চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধর্ষণকারীর শাস্তি আসলে কী হওয়া উচিৎ

“কাদম্বিনীকে যেমন মরিয়া প্রমাণ করিতে হইয়াছিল যে, সে মরে নাই” মনে হচ্ছে পূর্ণিমাকেও হয়তো এভাবেই বারবার সকলের সামনে ধর্ষিত হয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, সে কয়েকবছর আগে গণধর্ষণের মতো একটি ভয়াবহ, নারকীয় অত্যাচারের শিকার হয়েছিল। তা না হলে কি ১২ বছর আগে, নিতান্ত শিশু বয়সে, যে নির্মমতার সাক্ষী হয়েছিল তার দেহ, মন- সেই তাকেই কেন আবার নতুন করে সাইবার অপরাধের মাধ্যমে নির্মমতার শিকার হতে হচ্ছে ? নতুন করে অপমানিত হয়ে এবার কি পূর্ণিমাকে আত্মাহুতি দিতে হবে? মেয়েটি যেসময়ে এই নৃশংসতার শিকার হয়েছিল, তখন সেও ছিল শিশু। সে এতটাই ছোট ছিল যে তার বাবা মা ভাবতেও পারেননি তাদের ছোট্ট কিশোরী মেয়েটি এরপরও বাঁচবে, এই ট্রমা কাটিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াবে।

কিন্তু মেয়েটি পেরেছিল এই সমাজের সব বাধা উপেক্ষা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে। সব দু:খ, কষ্ট, লজ্জাকে জয় করে আবার জীবনে ফিরে যেতে। এটাই সহ্য হলোনা অপরাধীদের। তারা নতুন করে সক্রিয় হলো। এবার তারা হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিল সামাজিক মাধ্যম ফেসবুককে। যেসময় এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, সেসময় সাইবার অপরাধ বা পর্নোগ্রাফির আগ্রাসন এখনকার পর্যাযে ছিলনা বলে হয়তো, তখন মেয়েটিকে গণধর্ষণের পাশাপাশি এই সাইবার অপরাধের মুখোমুখি হতে হয়নি।

বিজ্ঞাপন

এখনতো দিন বদলেছে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সাইবার অপরাধীরা। এরা হরহামেশা ধর্ষণ করছে, তা ভিডিওতে ধারণ করছে ও পর্নোগ্রাফির দুনিয়ায় আপলোড করে দিচ্ছে বা সিডি করে বাজারে ছাড়ছে। এইভাবে নির্যাতিত ও লাঞ্চিত হয়ে বহু মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং হচ্ছে। এইপথে ব্ল্যাকমেইল করে অপরাধীরা অনেক মেয়েকে জিম্মি হয়ে থাকতে বাধ্য করছে। শুধু ধর্ষণ নয়, প্রেম বা ভালবাসার নামেও মেয়েদের ব্যবহার করে স্বার্থসিদ্ধি করে এরা। বাংলাদেশের পর্নো জগতে নাকি এখন দেশে নির্মিত এইসব নোংরা পর্নোগ্রাফির চাহিদা অনেক বেশি। আর তাই অপরাধীরা দিনে দিনে সক্রিয় হয়ে উঠছে মেয়েদের এই ঘৃণ্য কাজে ব্যবহার করার জন্য।rape-2

এতদিন পরে এসেও এই মেয়েটিকে রেহাই দিলোনা দুর্বৃত্তরা। ১২ বছর আগে ঘটে যাওয়া তার অপমান ও লজ্জাকে এনে হাজির করলো সবার সামনে। এতগুলো বছর মেয়েটি কীভাবে বেঁচে আছে, সমাজ তাকে কী অপরাধে অপরাধী করে রেখেছে, তার পরিবার তাকে নিয়ে কি করেছে, কোথায় গিয়ে তারা কীভাবে মুখ লুকিয়ে ছিল, মেয়েটি তার জীবনের এই ট্রমা আদৌ কাটাতে পেরেছে কিনা? কিচ্ছু জানিনা আমরা। জানলাম কখন, যখন সেই অপরাধীচক্র পূর্ণিমার নামে একটি মিথ্যে ফেসবুক আইডি খুলে, সেখানে বাজে ছবি ও নোংরা কথা লিখে রাখছে, যেন পূর্ণিমা নতুন করে তার পরিচিত সমাজে হেয় হয়। বিবিসি বাংলার শেম এপিসোডে পূর্ণিমার জীবনের মর্মান্তিক এই ঘটনার কথা উঠে এসেছে বলেই হয়তো আমরা সম্বিত ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছি।
কোনো ঘটনা ঘটার পর আমরা যতই হৈচৈ করিনা কেন, কিছুদিনের মধ্যেই সেটা ভুলে যাই। গণমাধ্যম নির্ভর স্মৃতিশক্তি আমাদের। আমাদের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, আন্দোলন সবকিছু কেমন যেন গণমাধ্যমকে কেন্দ্র করে চলছে। গণমাধ্যম যখন বিষয়টি নিয়ে কথা বলে, আমরাও তখন কথা বলি। অন্যসময় আমরা খোঁজও রাখিনা। যেমনটি রাখিনি পূর্ণিমার কথা। যখন মেয়েটি সাহসের সাথে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে চাকরি জীবনে পা রেখেছে, ঠিক তখনই তাকে আবার দুর্বৃত্তদের রোষানলে পড়তে হলো, আবার তার জীবন নিয়ে তারা মেতে উঠলো নোংরা খেলায়।

এভাবেই ঘটে যাচ্ছে একটির পর একটি নারী নিগ্রহ, নারী ও শিশু নির্যাতন ও হত্যার মতো ঘটনা। পত্রিকায় পাতায় চোখ রাখা যাচ্ছেনা। শিশু ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। ৮ বছর, ৬ বছর, ৫ বছর এখন আড়াই বছরের বাচ্চা, কেউই বাদ যাচ্ছেনা এসব নরপশুর হাত থেকে। রিশা থেকে নিতু, খাদিজা থেকে পূজা, এরও আগে আরো অনেক অনেক লম্বা তালিকা। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে একেকটা ঘটনা ঘটে, সবাই ক্ষোভ-নিন্দা জানায়, আসামি ধরা পড়ে, দায়ও স্বীকার করে কিন্তু পুলিশ চার্জশিট দিতে দেরি করে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে নারী নিপীড়ক ও হত্যাকারীরা আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। শুধু দেরিই নয়, ক্ষমতার জোরে এরা পারও পেয়ে যাচ্ছে। বখাটে, রাজনীতির পোষা গুণ্ডা, পয়সাওয়ালা লোকের সন্তান ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে আমরা সবকিছুকে সহজভাবে মেনে নিচ্ছি। আমাদের সামনেই নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে- আমরা প্রতিবাদ করার ক্ষমতাও যেন হারিয়ে ফেলেছি।rape

বিজ্ঞাপন

আমরা প্রায়ই বলি এত ছোট বাচ্চাকে কীভাবে বা কেন ধর্ষণের শিকার হতে হয়? যারা ধর্ষণের মতো এই অপরাধটি করে তারা দানবের মতো। তাদের কাছে বয়স কোনো ফ্যাক্টর নয়, সম্পর্ক কোনো বিষয় নয়, এমনকী লিঙ্গও কোনো বাধা নয়। তারা শুধুমাত্র তাদের অসুস্থ যৌন লালসা মেটানোর জন্য এই জঘন্য কাজটি করে। মাত্র ৬টি পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ২৪৫ টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে মারা গেছে ১৯ জন। এই ধর্ষিত শিশুদের মধ্যে ছেলে শিশু ৫ জন। ধর্ষণের ফলে আহত হয়েছে ৫৪ জন (সূত্র : মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন)। এর বাইরেও হয়তো আরো কত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যা আমরা জানিওনা। হয়তো লোকলজ্জার ও ঝামেলার ভয়ে অনেকে পুলিশ কিংবা হাসপাতালে যায়নি, কোথাও কোনো রিপোর্টও করেনি। আমরা, মানে এই সমাজ এখনও মনে করে ধর্ষণ ধর্ষিতার অপরাধ, ধর্ষিতার লজ্জা, ধর্ষিতার দায়- কাজেই বয়স যাই হোক ধর্ষণের দায় ধর্ষিতাকেই বহণ করতে হয়।

আমরা বিশ্বাস করি, পরিবারই পারে তাদের ছেলে সন্তানটিকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে । পরিবার ছেলেটি এমনভাবে শিক্ষা দেবে যেন সে তার মা, বোন, স্ত্রী ও কন্যা সন্তানটিকে যেমন করে ভালবাসবে, মর্যাদা দেবে- তেমনি একইভাবে মর্যাদা দেবে অন্য মেয়েদের। পরিবারই একজন ছেলে সন্তানকে শেখাতে পারে নারীকে অবমাননা করা ধর্ম, সমাজ ও নৈতিকতার দৃষ্টিতে পাপ এবং আইনের চোখে অপরাধ। যে ছেলে তার পরিবারে নারীকে সম্মানিত হতে দেখে, সেই ছেলেই নারীকে সম্মান করতে শেখে।rape-3

সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। নারীর প্রতি, শিশুর প্রতি আর এই অত্যাচার, অবিচার সহ্য করা যাচ্ছেনা। শুধু মেয়ে বা নারী বলে বারবার ঘৃণ্যভাবে লাঞ্চিত হতে হবে? অবোধ শিশুও এদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেনা। ধর্ষকের জন্য কঠোর আইন করে এদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে এদের একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিৎ মৃত্যুদণ্ড। আমরা আশা করতে পারি ধর্ষণকারীর পক্ষে যেন কোনো আইনজীবী না দাঁড়ান। এরাতো মানুষ না, তাই মানবাধিকারের প্রশ্নটিও এদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

আর যদি আইনের শাসন কঠোর না হয়, তাহলেতো নারীকেই আইন হাতে তুলে নিতে হবে । ঠিক এপ্রসঙ্গে বহুদিন আগে পত্রিকায় পড়া রংপুরের একটি সংবাদের কথা মনে হলো, পুরুষ নামের এক জানোয়ার গিয়েছিল একটি মেয়েকে ধর্ষণ করতে। মেয়েটি কৌশল করে এক সুযোগে কেটে নিয়েছিল সেই জানোয়ারের পুরুষাঙ্গটি। আর তারপর সেই কাটা পুরুষাঙ্গ নিয়ে, জানোয়ারটির কী অবস্থা হয়েছিল, তা সহজেই অনুমেয়। সম্ভবত খবরে লেখা ছিল লোকটি হাসপাতালে গিয়ে বলতেও পারছিলনা কীভাবে তার পুরুষাঙ্গটি স্থানচ্যুত হয়েছিল?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View