। হাসি ঠাট্টা করছিল। সবাই তাকিয়ে দেখছিল। ওরা কিছুই মনে করছিল না। আমার ভালো লাগছিল এই দেখে যে, ওরা জায়গাটাকে নিজেদের আপন ক্ষেত্র মনে করছে। এটি একটি শহরের উদার পর্যটন পরিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক করলাম মুন্না মাইকেল সিনেমা দেখবো। বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে নয়, নতুন মুভি একটু ধুম ধাড়াক্কা থাকবে এই চিন্তা থেকে নির্বাচন করলাম মুভিটি। আরো বেশকিছু সুন্দর সুন্দর মুভি ছিল। অবাক হলাম, কোয়েস্ট মল এ রাত ১টারও শো আছে। তার মানে সে সময়েরও দর্শক আছে। মুভি এরিয়ার এন্টেরিয়র, লাইটিংসহ সবকিছু ছবির মতো। এখানে আসলে ইউরোপিয় বা আমেরিকান কিংবা অন্য যেকোনো জাতি বুঝে যাবে, ভারত সিনেমা শিল্পকে কত বড় করে দেখে। এখানে সিনেপ্লেক্সগুলো কত উন্নত। ঠিক দশ বছর আগে পার্ক স্ট্রিট এলাকার সিনেপ্লেক্স এ পর পর দুদিন দুটি মুভি দেখেছিলাম। একটি ‘রাব নে বানাদে জোড়ি’ আরেকটি ‘গাজনি’। তখন সিনেপ্লেক্স সংস্কৃতি নতুন। তারপরও পরিবেশটি বেশ ভালো ছিল। আর এবার যা দেখলাম তা তো শুধু অবাক নয়, বিস্মিত হবার যোগাড়। মনে হলো শুধু সিনেমা দেখার লক্ষ্য নিয়েও যদি কেউ কলকাতা আসে তাহলেও তার কাছে মনে হবে তার ভ্রমণটা সার্থক হলো।

বাড়িয়ে বলার মতো কলকাতার প্রতি বিশেষ কোনো পক্ষপাত আমার নেই। মুভি দেখে বের হলাম। অদ্ভুত পরিবেশ। রাত সাড়ে এগারোটা। একেবারে ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে। গায়ে মাখার মতো নয়। চাইলে এমন বৃষ্টিতে হাঁটাও যায়। রাতে হোটেলে গিয়ে খাবার পাওয়া যাবে না, ভেবে নীচে নেমে এলাম ট্যাক্সির জন্য। ট্যাক্সিঅলারারা খুব ডাকাডাকি করলো। কিন্তু একেবারে সংক্ষিপ্ত দূরত্ব বলে আমরা একটি অটোরিক্সা নিয়ে চলে এলাম হোটেলে।

(চলবে)

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View