চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

একাত্তরে দুর্গা মন্দিরে

স্বাধীনতা অর্জনের চার যুগ পর এখন বাংলাদেশে ত্রিশ হাজারের বেশি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পূজার সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। সরকারের দিক থেকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তবে ব্যয়ের মূল অর্থ আসে পারিবারিক বা সামাজিকভাবে। বলা হয়, বারোয়ারি শব্দটির উদ্ভব ১২ ইয়ার বা বন্ধু থেকে। কিন্তু এখন ‘বারোয়ারি পূজা’ বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

ধর্ম যার যার, উৎসব সবার এ কথার তাৎপর্য দুর্গাপূজার মতো আর কোনো উৎসবে উপলব্ধি করা যায় না। হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ ধর্মের সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সব ধর্মের নারী-পুরুষ-শিশু অংশ নিলেও দুর্গাপূজার মতো তার ব্যাপ্তি নয়। এর একটি কারণ হতে পারে এই পূজা চলে টানা পাঁচদিন। গ্রামীণ জীবনের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অন্য ধর্মের অনুসারী এমন নারী-পুরুষ কমই মিলবে, যারা শৈশবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িতে গিয়ে নারিকেলের নাড়ু, মুড়ি-খৈয়ের মোয়া আর লুচি-ভাজি খায়নি। এ সব যে জীবনেরই অংশ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, ঈদের সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যায় মুসলিম বন্ধুদের বাড়িতে। আমার শৈশবের কথা বলতে পারি, বরিশালের গৈলায় শৈশব কেটেছে। বাবা সত্যরঞ্জন দাশগুপ্ত আমাদের তিন ভাইকে প্রতি ঈদে যেতেন তার মুসলিম বন্ধুদের বাড়ি। এক বাড়ি খেয়েই পায়ে হেঁটে আরেক বাড়ি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যাই আমরা তিন ভাই। সেসময় এলাকার অনেক মুসলিম পরিবার বাবা-মাকে আশ্রয় দিয়েছে। তিন মুক্তিযোদ্ধার পরিবারকে আশ্রয় দেওয়ার প্রচণ্ড ঝুঁকি ছিল। রাজাকাররা কেবল হুমকি দেয়নি, আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু দুষ্টবুদ্ধির লোকদের কাছে তারা হার মানেনি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুর্গা পূজায় ছিলাম ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পালাটানা নামের এক বনে। পাহাড়ি এলাকা, ছোট ছোট মাটির টিলা। গভীর ও অগভীর খাদও আছে। তবে এ সবের অবস্থান অপরূপ শোভা ছড়ানো বৃক্ষরাজির মাঝে মাঝে। এক রাতে খোলা ট্রাকে করে আমাদের প্রায় ১৭শ’ জনকে পৌঁছে দেওয়া হলো সেই বনভূমিতে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। পাহাড়ি কাঁচা মেঠো পথ। ট্রাকে ঝাঁকুনি প্রবল। পেটে ক্ষুধা। কিন্তু সব ভুলে যাই অনন্ত আনন্দের। পরদিন সকাল থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের ট্রেনিং শুরু হবে যে!

বন-জঙ্গল ছাপ করে বানানো মাঠে আমাদের নামিয়ে দেওয়া হলো। মাইকে ঘোষণা হলো ৫০ জন এগিয়ে আসো। এভাবে যারা এগিয়ে যায়, তাদের নিয়ে গেলেন একজন। এক সময় আমার পালা আসল। এক অচেনা লোককে অনুসরণ করে আমরা ৫০ জন স্বল্প দূরত্বের অন্ধকার পথে, যার শেষ হয় যে বাঁশ-পলিথিনের ব্যারাকে, সেখানে একটি হ্যারিকেন মিটিমিটি জ্বলছিল। আমরা যার যার বিছানা খুঁজে নেই। নরম মাটিতে পলিথিন বিছানো পুরো ব্যারাক জুড়ে। প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দ একটি শতরঞ্জি, মুখের ফু-দিয়ে ফুলোনো যায় এমন একটি বালিশ, একটি অ্যালুমিনিয়ামের মগ এবং দুটি লুঙ্গি। রাতে পরতে গিয়ে টের পাই হাটুর সামান্য নিচে থেমে গেল লুঙ্গির দৌড়। ব্যারাকে আসার ঘণ্টা খানেক পর ডাক পড়ল খাবারের জন্য। রুটি আর মাসকলায়ইয়ের ডাল। কী উপাদেয়!

শেষ রাতে আবার বাঁশির সুতীব্র আর্তনাদ ট্রেনিংয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তার আগে প্রাতঃকৃত্য, হাত-মুখ ধোয়া ও ব্রেকফাস্ট। প্রাতঃকৃত্যের জন্য জলের পাত্র কোথায়? অজানা কণ্ঠে উত্তর এলো। মগটি নিয়েই টিউবওয়েলের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ুন। লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে টের পাই, আমার সামনে শ’ দুই আর পেছনে আরও বেশি তরুণ। ততক্ষণে সামান্য আলো ফুটছে। আধা ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়ানোর পর জল মিলল এবং সেটা নিয়ে ল্যাট্রিনের লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে দেখি ডজন খানেক সামনে দাঁড়ানো। মুহূর্তে পেছনে আরও কয়েকজন দাঁড়িয়ে গেল। সারি সারি ল্যাট্রিন, পাটের চট দিয়ে আচ্ছাদন। তবে একটি থেকে আরেকটির ভেতরে প্রায় সব দেখা যায়।

অনেক ক্লেশ-যন্ত্রণা শেষে ল্যাট্রিন থেকে বের হয়ে টিউবওয়েলে মুখ ধোয়ার জন্য লাইনে দাঁড়াতে গিয়ে শুনতে পাই ফের বাঁশি দ্রুত হাতের মগটি নিয়ে নাস্তা বা ব্রেকফাস্টের লাইনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। কিন্তু মগটি যে ল্যাট্রিন ঘুরে এসেছে। তাতে কী ট্রেনিয়ের চেয়ে বড় কিছু নেই।

এক টুকরো পাউরুটির সঙ্গে লিকার চা। ব্রেকফাস্ট শেষে না ধোয়া মগটি ব্যারাকে রেখেই ছুট ট্রেনিং এলাকায়। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পাহাড়ি উঁচু-নিচু ও জলকাদার পথ পাড়ি দেওয়ার পর আমাদের জনা পনেরকে বসিয়ে দেওয়া হলো তিনজন ভারতীয় সৈনিকের সঙ্গে। আশপাশে এ ধরনের আরো অনেক দলের গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিংও শুরু হলো।

দুপুরে বলা হলো, ঘণ্টা দুয়েক পর আবার ট্রেনিং। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরত্বের ব্যারাকে গিয়ে খেয়ে আসতে হবে। আমরা বিনা প্রশ্নে সেটা মেনে নিলাম। দেশকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করতে হবে যে! প্রথম দিনেই প্রায় ২০ কিলোমিটার আমরা দৌড়েছি ট্রেনিংয়ে যাওয়া-আসার পথে। সন্ধ্যায় আরও প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে গিয়ে গোমতী নদীর ঘোলা জলে তৃপ্তির স্নান। একটি সুবিধা অবশ্য ছিল। খরস্রোতা পাহাড়ি নদীর গভীরতা হাটু অবধি। পরে অবশ্য বুঝেছি, এ সব ছিল কঠোর সামরিক জীবনেরই অংশ।সামরিক প্রশিক্ষণ চলল তিন সপ্তাহ বা ২১ দিন। একই রুটিন অনুসরণ করি। ব্যারাক ও ট্রেনিং এলাকায় জানাজানি হয়ে গেল। ২১ শ’ জনের মধ্যে আমিই একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র।

বিজ্ঞাপন

৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ‘যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে’ আহ্বানের পর এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠেও প্রাথমিক কিছু ট্রেনিং নিয়েছি। এ কারণে বাড়তি সমীহ মিলছে। ভারতের সৈনিক ও অফিসাররাও বিস্মিত বাঙালিরা। কীভাবে মৃত্যু উপত্যকা পাড়ি দিয়ে যুদ্ধবিদ্যা শেখার জন্য ভারতের ভূখণ্ডে এলো? ক্যাপ্টেন পন্থ নামের এক অফিসার একদিন একান্তে বলেন, ভারতের বাঙালিরা সামরিক বাহিনীতে যেতে তেমন উৎসাহী নয়। তারা অফিসের কাজ করতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ যে ভয়ঙ্কর পথ অতিক্রম করে ভারতের মাটিতে পৌঁছে গেছে এবং সেখান থেকে দ্রুত ট্রেনিং নিয়ে বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের অধিকৃত মাতৃভূমিতে ফিরতে ব্যাকুল তাদের হিসাবে অনেক কিছু মিলছে না।

২১ দিন ট্রেনিং শেষে আমাদের কিছু পারিশ্রমিক বা বেতন মিলল। প্রতিদিন ১ টাকা করে ২১ টাকা। কী যে আনন্দ হয়েছিল, বলে বোঝাতে পারব না। যে দিন টাকা হাতে এলো, সেদিনই বিকেলে আমাদের পালাটানা ক্যাম্পের পলিটিক্যাল মোটিভেটর গৌরঙ্গ মিত্র (ঢাকার নটরডেম কলেজ ও হলিক্রস কলেজের মিত্র স্যার) আনন্দ সংবাদ দিলেন।

আশপাশের শরনার্থী শিবিরগুলোতে দুর্গা পূজা হচ্ছে। যারা যেতে ইচ্ছুক, তাঁর পেছনে লাইনে যেন দাঁড়িয়ে যাই। আমরা প্রায় একশ’ জন তাঁর অনুগামী হই। পালাটোনার বনের আশপাশে যে বাংলাদেশ থেকে আসা শরনার্থীদের শিবির রয়েছে, সেটা জানা ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, ট্রেনিংয়ে আসার পর এই প্রথম আমাদের মুক্ত জীবনের স্বাদ মিলল।প্রথম মন্দিরে গিয়েই আমরা অভিভূত। দেবী দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্র, যে হাতে অসুরকে বিদ্ধ করা লেজা বা বল্লম।

সে হাতেই ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। আমাদের ব্যারাকের মাইকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বাজানো হয়। কিন্তু অনেক দিনের মধ্যে এই প্রথম বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখলাম। সেটাও আবার মন্দিরে, যেখানে পবিত্র আচার-অনুষ্ঠান মেনে পূজা হচ্ছে! চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এলো। মন্দির দর্শনে বের হওয়া আমাদের দলের প্রায় সকলে মুসলিম ধর্মাবলম্বী। তারাও অভিভূত। জাতির পিতা মানুষের অন্তরে কী যে আসন করে নিয়েছেন, সেটা পাহাড়ি বনের মধ্যে এমন পূজার আয়োজনে না এলে বোঝাই যেত না।

মিত্র স্যারের অনুগামী হয়ে পায়ে হেঁটে আরও কয়েকটি মন্দিরে গেলাম, প্রতিটির আয়োজনে ছিলেন শরনার্থীরা। তারা ইন্দিরা গান্ধীর মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে চলেন। পাহাড়ি এলাকায় কষ্টের জীবন। প্রাণ বাঁচাতে অন্য দেশের মাটিতে আশ্রয় নিয়েছেন। শরৎ এসেছে, শিউলি ফুল ফুটেছে। সেটা আমাদের জানা ছিল না।

কিন্তু তারা দুর্গা দেবীকে সময়মতোই আবাহন করেছেন। শক্তির দেবীর কাছে রণাঙ্গনের যোদ্ধাদের জন্য প্রার্থনা করেছেন, এটা জানা গেল ভক্ত-পূজারীদের কাছ থেকে। সব মন্দিরেই দেবী দুর্গা ও অন্য দেবদেবীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছবি। যুগ যুগের সংস্কার কীভাবে ভেঙে গেল, সাহস করে দুয়েকজনকে এ প্রশ্ন রাখি। উত্তর অভিন্ন। মানুষের মনে জাতির পিতা যে সুউচ্চ অবস্থানে অধিষ্ঠিত। তিনি একটি দেশের জন্ম দিয়েছেন। বাঙালির স্বপ্ন-আশা আবর্তিত হচ্ছে, পরিপূর্ণতা পাচ্ছে তাকে কেন্দ্র করেই। মন্দিরে মন্দিরে পাকিস্তানের কারাগার থেকে তাঁর মুক্তির জন্য প্রার্থনা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। তার আগে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দালালরা। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাসেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের জন্য যে সংবিধান রচনা করেন, তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হয়। বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বী, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের জন্য, সর্বোপরি অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রতিটি মানুষের জন্য এ ছিল এক শ্রেষ্ঠ উপহার। আমাদের দুর্ভাগ্য, ধর্মান্ধ চরমপন্থিদের চাপে এ অর্জন ধরে রাখা যায়নি। সামরিক শাসনামলে বাংলাদেশে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়েছে।

১৯৬৫ সালে আইযুব খান-মোনায়েম খান ‘শত্রু সম্পত্তি’ নামের যে কলঙ্ক এ দেশের বুকে লেপন করে দিয়েছিলেন তার হাত থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক পরও মুক্তি মেলেনি। কিন্তু তাতে বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ম্লান হয় না। তিনি বাঙালি জাতিকে মাথা উঁচু করে চলার পথ দেখিয়েছেন। ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে চলতে চেয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা সে পথেই চলতে দৃঢ়সংকল্প।

শারদপ্রাতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁর আদর্শের পথে বাংলাদেশ চলুক অবিরাম, এটাই প্রার্থনা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

Bellow Post-Green View