চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

চারদিকে এত টাকা কেবল গরীব-মধ্যবিত্তের চোখে জল

গোমরা মুখে ব্যাংকে ঢুকে ফরিদ সাহেব পেয়াজ আর ক্যাসিনোর আলাপ শুনে নিজের রাগ সামলাতে পারলেন না। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে এমনিতেই তিনি। তার উপর সকাল বেলাতে স্ত্রী বলে দিয়েছে, তার পক্ষে পেয়াজ কম দিয়ে রান্না করা সম্ভব নয়। আর জিনিসের দাম বাড়লে কম খেতে হবে এমনটা তার বাপকে কোনদিন বলতে শুনেনি। বেচারা ফরিদ সাহেব বউয়ের উপরের ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে বলেই ফেলেন, ‘দেশের বাতাসে টাকা উড়ছে, সিন্দুকে টাকা কিন্তু আমরা সেই গরীব গরীবই রয়ে গেলাম। ছেলের পড়ার খরচ চালাতে শেষ সম্বল ফিক্সড ডিপোজিটটা ভেঙ্গে ফেলতে হচ্ছে। কি লাভ এ সৎ জীবনের। ‘ কথাগুলো শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। সত্যি দেশে এত অলস টাকা পড়ে আছে, কিন্তু ব্যাংকে অর্থের তারল্য সংকট কল্পনাতীত।

উন্নয়ন কেবল এক শ্রেণির মানুষের হচ্ছে। তাদের কাছে দেশ বা দেশের মানুষের জীবন যাত্রার উন্নয়ন শব্দটি অর্থ উপার্জনের একটা পন্থা কেবল। যা ব্যবহার করে এরা নামে বেনামে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে বিদেশে পাচার করছে। আবার কেউ গড ফাদার হয়ে ঘরে বা সিন্দুকে বন্দী করছে টাকা। ক্যাসিনো অভিযান না হলে হদিস পাওয়া যেতে না এসব টাকার।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সাধারণ মানুষের কতটা উন্নয়ন হয়েছে এ পর্যন্ত। সাদা চোখে বলা হয়, ‘একটি দেশ যখন উন্নতির দিকে এগিয়ে যায় তখন গরীব আরও গরীব হয়, ধনী আরও ধনী।’ কাগজে কলমে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু বাস্তব ভিন্ন কথা বলে। আর সে কারণে পেয়াজের ঝাঁঝে জনগণ হয়েছে দিশেহারা। অলস আর কালো টাকা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

বিগত বছরগুলোতে ব্যাংক, শেয়ার বাজার থেকে টাকা উধাও হয়ে গেছে নানাভাবে। আর সে নগদ টাকাগুলো হয় মানুষের ঘরের সিন্দুক আছে, না হয় পাচার হয়ে গেছে বিদেশে। এক হিসাবে দেখা গেছে ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে থাকা এ নগদ টাকার পরিমাণ গত অর্থবছরে ছিল ৩ হাজার ৩শ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এসে তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে চলে গেছে।’’ এখান থেকে বুঝা যায় বাংলাদেশের মত একটি দেশে দুর্নীতির শেকড় কত গভীরে। অন্যায় ও দুর্নীতি করে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে বিদেশে সেকেন্ড হোম করে নিশ্চিতে আছে অসাধু এক শ্রেণির মানুষ। এরা ছড়িয়ে আছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ছত্রছায়াতে। পরিতাপের বিষয় হলো বিদেশে চলে যাওয়া এ টাকা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। আবার ঘরে বা সিন্দুক বন্দী কালো টাকা ইনভেস্টমেন্ট করার সুযোগ নেই। ফলশ্রুতিতে ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটিয়ে উঠার পথ রুদ্ধ।

অন্যদিকে উন্নয়ন খাতের হরিলুটের ঘটনা সীমাহীন পর্যায়ে চলে গেছে। বালিশ পর্দা বিদেশ সফরের নামে কাল্পনিক বাজেটে টাকা পকেটেস্থ করছে দুর্নীতিবাজরা। দৃশ্যমান রাস্তা ঘাটের উন্নয়নের বেহাল দশার জ্বলন্ত উদাহরণ চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভারের পানির সচিত্র প্রতিবেদন। কিন্তু জনগণের ভ্যাট ট্যাক্সয়ের টাকায় দেশকে এগিয়ে নিতে বদ্ধ পরিকর সরকার প্রধান এখন নিজের দল থেকে বের করে আনছে কালো টাকার বস্তা। দলের ভেতর লেবাস বদল করে অন্যায়কারী অসাধুদের বিচরণ কিভাবে হয় তা বলার বা বুঝার ক্ষমতা জনগণের আছে।
মূলত মানুষের জীবন যাত্রার মান উন্নয়নের জন্য সরকার সম্পূর্ণভাবে এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ ছাড়া কোন অন্যায়ের প্রতিকার পাবার আশা নেই জনগণের। তাই ১/১১ এর সময়ের মত রাস্তায় টাকার বস্তা পড়ে থাকার ঘটনার পুনারবৃত্তি হোক তেমন প্রত্যাশা জনগণ করে না। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতা থাকার পর রাজনৈতিক ভাবে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বচ্ছ রাখা ব্যাখ্যাটা কতটা যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখতে হবে নেতা – কর্মীদের।

যেমন জিকে শামীম তার ব্যবসা চালিয়ে নিতে সরকার বদলের সাথে সাথে ম্যানেজ করেছে ক্ষমতাসীন দলকে। সে সাথে ক্ষমতার চূড়ান্ত পর্যায়ে দলীয় পদ ধারণ করে টেন্ডার বাণিজ্য, ক্যাসিনো ব্যবসা করেছে অবলীলায়। রাজনৈতিক প্রভাবেই সে প্রশাসনকে হাতে রেখেছে ঘুষ দিয়ে কাজ ম্যানেজ করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যার প্রমাণ গণপূর্তের সাবেক দুই প্রকৌশলীকে দেয়া ঘুষের অংক। সে রফিকুলকে ঘুষ দিয়েছেন ১ হাজার ১০০ কোটি ও আব্দুল হাইকে দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

এমন ঘুষের লেনদেনের গল্পে বাংলাদেশের অতি সাধারণ মানুষের জীবনকে মেলানো যায় না। যেখানে টাকার অভাবে চিকিৎসা হয় না, পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়,এমনকি দিনের পর দিন বেকার থেকে আত্মহননের ঘটনাগুলো ম্লান করে দেয় সোনার বাংলার স্বপ্নকে। সেখানে শামীম, সম্রাটদের কোটি টাকার বাণিজ্য হলমার্ক সহ অসাধু ব্যক্তিদের ব্যাংকের টাকা আত্মৎসা দেশকে দুর্নীতিগ্রস্থ আর আর্থিক সংকটের দিকে নিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয় । এ অবস্থায় নিজেদের টাকায় নিজেদের উন্নয়ন মানে মধ্যবিত্ত গরীবদের দৈনন্দিন জীবনে সংকট সৃষ্টি।

অর্থ মন্ত্রী সংসদের গত অধিবেশনে বলেছেন,’ সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ৩০০ ঋণ খেলাপির কাছে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা আছে ৫০ হাজার ৯৪২ কোটি টাকা।’ এ ৩০০ জন ঋণ খেলাপির টাকা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতি দ্রুত আদায় করা খুব সহজ নয়। কারণ নামে বেনামে ব্যাংকের এ টাকা চলে গিয়েছে ব্যাক্তির হাতে।

সরকার যেখানে দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রানন্তকর প্রচেষ্টা করছে। সেখানে এ প্রচেষ্টাকে তোয়াক্কা না করে দুর্নীতিবাজরা অসৎ পন্থায় দেশের টাকা বিদেশের ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে, বাড়ি কিনে বা ব্যবসাতে খাটিয়ে তারা বা তাদের সন্তানদের বিলাসী জীবন নিরাপদ করছে। এরা আসলে সমাজের জাত শত্রু বলে জমিদারী কায়দায় দেশ আর দেশের মানুষকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে অর্থ লোপাটের মাধ্যমে।

মধ্যম আয়ের এ বাংলাদেশ এখন নৈতিকতার দিক থেকে দু শ্রেণিতে বিভক্ত। অসৎদের আছে টাকার পাহাড়, ক্ষমতার দম্ভ আর সৎ দের যাপিত জীবন চলানো দায় অসৎদের প্রভাব পত্তির কারণে। সৎ হয়েও প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না জীবন হারানোর ভয়ে। আর হিসাবী জীবনের কষ্ট নিজের ভেতর বয়ে মুখে হাসি রেখে মিথ্যে করে বলে, ‘ভালো আছি।’

কিন্তু এ ভালো থাকতে পেয়াজের ঝাঁঝে নয়, বরং চোখের কোনে জল আসে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি আর দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View