আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামি শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হকের ৪৮তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৬৯ সালের এই দিনে তাকে ঢাকা সেনানিবাসে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
জহুরুল হকের জন্ম ৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ সালে, নোয়াখালী জেলা শহরের সোনাপুরে। ১৯৫৩ সালে নোয়াখালী জিলা স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ওই বছরই যোগ দেন বিমানবাহিনীতে। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তিনি গ্রেপ্তার হন। গ্রেপ্তার করে জহুরুল হককে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটকে রাখা হয়।
একই অভিযোগে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর বাঙালি অফিসারদের অভিযুক্ত করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। মামলায় ৩৫ জন আসামির মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন ১ নম্বর। সার্জেন্ট জহুরুল হক ছিলেন ১৭ নম্বরে। মামলার আসামিদের দেশরক্ষা আইন থেকে অব্যাহতি দিলেও আর্মি, নেভি অ্যান্ড এয়ারফোর্স অ্যাক্ট-এ আবারও গ্রেপ্তার করে কুর্মিটোলা সেনানিবাসে স্থানান্তর করা হয়।
১৯৬৮ সালের ১৯ জুন পাকিস্তান দণ্ডবিধির ১২১-ক ধারা এবং ১৩১ ধারায় আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার শুনানি শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে তখন একদিকে এই মামলা প্রত্যাহার এবং শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করছে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খান রাজনৈতিক দলগুলোকে গোলটেবিল বৈঠকে বসতেও প্রস্তাব করছেন। অন্যদিকে সেই সময়েই কুর্মিটোলা সেনানিবাসে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক ঘটনা। আটক সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেখানে গুলি করে হত্যা করে পাহারার দায়িত্বে থাকা এক পাকিস্তানি সেনা।
সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যাকাণ্ড
১৯৬৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বাঙালি শিশুরা কুর্মিটোলা সেনানিবাসের কাছে সৈনিকদের খাবারের উচ্ছিষ্ট সংগ্রহের জন্য ভিড় করলে অবাঙালি সৈনিকেরা কয়েকজন শিশুকে ধরে এনে বন্দীনিবাসের সামনে মারধর শুরু করে। কয়েকজন বন্দী এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে হাবিলদার মনজুর শাহ বন্দীদের নিজ নিজ কামরায় ফিরে যেতে আদেশ করেন।
কিন্তু জহুরুল হক সে আদেশ অমান্য করে তার সঙ্গে তর্ক চালিয়ে যান। এতে মনজুর ক্ষেপে গিয়ে রাইফেলের বেয়নেট বাগিয়ে তার দিকে ধেয়ে যান। সার্জেন্ট জহুরুল হক তাকে পাশ কাটিয়ে তার হাত থেকে রাইফেল কেড়ে নেন এবং কিছুক্ষণ পর বিজয়ীর মতো কামরার দরজায় গিয়ে রাইফেলটা আবার ফিরিয়ে দেন।
পরদিন ভোরবেলা জহুরুল হক নিজ কামরা থেকে বের হলে মনজুর শাহ তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। সেই গুলি লাগে তার পেটে। সাথে সাথে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। ১৫ তারিখেই রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে জহুরুল হক মারা যান।
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জনগণ প্রচণ্ড আন্দোলনে ফুঁসে ওঠে। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবসহ সব বন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া হয়।








