চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

কেকা ফেরদৌসী: রন্ধনশিল্পী হয়ে ওঠার পেছনের গল্প

‘বাবা মা দুজনেই রাঁধতে ভালোবাসতেন। মা সাহিত্যিক হলেও রাঁধতেন। আগে রান্না করে তারপর লেখার কাজ শুরু করতেন। বাবা মায়ের থেকেই রান্নার প্রতি ভালোবাসা ধারণ করেছি।’- জানালেন রন্ধনশিল্পী কেকা ফেরদৌসী। নতুন বছরের শুরুতেই টিভিতে তার রান্নার অনুষ্ঠানের ২৫ বছর পূর্তি হবে। দীর্ঘ এই পথ চলার অনুপ্রেরণা, বাধা-বিপত্তি এবং নানা মজার ঘটনা সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন চ্যানেল আই অনলাইনকে।

মা প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের হাতের খাবার ভীষণ ভালোবাসেন কেকা ফেরদৌসী। মায়ের হাতের খাবারের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্যের কথা জানালেন তিনি। খাবার সাজিয়ে পরিবেশন করতেন মা। সবাই সাধারণ সুজির বরফি তৈরি করলেও মা সেই বরফিগুলোকেও সাজিয়ে পরিবেশন করতেন। নানা আকৃতিতে সুন্দর করে কেটে উপরে বাদাম-কিশমিশ দিয়ে পরিবেশন করতেন তিনি। কাটলেট তৈরির সময় চিংড়ির লেজ লাগিয়ে দিতেন খাবারের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। খাবারের এত সুন্দর পরিবেশনা মুগ্ধ করতো কেকা ফেরদৌসীকে। রান্নার প্রতি আগ্রহ বাড়ত। সাধারণ রান্নাকেও শিল্প মনে হতো তখন।

রান্না শেখা শুরু হয় পরিবারের সবার জন্য নাস্তা তৈরির মাধ্যমে। বাবা ও ভাই বোনদের জন্য নাশতা তৈরি করতেন তিনি। বাবা সাধারণত ছুটির দিনে রাঁধতেন। তখন সহকারী হিসেবে তিনিও সঙ্গে থাকতেন। মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে প্রবেশের অনুমতি পেতেন না অবশ্য। রাঁধতে গেলেই মা বলতেন ‘যাও পড়াশোনা করো, রাঁধতে হবে না।’কেকা ফেরদৌসী

বড় ভাই ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের বন্ধুরা বেড়াতে এলে নাস্তা তৈরি করতেন তিনি। ভাই এবং তার বন্ধুরা খুব প্রশংসা করতেন তার হাতের রান্না। এরপর তিনি যখন ক্লাস নাইনে পড়েন, তখন একটি রান্নার স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। বিয়ে হওয়ার আগ পর্যন্ত ছুটির দিনে বাড়িতে সবসময় খাবারের বিশেষ আয়োজন থাকতো এবং সেই পুরো আয়োজন তিনিই করতেন।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূগোল বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হওয়ার পর, দ্বিতীয় বর্ষেই বিয়ে হয় বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, প্রকৃতিপ্রেমী এবং ইমপ্রেস গ্রুপের অন্যতম সফল পরিচালক মুকিত মজুমদার বাবুর সঙ্গে। বিয়ের পরে পড়াশোনা শেষ করেছেন। স্বামী এবং শাশুড়ি তার হাতের রান্না খুবই পছন্দ করতেন। শাশুড়ির কাছ থেকে রান্নার অনেক খুঁটিনাটি বিষয় রপ্ত করেছেন তিনি। বিশেষ করে কাটা মশলার গরুর মাংস এবং ফিরনি, এই দুটি খাবার শাশুড়ির কাছ থেকে হাতে-কলমে শিখেছেন কেকা ফেরদৌসী। স্বামীর থেকে রান্নায় অনেক উৎসাহ পেয়েছেন তিনি।

কেকা ফেরদৌসী জানান, বিয়ের পর দুই বছর তিনি ইংল্যান্ডে এবং তিন বছর যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। সেই সময়ে তিনি অনেক বাঙালিকে রান্না শিখিয়েছেন। নিজেও যেখানে যেতেন, নতুন রেসিপি শিখে ফেলতেন। বিশেষ করে বিদেশী অনেক খাবারের রেসিপি তিনি সেই সময়টাতেই শিখেছেন। এখনও নতুন কোনো দেশে, নতুন খাবার দেখলেই সেটার রেসিপি শেখার চেষ্টা করেন তিনি। স্মৃতির পাতা ঘেঁটে তিনি বলেন, ১৯৮০ সালের দিকে বিদেশে বার্গার তৈরি হতো। কিন্তু সেই বার্গার স্পাইসি ছিল না। তখন স্পাইসি বার্গার তৈরি করে বাঙালি এবং আমেরিকান বন্ধুদেরকে চমকে দিয়েছিলেন তিনি। খুব প্রশংসিত হয়েছিল তার সেই বার্গারের রেসিপি।কেকা ফেরদৌসী

১৯৯৪ সালে বিটিভিতে প্রথম রান্নার শো শুরু করেছিলেন কেকা ফেরদৌসী। তখন এত আধুনিক রান্নাঘর খুব কম ছিল। তাই প্রথম শো এর শুটিং হয়েছিল তার নিজের বাসার রান্নাঘরেই। প্রথম শোতে মাশরুমের একটা খাবার তৈরি করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছিলেন তিনি। তখন মাশরুম এত জনপ্রিয় ছিলনা। তাই সেই শো অনেক সাড়া জাগিয়েছিল। তখন থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি শোতেই তৈজসপত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি খুব সৌখিন। চেষ্টা করেন নতুন নতুন সব তৈজস ব্যবহারের। অনুষ্ঠানের থিমের সঙ্গে মিলিয়ে মাটির, কাসার, কাঁচের কিংবা সিরামিকের বৈচিত্র্যপূর্ণ ডিজাইনের তৈজসপত্র ব্যবহার করেন তিনি।

বিভিন্ন দেশে রান্নার অনুষ্ঠানের শুটিং এর জন্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০টা দেশে ভ্রমণ করেছেন তিনি। জানালেন, সেখানেও আছে মজার মজার সব অভিজ্ঞতা। আইফেল টাওয়ারের সামনে নিরাপত্তার কারণে চুলা জ্বালানো নিষেধ ছিল। বুদ্ধি করে তিনি সালাদ তৈরি করেছেন সেখানে। ফলে চুলাও জ্বালাতে হয়নি, আবার শুটিংও হয়েছে। আরাফাত ময়দানে রাঁধার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু অনুমতি মিলছিল না।  হোটেল কর্তৃপক্ষ সাহায্য করেছিল সেখানে। হোটেলের গাড়ি দিয়েই আরাফাত ময়দানে গিয়ে তিনটি ডিশ রেঁধেছিলেন তিনি। এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এবং আরও অনেক বিশিষ্টজনের প্রিয় খাবারের রেসিপি নিয়েও অনুষ্ঠান তৈরি করেছেন তিনি। প্রতিটি অনুষ্ঠান তৈরির আগে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়েছে রিসার্চের জন্য।

কেকা ফেরদৌসীর টেলিভিশনে রান্নার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে চ্যানেল আইতে থাকছে নানা আয়োজন। আজ বাংলাদেশ সময় বিকাল পাঁচটায় ভারতের জি বাংলা চ্যানেলের জনপ্রিয় রান্নার অনুষ্ঠান ‘রান্নাঘর’-এ দেখানো হবে রন্ধন শিল্পী ফেরদৌসীর রান্নার অনুষ্ঠান। ২৫ বছরে সেরা পঁচিশ ‘বাংলাদেশী রেসিপি কনটেস্ট ২০১৭’ করা হচ্ছে। ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা বাংলাদেশ থেকে ঐতিহ্যবাহী খাবারের রেসিপি পাঠানোর সুযোগ রয়েছে রাঁধুনিদের। সেরা পঁচিশ রেসিপি মেকার কে দেয়া হবে সম্মাননা। সেরা পঁচিশ এর মাঝ থেকে বেস্ট রেসিপি মেকার পাবেন ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার, সাথে আরও অনেক পুরস্কার। এছাড়াও, ৭ জানুয়ারি চ্যানেল আই’তে লাইভ ফুড কার্নিভ্যাল এর আয়োজন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন