চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

গর্বিত সন্তানদের পথ যেন মসৃণ রাখি

বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের এবারের আসরের পর্দা নেমেছে গত ৪ এপ্রিল। ছেলে ও মেয়েদের চ্যাম্পিয়ন দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে পুরস্কার নিয়ে নিজ নিজ এলাকায় ফিরেছে। তবে শিরোপা জয়ের খুশির রেশ এখনও কাটেনি। সপ্তাহ ঘুরতে চললেও চ্যাম্পিয়নদের বরণ করে নেয়া আর সংবর্ধনায় খুশির রেশ দীর্ঘ হয়েছে। এরমাঝেই একটি ছবিতে চোখ আটকে গেছে সবার। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেই ছবিকেন্দ্রিক খবর আলোড়ন আর শ্রদ্ধার ঢেউ তুলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। হাজারো কণ্ঠে উচ্চকিত হয়েছে এমন গর্ব বয়ে আনছে যারা, তাদের আরও সুউচ্চ শিখরে পৌঁছানোর পথটা যেন আমরা মসৃণ রাখতে পারি।

স্কুলের প্রতিযোগিদের সবচেয়ে বড় আসর বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের অষ্টম আসরের ফাইনালে এবার শিরোপা জিতেছে ময়মনসিংহের নান্দাইল পাঁচরুখী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধানমন্ত্রী বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিয়ে আশাব্যক্ত করেছেন: এই টুর্নামেন্ট থেকেই আগামীর দক্ষ ক্রীড়াবিদ বেরিয়ে আসবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করবে। দেশবাসীর আশাও সেটাই।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আশার চড়াই-উতরাই ভেলা পাড়ি দিতে সামনে কী অপেক্ষা করে আছে সেটাও যে উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া সেই ছবি-খবরে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে চ্যাম্পিয়ন দল পাঁচরুখী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন ফুটবলার রোকসানা নিজ এলাকায় পৌঁছে শুভকামনা ও মিষ্টিমুখের পর ট্রফি কোলে রিক্সা করে ঘরে ফিরছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু যখন জানা যাচ্ছে, রিক্সাচালক আব্দুল জব্বার ওই কৃতি সন্তানের গর্বিত বাবা, তখন আবেগের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে পুরো বাংলাদেশেই। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা প্রতিভারা এভাবে জয়ের হাসিতে দেশ মাতাবে, সে স্বপ্নও চওড়া হচ্ছে। আছে আশার উল্টো পিঠও।

বিজ্ঞাপন

রোকসানা যখন বাবার রিক্সায় চেপে মিশ্রিপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে ফিরছিলেন, উপস্থিত শতশত মানুষ হাততালি দিয়ে তাদের উৎসাহ দিতে থাকেন। কিন্তু পুরো গল্পটা এত সরল নয়। আব্দুল জব্বার পরে জানান মেয়ের কীর্তিত্বে বুক চওড়া হওয়ার অনুভূতি যেমন আছে, আছে বঞ্চনার কথাও। তিনি মনে করিয়ে দেন, মেয়ের ফুটবল খেলাকে ঘিরে নানাবিধ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে অহরহ। মেয়েকে ফুটবল থেকে সরিয়ে আনতে এলাকার অনেকে দিনক্ষণও বেঁধে দিয়েছে। তিনি সব উপেক্ষা করেছেন। মেয়ের দল যখন দেশসেরা হয়েছে, নিন্দুকদের সামনে দিয়ে মেয়েকে নিয়ে যেতে পেরে তার গর্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে তাতে।

বয়সের ভারে ন্যুব্জ আব্দুল জব্বার জীবিকার তাগিদে রিকশা চালান, হয়ত একদিন ভাগ্যের চাকা সুফলা হওয়ার স্বপ্ন দেখে তার পরিবার। কিন্তু রোকসানাদের ঘিরে স্বপ্ন দেখে তো পুরো বাংলাদেশই। যেভাবে রেকর্ড তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ময়মনসিংহেরই আরেক দল কলসিন্দুরের মারিয়া মান্ডা, কৃষ্ণা রানি, সানজিদাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য পেয়ে বহুবার আনন্দের উপলক্ষ পেয়েছে বাংলাদেশ। কলসিন্দুর অগ্রগামী, তারা উদাহরণ হয়ে এসেছে। তবে দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কলসিন্দুরের সংখ্যা কম নয়। তাদের উঠে আসার পথ যে মসৃণ নয় মোটেও, সেটা তো প্রকাশিত হয়ে পড়ছে অনেক রোকসানার বাবার কণ্ঠেই।

বন্ধুর সেই পথটি মসৃণ করার দায়িত্ব সকলের, সব মহলের। তাতে গর্ব বয়ে আনা মেয়েদের পদচারণা ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশজুড়ে। সম্ভাবনাগুলো সামাজিক নিষেধাজ্ঞার নানা বেড়াজালে মাথা ঠুকে বিলীন না হয়ে যাক, আবার উঁকি দিয়েই ঝরে না যাক অকালে, সেজন্য আমরা সকলেই যেন যার যার জায়গা থেকে সচেষ্ট ভূমিকা রাখি। বাংলাদেশ ফুটবলের হারানো গৌরব আবারও উজ্জ্বলতায় ফিরুক মেয়েদের মাধ্যমেই। সাফল্য ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্ব-দরবারে, সমুন্নত করুক লাল-সবুজের পতাকা। আমাদের শুভকামনা।