চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতিটি জেলা শহরে আমরা রেল পৌঁছে দেবো: রেলমন্ত্রী

নতুন মন্ত্রিসভায় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম সুজন এমপি। ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন নুরুল ইসলাম সুজন। টানা তৃতীয়বারের মতো তিনি ওই এলাকার সাংসদ নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর পঞ্চগড় থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় সাংসদকে মন্ত্রী করা হয়। ক্লিন ইমেজের সাংসদ হিসেবে নুরুল ইসলাম সুজনকে মন্ত্রী করায় বোদা দেবীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের প্রধানসহ পুরো জেলাবাসী আনন্দ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

নুরুল ইসলাম সুজন ১৯৫৬ সালের ৫ জানুয়ারি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের নবাবগঞ্জ মহাজনপাড়ায় সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ময়দানদীঘি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করেন। এরপর ময়দানদীঘি বিএল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসসি করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এলএলবি পাস করেন।

ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নুরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসুর বিজ্ঞান মিলনায়তন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ঢাবির সিনেট সদস্যও ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, যুবলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সহ আইন বিষয়ক সম্পাদক ও আইন বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন নুরুল ইসলাম সুজন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার একজন আইনজীবীও নুরুল ইসলাম। তিনি পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের দু’বারের নির্বাচিত সভাপতি। মরহুম এমাজউদ্দীন আহমেদ ও মরহুমা কবিজান বেছারের দ্বিতীয় সন্তান নুরুল ইসলাম সুজন। তার বড় ভাই মরহুম অ্যাডভোকেট মো. সিরাজুল ইসলাম পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন এবং সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ৬ নম্বর সেক্টরের হয়ে অংশ নেন সিরাজুল ইসলাম। তার মৃত্যুর পর ছোট ভাই নুরুল ইসলাম সুজন ঢাকায় আইন পেশার পাশাপাশি পঞ্চগড় জেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। সম্প্রতি একান্ত সাক্ষাতকারে নানা বিষয়ে কথা বলেন তিনি।

প্রশ্ন: নতুনভাবে রেলের সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পরিকল্পনা কি?

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: ২০১১ সালে প্রথম রেলকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। তাই ১০০ বছরের ডেলটা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সেই আলোকে রেলের উন্নয়নে গেলো দশ বছরে প্রতিবছরই রেলের এলোকেশন বাড়ানো হয়েছে। ২০১০-১১ অর্থ বছরে রেলের বাজেট ছিল ২ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকা। ধীরে ধীরে এটি বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ অর্থ বছরে এই বাজেট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এই বাজেট বৃদ্ধির ফলে গেলো দশ বছরে রেলের যে উন্নয়ন হয়েছে তার ছোট্ট উদাহরণ দিতে চাই। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও কিছু উল্লেখ আছে। গত দশ বছরে ৩,৩১৫ কিলোমিটার নতুন রেলপথ তৈরী হয়েছে। ৯১ টি স্টেশন বিল্ডিং তৈরী করা হয়েছে। ২৪৮.৫০ কিলোমিটার মিটার গেজ থেকে ডুয়েল গেজে রূপান্তর হয়েছে রেলপথ। নতুন ৭৯টি রেল ষ্টেশন তৈরী করা হয়েছে এবং ২৯৫টি রেলসেতু নির্মাণ হয়েছে। এছাড়া ৩০ বছর মেয়াদী একটি পরিকল্পনা একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। রেলওয়ের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০১৩ সালে ২০ বছর মেয়াদী রেলওয়ের মাষ্টারপ্ল্যান করেছে- যা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত । এর অধীনে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। এই টাকা ব্যয় হবে চারধাপে এবং এর অধীনে ২৩৫টি উন্নয়ন প্রকল্প রেলে গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রশ্ন: সাবেক রেলমন্ত্রীর সময়ে ৬৪টি প্রকল্প তিনি শুরু করেছিলেন তারমধ্যে ৪৭টি চলমান আছে এবং বাকীগুলো শেষ হয়েছে। এই প্রকল্পগুলো কি চলমান থাকবে?

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: এটি কিন্তু ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন- প্রতিটি জেলা শহরে আমরা রেল পৌঁছে দেবো। যে কারণে পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে যে রেল হচ্ছে তা দিয়ে দক্ষিণ অঞ্চলের সবগুলো জেলা এই রেলের আওতায় আসবে। পায়রা সমুদ্র বন্দরের সাথে রেল যোগাযোগ হলে পটুয়াখালী বরিশালসহ সব জেলাই রেলের আওতায় চলে আসবে। এছাড়া যেসব মেগা প্রজেক্ট হচ্ছে তার মধ্যে অন্যতম হলো চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার। এটি ইতিমধ্যে দুইভাগে ভাগ করে কাজ চলছে।

প্রশ্ন: এই মেগা প্রজেক্টের কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে?

বিজ্ঞাপন

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: যেভাবে কাজ চলছে এবং আমাদের চুক্তিতে যা আছে তা যদি সময়মতো বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে আগামী তিন বছরের ভেতরে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারে যেতে পারবেন দেশবাসী।

প্রশ্ন: আরেকটি মেগা প্রজেক্ট ছিলো- চট্টগ্রামের দোহাজারী হয়ে ধুমধুম পর্যন্ত। এর কাজ ২০১৮ সালের ভেতরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাত্র ২০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে মাত্র?

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: এর অন্যতম কারণ হলো- আমরাও এখন স্লো চলছি। কারণ মিয়ানমারের যে অংশ যার মাধ্যমে তাদের সাথে যোগাযোগ হবে সেই অংশে তারা এখনো কোনোকিছু করতে পারেনি। তাই আমাদের দিক থেকে কাজ করে তো লাভ নাই? তাই কাজ ধীরে করছি আমরা। অন্যান্য প্রজেক্ট এক্সেলারেট করছি। যাতে মিয়ানমার কাজ শেষ করলে আমরা একই সাথে তাদের সাথে যুক্ত হতে পারি।

প্রশ্ন: রেলে ভোগান্তি আছে এবং লোকসান হচ্ছে নিয়মিত। এই অবস্থা থেকে কবে নাগাদ মুক্তি পাবো আমরা?

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: ভোগান্তি বলছেন কেন?

প্রশ্ন: ঈদের সময় টিকিট না পাওয়া, কালোবাজারী এবং শিডিউল বিপর্যয়।

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: রেলের সেবা গেলো ১০ বছরে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন কিন্তু ইনটাইম গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। সময়ের ব্যাপারে এখন কারো কোনো অভিযোগ নেই। তাই রেলের প্রতি মানুষের আস্থা এখন অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫০টি কোচ নিয়ে আসছি। মিটার গেজের জন্যে প্রায় ২০০ কোচ আসবে। তাহলে রেলের সেবা আরও বৃদ্ধি পাবে। আমাদের লোকোমোটিভগুলো পুরনো হয়ে গেছে। তাই সম্প্রতি একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছি আমরা। সেখানে ৪০ টি ডিজেল ইঞ্জিন আগামী ২ বছরের মধ্যে আমেরিকা থেকে কিনে আনছি এডিবি’র অর্থায়নে। আরও ৬৭টি ইঞ্জিনের ব্যাপারে চুক্তি হয়েছে। সেগুলোও মিটার গেজের জন্যে। এই সব আমরা হাতে পেলে রেলের গতি অনেক বাড়বে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মহাপরিকল্পনার মধ্যে রেল রয়েছে সেভাবেই রেল এগিয়ে চলেছে। এছাড়া জরাজীর্ণ রেল স্টেশনগুলো আমরা রেনোভেট করবো। জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের স্টেশনগুলো আরও আধুনিক করবো। আর রেলের যে পয়ঃপ্রণালি রাস্তায় ফেলে যেতে হতো তা আধুনিক কোচে সংরক্ষিত হবে ফলে পরিবেশ দূষিত হবে না। খাবারের মান বাড়বে। রেলকে হাইজেনিক করে গড়ে তুলছি আমরা।

প্রশ্ন: ঢাকা নারায়ণগঞ্জ এবং ঢাকা জয়দেবপুর এই অঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠী রাজধানীতে যাওয়া-আসা করে। এই রেল ফোর লেন হওয়ার কথা ছিল।

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: টঙ্গী পর্যন্ত এখন দুই লাইন আছে। এটি চার লাইনে যাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে এক লাইনের জায়গায় দুই লাইন যাচ্ছে। ইলেকক্ট্রিক কানেকশনের ট্রেন আগামী ৫ বছরের মধ্যে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রুটে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশ্ন: রেলে অনিয়ম এবং দুর্নীতি হয় লোকবল নিয়োগে আর জমি ইজারা এবং জমি পুনরুদ্ধারে কি ব্যবস্থা নেবেন?

নূরুল ইসলাম সুজন এমপি: আমি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তিন বার এমপি নির্বাচিত হয়েছি। সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ সম্পাদক ও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। এই ৬৩ বছর বয়সে কোন দিন দুর্নীতি করিনি বা এই সব অপকর্মের প্রশ্রয় দেইনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার উপরে যে আস্থা রেখেছেন তার মর্যাদা আমি রাখবো। জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়তে ক্ষুধা দারিদ্র মুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রীকে সব ধরণের সহযোগিতা করবো। কোন প্রকার অন্যায় এবং দুর্নীতির কাছে মাথা নত করবো না- এই আমার অঙ্গীকার।