অনেকগুলো লজ্জার রেকর্ডে নাম লিখিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে সিরিজের প্রথম টেস্টে মুখ থুবড়ে পড়েছে বাংলাদেশ দল। হেরেছে ইনিংস ও ২১৯ রানের ব্যবধানে। হার নিশ্চিতই ছিল। দেখার ছিল ব্যবধান কতটা কমানো যায় এবং ম্যাচের পরিধি কতটা লম্বা হয়। তৃতীয় দিনের প্রথম সেশনেই অ্যান্টিগা টেস্টে বাংলাদেশের ভাগ্য লেখা হয়ে যায়।
৬ উইকেটে ৬২ রান নিয়ে দিন শুরু করা বাংলাদেশ নুরুল হাসান সোহানের প্রথম টেস্ট ফিফটিতে দেড়শর কাছাকাছি সংগ্রহ গড়েছে। প্রথম ইনিংসে ৪৩ রানে গুটিয়ে লজ্জার ইতিহাসে নাম লেখানো বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস থামে ১৪৪ রানে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ-৪৩ ও ১৪৪, ওয়েস্ট ইন্ডিজ-৪০৬
সকালে প্রথম বলটা লেগস্টাম্পের অনেক বাইরে ফেলেন হোল্ডার। ওয়াইড থেকে আসে দিনের প্রথম রান। পরের বলেই তৃতীয় স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন মাহমুদউল্লাহ (১৫)। সকালের প্রথম বৈধ ডেলিভারিতেই উইকেট হারানো সফরকারীরা হারের ব্যবধান কমায় সোহান ব্যাটে।
এই উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান কামরুল ইসলাম রাব্বিকে নিয়ে অষ্টম উইকেট জুটিতে যোগ করেন ২৫ রান। ৭ রান করা কামরুলকে বোল্ড করে নিজের পঞ্চম শিকার বানান পেসার শ্যানন গ্যাব্রিয়েল।
নবম উইকেট জুটিতে রুবেল হোসেনকে নিয়ে লড়ে যান সোহান। এবারের জুটিটি হয় আরও বড় ৫৫ রানের। ৭৪ বলে ৬৪ রানের ইনিংস খেলে সোহান কামিন্সের হাতে ক্যাচ তুলে দিলে লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার ১৫ মিনিট আগে ভাঙে জুটি। অ্যান্টিগা টেস্টে উভয় ইনিংস মিলে বাংলাদেশের এটিই সর্বোচ্চ রানের জুটি।

১৬ রান করা রুবেলকে কামিন্স সাজঘরে পাঠালে অলআউট হয় বাংলাদেশ। তার আগে ৩৬ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন সোহান। দেশের বাইরে এটিই বাংলাদেশের পক্ষে টেস্টে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড।
৩৬৩ রানে পিছিয়ে থেকে শুরু করা বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসেও দেখা মেলে আসা-যাওয়ার মিছিল। ব্যাটসম্যানদের মাঝে ফুটে ওঠে পেস বোলিংয়ের সামনে দুর্বলতার ভয়াল চিত্র। যে উইকেটে টপঅর্ডার-টেলএন্ডার ব্যাটসম্যানদের অবদানে ৪০৬ রান তুলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, সেই উইকেটই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য হয়ে গেল দূরহ।
প্রথম ইনিংসে ৪২ রানে গুটিয়ে যাওয়া দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দিতে পারতেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা! তবে দ্বিতীয় ইনিংসেও ভরাডুবির পর সে সুযোগ নেই। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি আর বাজে ব্যাটিংয়ের আরেকটি প্রদর্শনী প্রশ্নবিদ্ধ করছে ২২ গজে ক্রিকেটারদের নিবেদন, মনোযোগ নিয়ে। প্রথম ইনিংসে যেভাবে আউট হয়েছেন সেভাবেই দ্বিতীয় ইনিংসে আউট হয়েছেন দলের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যান।
দুই ইনিংস মিলে বাংলাদেশ করেছে ১৮৭ রান। যা কিনা এক ম্যাচে বাংলাদেশের সর্বনিম্ন সংগ্রহ। আগের সর্বনিম্ন রান ছিল ২২৬। সেটিও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ২০০২ সালে ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে প্রথম ইনিংসে ১৩৯ রানে গুটিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস শেষ হয় ৮৭ রানে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ এক ইনিংস ব্যাট করে তোলে ৫৩৬ রান। ওই ম্যাচেই সর্বোচ্চ ব্যবধানে হার দেখে টাইগাররা, ইনিংস ও ৩১০ রানের ব্যবধানে। এবারের হারও কম বড় নয়।
প্রথম ইনিংসে শুরুর পাঁচ উইকেট নেয়া কেমার রোচ ইনজুরির কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে নেননি। সে সুযোগে শ্যানন গ্র্যাব্রিয়েল নিয়েছেন টেস্টে পঞ্চমবারের মতো পাঁচ উইকেট। হোল্ডার তিনটি ও কামিন্স নেন দুটি উইকেট।
প্রথম ইনিংসে শতাব্দীর সর্বনিম্ন ৪৩ রানে অলআউট করার দিনেও ক্যারিবীয় তিন পেসার মিলে নিয়েছিলেন বাংলাদেশের ১০ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসেও তাই হল। রোচের জায়গায় গ্যাব্রিয়েল এটুকুই পার্থক্য।

দ্বিতীয় দিনের বিকেলে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশ ৬২ রানে হারায় ৬ উইকেট। তামিম ইকবালের উইকেট হারিয়ে শুরু করে বাংলাদেশ। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ৪ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেন বাউন্ডারি মেরে। তামিমের দরকার ছিল ১১ রান। সেটি পার করেই গালিতে ক্যাচ দিয়ে ধরেন প্যাভিলিয়নের পথ।
টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি গড় যার, সেই মুমিনুল হক দ্বিতীয়বারের মতো মারেন শূন্য। প্রথম ইনিংসে সর্বোচ্চ ২৫ রান করা লিটন দাস স্লিপে ক্যাচ তুলে দেন ২ রান করার পর। ১৬ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বসলে দ্বিতীয় দিনেই ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা জাগে।
দলের কঠিন সময়েও নিজেদের মেলে ধরতে পারেননি অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম (৮) ও সাকিব আল হাসান (১২)। তাদের দ্রুত বিদায়ে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়ে বাংলাদেশ শিবির। অলরাউন্ডার হিসেবে নিজেকে চেনানোর প্রয়াসে থাকা মেহেদী হাসান মিরাজ আউট হন ২ রান করে।
ক্যারিবীয়দের ইনিংসে শুরু এবং শেষের উইকেট নেন আবু জায়েদ রাহি। ইনিংসে তিন উইকেট। অ্যান্টিগায় টেস্ট অভিষেক খারাপ হয়নি এ ডানহাতি পেসারের। তবে দলের অবস্থা বিবেচনায় সেটি নিয়ে মাতামাতি করার সুযোগ ছিল না।

সফরকারীদের করা ৪৩ রানের জবাবে স্বাগতিক দল প্রথম ইনিংসে তোলে ৪০৬ রান।
প্রথম দিন ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলেছিল ২ উইকেট হারিয়ে ২০১ রান। দ্বিতীয় দিনে ৮ উইকেট হারিয়ে তারা যোগ করে আরও ২০৫ রান।
মেহেদী হাসান মিরাজ তিনটি, সাকিব আল হাসান দুটি, কামরুল ইসলাম রাব্বি ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ নেন একটি করে উইকেট।
আগের দিন ৮৮ রানে অপরাজিত থাকা ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েট থামেন ১২১ করে। লাঞ্চ বিরতির পর উইকেটে এসেই সাজঘরে ফেরেন এ ওপেনার। এরপর আসে আরও দুই সাফল্য। একপ্রান্তে সাকিব আল হাসান অন্যপ্রান্তে মেহেদী হাসান মিরাজ। দুই স্পিনার মিলে দ্রুতই তুলে নেন আরও ২ উইকেট।
৩ উইকেটে ২৭১ রান নিয়ে লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়া দলের স্কোর বিরতির পরপরই হয়ে যায় ৬ উইকেটে ২৮৮। ১৬ রানের ব্যবধানে বাংলাদেশ ৩ উইকেট তুলে নিয়ে চা-বিরতির আগেই দশ উইকেট তুলে নেয়ার আশা জাগায় স্পিনাররা। তবে সপ্তম উইকেটে ক্যারিবীয়দের ৫০ রানের জুটি অপেক্ষা বাড়ায়।
মিরাজের দ্বিতীয় শিকার হয়ে ৩৩ করা জেসন হোল্ডার সাজঘরে ফিরলে ভাঙে জুটিটি। হোল্ডারকে ফিরিয়ে দেশের পক্ষে দ্রুততম ৫০ উইকেট শিকারের রেকর্ডে ভাগ বসান বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে। তার আগেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের শততম উইকেট শিকার করেন মিরাজ।
১৩ টেস্টে ৫০ উইকেট মিরাজের। রফিকেরও লেগেছিল সমান ম্যাচ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে রফিক ছুঁয়েছিলেন ৫০ উইকেটের মাইলফলক। ১৪ বছর এককভাবে এ গৌরব ধরে রাখতে পেরেছেন রফিক।
ক্যারিবীয়দের পরের জুটিটি হয় আরও বড়। বাংলাদেশের ব্যাটিং ধসিয়ে দেয়া কেমার রোচের সঙ্গে হোপ গড়েন ৫৬ রানের আরেকটি বড় জুটি।
৫১ রানে জীবন পাওয়া এ ডানহাতি ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফেরেন ৬৭ রান করে। রাহির বাউন্সারে গালি অঞ্চলে হোপের সহজ ক্যাচ ছাড়ে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। রাহির তৃতীয় শিকার হয়ে গ্যাব্রিয়েল সাজঘরে ফিরলে অলআউট হয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ।









