চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

আমার বড় ফুফু’র বাড়ি…

এক
আমার বড় ফুফু’র বাড়ি ছিল তারাকান্দি- সে অনেক দূরের পথ। ছোটবেলায় যখন ঢাকা থেকে স্কুলের ছুটিছাটায় বিশেষ করে গ্রীষ্মের সময়টাতে ফুফুর বাড়ি যেতাম তখন মনে হতো- ফুফুর বাড়ি এতদূর!

আমি তখন স্কুলে, ক্লাস সিক্স- সেভেন। গুলিস্তান হলের উল্টোদিকে ছিল বিআরটিসির বাস ডিপো। ডিপোর পাশেই বঙ্গভবন। সেখান থেকে বাসে নরসিংদী বাস টার্মিনাল- টার্মিনালের পাশে একটা সিনেমা হল ছিল। বাস থেকে নেমে এক ধরনের অদ্ভুত কিছিমের গাড়িতে উঠতে হতো। পুরনো জিপ গাড়িকে নানান কেরামতি আর প্রযুক্তির মিশেলে জিপ খানাকে রূপান্তরিত করা হয় প্রায় যাত্রীবাহী মিনিবাসে। মুখোমুখি দু সারির সিটে যাত্রীদের চাপাচাপি করে বসতে হতো। প্রায় সময়ই বড় ভাই তার পাশে কাউকে বসার সুযোগ করে দিয়ে আমাকে নিজের কোলে বসিয়ে গরমের মধ্যে গাদাগাদি করে ঘেমে নেয়ে এক দেড় ঘণ্টার দুঃসহ পথ পাড়ি দিতেন। সদ্য পিতৃমাতৃহীন বড় ভাই আমার সিট ভাড়া বাঁচাতেই আমাকে নিজের কোলে তুলে আরেকজনকে বসার সুযোগ করে দিতেন।

বিজ্ঞাপন

নরসিংদী থেকে কত গ্রাম-কত গঞ্জ কত বাজার ছাড়িয়ে গিয়ে আমাদের লক্কড় ঝক্কর মার্কা জিপ গিয়ে পৌঁছাত মনোহরদী। মনোহরদী তখন নীরব শুনশান এক সড়কের নাম। মনোহরদীর পর থেকে পুরোটাই মাটির রাস্তা- একেবারে ড্রেনের ঘাট পর্যন্ত। রিকশায় যেতে যেতে পড়ত নোয়াকান্দি- বারিষাব- কাঁঠালতলি, তারপর আমার বড় ফুফুর বাড়ি।

মাটির সড়ক ধরে রিকশা যখন চলত তখন আশেপাশের নিথর নির্জনতাকে আরও নির্জন করে তুলত রিকশার চেইন থেকে তৈরি হওয়া এক সুমধুর আওয়াজ। ফুফুর বাড়ি যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেই আওয়াজ শুনতাম আর অপেক্ষায় থাকতাম ফুফু বাড়িতে গেলে কখন আমার ছোট দুই ভাইকে দেখব। সোহেল থাকত বড় ফুফুর বাড়ি তারাকান্দি আর শিবলি থাকত পাশের গ্রাম লেবুতলায়। ফুফুদের গ্রামের পাশ দিয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের ম্রিয়মান শাখা বয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বড় ফুফু তাঁর নাতিদের সঙ্গে অথইকে দেখছেন।

দুই
রিকশা থেকে নামার আগেই ফুফু জেনে যেতেন আমাদের আসার খবর। আমার বড় ফুফুর গায়ের রঙ ছিল অসম্ভব রকমের টকটকে ফর্সা- ফুফুর চোখে ছিল এক আশ্চর্য দৃষ্টি।

আমরা বাড়ির উঠোনে গিয়ে দাঁড়ালে ফুফু কাজকর্ম ফেলে ছুটে আসতেন। ফুফু আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। পিটপিট করে দেখতেন আমাদের। তারপর জড়িয়ে ধরতেন- মুখে, বুকে, হাতে ধরে ধরে পরখ করতেন যেনবা অনেকদিন পর তিনি তাঁর অতি আপনজনের স্পর্শ পেয়েছেন।

এভাবে অনেকটা সময় অতিক্রান্ত হলে আমি ফুফুর মুখ থেকে শুনতে পেতাম তিনি বাড়ির মানুষজনদের বলছেন, দেখছছ! দেখছছ! এইটা হইছে পুরা আমার ভাই রেজু’র ( আমার বাবার নাম রিয়াজউদ্দিন আহমেদ- কিন্তু আমার বড় ফুফু এই নামেই ডাকতেন বাবাকে ) মতন- বলে ফুফু দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। ফুফু বলতেন, তুই পাইছছ আমার ভাইয়ের ডগ- ডগ মানে চেহারা। ফুফু আমাদের খুব আদর করতেন।

কত বছর চলে গেল। বছর দশেক আগে ফুফু মারা গেছেন।  আমি এখনো সময়ে, অসময়ে কান পাতলে ফুফুর দীর্ঘশ্বাসের সেই শব্দ শুনতে পাই…।