চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দেশপ্রেমের পরীক্ষা ও ক্রিকেটে ইমার্জিং টাইগার

ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারানোর পরের দিনের সকাল। শুভ সূচনায় টেনশনমুক্ত বাংলাদেশ দল ফুরফুরে মেজাজে চলেছে ব্রিসবেনের পথে। ক্যানবেরা থেকে কোয়ান্টাস এয়ারলাইনন্সের উড়ালে বাংলাদেশ দলের সঙ্গী দুই ক্রীড়া সাংবাদিক, আমি ও দৈনিক কালের কণ্ঠ’র মোস্তফা মামুন। ‘টিম-টাইগার্স’ চলেছে, হোস্ট অষ্ট্রেলিয়ার সঙ্গে পরের ম্যাচ খেলতে, ম্যাচ কভার করতে আমরা দু’জন।এয়ারবাসের একেবারে লেজের দিকে শেষ আসনটি নির্ধারিত বাংলাদেশ অধিনায়কের। দু’ সারি আগে আমাদের দু’জনের আসনের পাশেরটি ফাঁকা। আমন্ত্রণ জানাতেই এসে বসলেন মাশরাফি। খারাপ আবহাওয়ায় আকাশপথে উড়ান চলেছে প্রচন্ড কাঁপুনি আর ঝাঁকুনি দিয়ে। কিন্তু আমরা খোশমেজাজে, তুমুল আড্ডাবাজ আর রসিক মাশরাফি’র অনর্গল আলাপচারিতায়।

এক পর্যায়ে আগের দিন ম্যাচ পূর্ব জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় গানের সঙ্গে তিনিসহ কয়েকজন ক্রিকেটারের কণ্ঠ না মেলানো নিয়ে ফেইসবুকে কিছু ভক্তের  সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে ‘নড়াইল এক্সপেস’ এর কণ্ঠে অভিমান আর বিষন্নতা: ‘জাতীয় সংগীতের সঙ্গে গলা না মেলালে বুঝি দেশপ্রেমের পরীক্ষায় পাস করা যায় না! গত ১৫ বছরে সাতবারের অস্ত্রোপচারে দু’ পা ঝাঁঝড়া করেও আমি যে খেলে চলেছি তা বুঝি কিছু না!’

সরল মনের মাশরাফির অভিমানহত অনুযোগটি মনে গেঁথে থাকবে আজীবন। আসলে আমরা ভক্ত-সমর্থকরা দেশপ্রেমের ব্যাপারটিকে কতই না ঠুনকো বানিয়ে ফেলি! একজন খেলোয়াড়ের মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে নাকি দেশপ্রেমের ব্যারোমিটার  ওঠানামা করে! প্রতিনিয়ত নানা সমাজিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের জনগোষ্ঠির কাছে স্বস্তির আরেক নাম ক্রিকেট। বাংলাদেশের নানা বয়সের মানুষ ‘টিম-টাইগার্স’ এর মাঠের পারফরম্যান্সে খুঁজে নেয় দু:খ, বঞ্চনা আর নিরাপত্তাহীনতার দাওয়াই।

একাত্তরের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে জনমত সংগ্রহে কলাকাতার কলেজ স্কয়ারের পুকুরে সাঁতারু অরুণ নন্দীর অবিরাম সাঁতার কিংবা স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বল পায়ে মাঠের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতাই তো দেশে-বিদেশে ‘টিম-টাইগার্স’ এর সাফল্যের পরম্পরা। অরুণ নন্দী, জাকারিয়া পিন্টু কিংবা ক্র্যাক প্লাটুনের মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জুয়েলের যোগ্য উত্তরসূরী এখনকার মাশরাফি-সাকিব-মুশফিক, ফুটবলার মামুনুল, দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ কিংবা গলফার সিদ্দিকুর।

গার্মেন্টস পণ্যের পাশাপাশি লাল-সবুজের ক্রিকেট দল আজ সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশের সেরা ব্র্যান্ড। এই দুই ব্র্যান্ড এর নিত্যনতুন সাফল্য দেশের পাশাপাশি প্রবাসেী কোটি বাঙ্গালিকে মাথা উঁচু করে বাঁচার রসদ যোগায়। তবে মাঝেমধ্যে ছন্দপতন যে ঘটে না তা নয়। আবেগপ্রবণ বাঙ্গালি যেমন দু’একটি সাফল্যে প্রিয় খেলোয়াড়দের মাথায় তুলে নাচে, তেমনই দু’একটি ব্যর্থতাও খুব দ্রুতই তাদের ধৈর্যচ্যুাতি ঘটায়।

Advertisement

না হলে দু’ বছর পর সেঞ্চুরি করে ব্যতিক্রমী উদযাপন করে নিজের অভিমানের কথা কেনো জানান দেবেন তামিম ইকবাল!

বিপরীত চিত্রও আছে অন্যদিকে। একসময়ের লাল-সবুজের চোখের মনি মোহাম্মদ আশরাফুলের আজকের পরিণতি কি দু:খ বাড়ায় না ক্রিকেট ভক্তদের! অভিষেকে সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান, বিশ্বসেরা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কার্ডিফে ম্যাচ-জেতানো অমন দূর্ধর্ষ সেঞ্চুরিয়ানকেই তো একসময় চোখের জল ফেলে শোনাতে হলো দেশের প্রতি নিজের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনী। বাংলাদেশের নায়ক ‘আশারাফুল’ রাতারাতি হয়ে গেলেন খলনায়ক। শুভানুধ্যায়ীদের  আশা, শাস্তি ভোগ শেষে আবারো মাঠে ফিরবেন একসময়ের ‘লিটল-চ্যাম্পিয়ন’। ‘অ্যাশভক্ত’ স্বপ্নবাজদের স্বপ্নটা আরো বড়, মাশরাফি-সাকিব-মুশফিক-তাসকিনদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আবারো লাল-সবুজের পতাকা বইবেন এই ব্যাটিং জিনিয়াস।

বাণিজ্যিক ফিল্মকে হার মানিয়ে দেয়া এমন স্বপ্ন যদি সত্যি হয় তাহলেও কি এদেশের ক্রিকেট ভক্তদের আস্থা-ভালোবাসা ফিরে পাবেন আশরাফুল?

আবার খেলার মাঠের অর্জিত সাফল্য নিয়ে শ্রদ্ধাভাজনদের দু’একটি মন্তব্য বাংলাদেশকে কখোনো সখোনো বিপদে ফেলেনি তা নয়। যেমন ১৯৯৯ বিশ্বকাপ ক্রিকেটে  পাকিস্তানকে হারানোর পর বলা হলো, ১৯৭১’র ১৬ ডিসেম্বরের পর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এটা আরেক বিজয়। সেই মন্তব্যের খেসারত গত ১৬ বছরে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা ২৫ ওয়ানডে ম্যাচে হারের পর দিতে হয়েছে। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে এক ম্যাচে হাতে রেখে এবার ওয়ানডে সিরিজ জয় বাংলাদেশের ক্রিকেট-ভক্তদের স্বপ্ন্  আকাশের সীমানা ছাড়িয়েছে। প্রমাণ হয়েছে আগামী দিনগুলোতে মাঠের পারফরম্যান্স এবং ক্রিকেটীয় অর্থনীতিতে বাংলাদেশ উঠতি পরাশক্তি, যারা ভারত-অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইংল্যান্ডের মতো প্রভাবশালী শক্তিকে মাঠের পারফরম্যান্স কিংবা ক্রিকেট অর্থনীতিতে চ্যালেঞ্জ জানাতে তৈরি। সেজন্য বিসিবি’র চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দেশের ১৬ কোটি তো বটেই, প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাশাপাশি সরকারের সমর্থনও আছে। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে টাইগাররা জানান দিচ্ছে আসছে দিনগুলোতে ক্রিকেট দুনিয়া শাসন করতে তারাও তৈরি।

এমন উর্বরা ক্ষেত্র থেকে সাফল্যের ফসল ঘরে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তৈরি হচ্ছেতো বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড?

(সাইদুর রহমান শামীম: স্পোর্টস ইন-চার্জ, চ্যানেল আই নিউজ)