দেশের দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাসরত অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবিকায়নে ক্ষুদ্র পুঁজির অভাবের দুর্ভোগ নতুন নয়। বহু বছর ধরেই চরের অতিদরিদ্র মানুষদের এই সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে দুর্গম চরাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের জন্য এই সংকটটা সবচেয়ে বেশি। পুঁজির অভাবের কারণে চরের কৃষক থেকে শুরু করে যারা ক্ষুদ্র বিভিন্ন ধরনের প্রথাগত ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের বেশির ভাগকেই এই দুর্ভোগ মোকাবিলা করতে হয়।
আবার পুঁজি সহায়তার প্রবাহ না থাকার কারণে চরের মানুষ বিকল্প কর্মসংস্থানের সাথেও যুক্ত হতে পারছে না। চরের মানুষের মধ্যে থেকে সেই অর্থে নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে না। ছোট বা বড় কোনো চরাঞ্চলেই সেই অর্থে সরকারি বা বেসরকারি যায় বলি না কেন কোনো ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক কার্যক্রম নেই বললেই চলে। ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায়ে উচ্চশিখরে অবস্থিত দেশের এনজিওগুলোও এ বিষয়ে নিরব। দুর্গম চরাঞ্চলে তাদের কার্যক্রম একেবারেই সীমিত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন চরাঞ্চলে পুঁজির প্রবাহ বাড়ানো গেলে বিকল্প নানান ধরনের কর্মসংস্থানের পথ উন্মুক্ত হতো। একই সাথে চরের যে বিরাট জনশক্তির মূল্যবান সময়ের অপচয় হয় সেটাও রোধ করা যেত।
চরের বেশিরভাগ মানুষ কৃষিকাজের সাথে জড়িত। এর বাইরে মাছ ধরা, গবাদি পশুপালন, দিনমজুরি বর্গাচাষ, হাঁস-মুরগী পালন, পণ্যফেরি, মাটি কাটা ইত্যাদি সব কাজের সাথে জড়িত। মৌসুমী শ্রমিক হিসেবে আরেক এলাকায় কাজ করতে যায় চরের বিপুল সংখ্যক মানুষ। আমরা দেখেছি অর্থের অভাবের কারণে চরের অনেক কৃষক প্রয়োজনীয় বীজ, সার, কৃষিযন্ত্রপাতি ক্রয় করতে পারে না। অর্থের কারণে অনেকে জমিতে সঠিকভাবে সেচ দিতে পারে না। চরের সম্ভাবনাময় ফসল হলো- ধান, বাদাম, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, গম, মাসকালাই।
সবজির মধ্যে কুমড়া, পটল, শাক, চিচিঙ্গা, পেঁপে, বেগুন, কচু চরাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া স্থানভেদে এখন কালজিরা, ধনিয়া, মেথিসহ বিভিন্ন ধরনের মসলার চাষও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একই সাথে ভেষজ জাতীয় গাছেরও চাষাবাদ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে চরাঞ্চলে। উল্লিখিত ফসল, সবজিসমূহ চাষবাস করে বাড়তি আয়ের মাধ্যমে চরের অনেক কৃষাণীই তাঁদের জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে পুঁজি স্বল্পতার কারণেই।
যে কথা আগেই বলেছি চরের মানুষের একটি বড় সমস্যা হলো পুঁজি বা অর্থের সংকট। বেশির ভাগ চাষীর পুঁজি বলে কিছু নেই। এর মধ্যে চরের নারী কৃষকদের অবস্থা আরও করুণ। পুঁজির সমস্যা থাকার কারণে চরের কৃষকরা ইচ্ছে করলেই ভালো বা বৈচিত্র্যময় ফসল ফলাতে ও উৎপাদন করতে পারে না। চরের অনেক কৃষক জানিয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক কোনো খাত থেকেই তারা সে অর্থে কোনো ধরনের ঋণ সুবিধা পান না।

ব্যাংক একাউন্ট না থাকা, ব্যাংক দূরবর্তী স্থানে হওয়ার কারণে কখনই তারা এ ধরনের সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন না। এদিকে নানান অজুহাত দেখিয়ে এনজিও’রাও দুর্গম চরাঞ্চলে কোনো ধরনের মাইক্রোফিন্যান্স কার্যক্রম করতে আগ্রহ দেখান না। উত্তরবঙ্গের অনেক দুর্গম চরাঞ্চলে আমরা দেখেছি সেখানে এনজিওরাও কোনো ধরনের ক্ষুদ্র কার্যক্রম করে না। বিশেষ করে নদী ভাঙন প্রবণ এলাকাতে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্যণীয়।
দেশের পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট জেলার বিরাট এলাকা জুড়ে রয়েছে চরাঞ্চল। এখানে অনেক বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলও রয়েছে। যেখানে যেতে অনেক সময়ও লাগে। কিন্তু এইসব চরাঞ্চলে মাইক্রোফিন্যান্স বা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই বললেই চলে। চরবাসীর স্থায়ী আবাস নেই এমন যুক্তি দেখিয়ে এনজিওরা ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকে।
চরবাসীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন এনজিওরা প্লেইন বা মূলভূমিতে যাকে ইচ্ছে তাকে ঋণ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। যার দরকার নেই তাদেরকেও তারা ফুসলিয়ে ঋণ ধরিয়ে দেয়। কিন্তু চরাঞ্চলের বেলায় তাদের নীতি একেবারেই উল্টো। চরাঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণের বিরাট চাহিদা থাকলেও এনজিওরা চরে এই কার্যক্রম চালাতে ইচ্ছুক নয়। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার অনেক চরের নারীরা এমন অভিযোগ করেন শুস্ক মৌসুমে বাদামে প্রয়োজনীয় পানি দিতে না পারার কারণে তাদের বাদাম ক্ষেত পুড়ে যায়।
সেসময় তারা অর্থের অভাবে পানির ব্যবস্থা করতে পারেননি। সেটা করতে পারলে তারা বাদাম বাঁচাতে পারতেন। একইভাবে এরকম ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্গম চরাঞ্চলে। এই উপজেলায় উজিরপুর এবং পাকা দুটি ইউনিয়ন-ই দুর্গম চর এলাকা। মূলভূমি থেকে এই চরে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চড়ে যেতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগে।
এই চরেও আমরা দেখেছি কোনো এনজিও’র ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই। এখানকার চরবাসীর অভিযোগ সরকারি বা বেসরকারি কোনো ধরনের প্রতিষ্ঠান থেকেই তারা কোনো ধরনের ঋণ নেওয়ার সুবিধা পান না। পুঁজির সমস্যার কারণে তারা উৎপাদনমূলক অনেক কার্যক্রম করতে পারেন না। পিকেএসএফ-এর অর্থায়নে যে সব সংগঠন ঋণ কার্যক্রম করে সেখানেও দেখা গেছে তারা চরাঞ্চলে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম সেভাবে করে না।
ন্যাশনাল চর অ্যালায়েন্সের সভাপতি থাকা অবস্থায় প্রয়াত খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ অনেকবারই এই- প্রস্তাব দেন যে, পিকেএসএফ তাদের সদস্য সংগঠনসমূহকে এই মর্মে শর্ত বা দিকনির্দেশনা দেয় যে অবশ্যই কর্মএলাকায় চরাঞ্চল থাকলে পিকেএসএফ থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি অংশ চরের মানুষের জন্য দিতে হবে। অর্থের অভাবের কারণেই খোদ চরের মানুষের মধ্যে থেকে সেভাবে উদ্যোক্তাও তৈরি হয়নি। চরের অনেক তরুণ-তরুণী বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েও দেখা গেছে তারা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা পাচ্ছে না।
চরাঞ্চলে বেকারত্ম বাড়ছে না কমছে তা স্ববিস্তারিত গবেষণার দাবি রাখে। কিন্তু বর্তমানে অনেক চরেই দেখা যায় কৃষি মৌসুম শেষ হওয়ার পর বেকার যুবকরা শুয়ে-বসে দিন কাটাচ্ছে। এ কারণেই অনেক চরে জুয়া খেলা বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে কোথাও কোথাও মাদক ব্যবসাও এখন জমজমাট হয়ে উঠেছে। মোর্দ্দা কথা চরাঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থান খুব একটা গড়ে উঠছে না। ফলে চরের মানুষের জীবিকায়নের দুর্ভোগের চিত্র দীর্ঘ হচ্ছে। করোনাকালে সেটি যেনো আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
আমি মনে করি চরের মানুষের সামগ্রিক সৃজনশীলতা এবং উৎপাদনশীলতা এগিয়ে নিতে হলে দুর্গম চরাঞ্চলে পুঁজিপ্রবাহ আরও বাড়াতে হবে। চরে পুজিঁপ্রবা যত বাড়তে ততই চরগুলো উৎপাদনে আরও সমৃদ্ধ হবে। আর একই সাথে কমে আসবে বেকারত্ম। কবে আসবে আর্থিক সংকট। এ বিষয়ে নীতি-নির্ধারকদের মনোযোগী হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। জীবিকায়নের দুর্ভোগ কমিয়ে আনতে চরে পুঁজি প্রবাহ বাড়াতেই হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







