১৫ মার্চ ওই শুক্রবারের ঘটনা আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি। ওইদিন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদ ও লিনউড মসজিদে মুসলমানদের জুম্মা আদায়ের সময়ে সংঘটিত হয় ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ। ধর্মীয় আচার পালনের সময়ে ধর্মের দোহাইয়ে প্রতিশোধ স্পৃহায় নির্বিচারে নিরীহ মানুষের উপর গুলি করে চালানো হয় এ হত্যাযজ্ঞ যা শুধু মুসলমানদেরকে নয়, সব ধর্মের মানুষদের শোকে স্তব্ধ করে দেয়। পঞ্চাশের অধিক মানুষ এই ঘটনায় নির্মমভাবে নিহত হন এবং আহত হন আরো অনেকে।
প্রার্থনায় নিয়োজিত অবস্থায় এমন বর্বরোচিত ও ন্যাক্কারজনক হত্যাযজ্ঞে নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লিখিত হলো এক কাল অধ্যায়ের। কিন্তু, পরের শুক্রবারই ২২ মার্চ ক্রাইস্টচার্চের সেই আল নূর মসজিদেই রচিত হলো মানবতার, সহানুভূতির, সহমর্মিতার সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। প্রায় ২০ হাজার নারী-পুরুষ সেদিন মুসলিম ধর্মীয় আচার ‘জুম্মা’ আদায় করেন। যাদের মধ্যে কেবল ৫ হাজার মানুষ ইসলাম ধর্মের অনুসারী, বাকি ১৫ হাজার অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসের। তারা আসেন ধর্মের নামে যে চরম অধর্ম সংঘটিত হয়েছে তার প্রতিবাদ জানাতে এবং মুসলমানদের প্রতি সহমর্মিতা ও একাত্মতা জানাতে।
ধর্ম তো এমনই হওয়া উচিত। যা একে অন্যের প্রতি ভালবাসা দেখানোর কথা বলে, হত্যা বা ধ্বংস নয়। সব ধর্মের সেরা ধর্ম যে মানব ধর্ম তার উৎকৃষ্ট নজির সেদিন দেখিয়েছিল নিউজিল্যান্ড।
আসলে ধর্ম কী? যা মানুষকে সত্য ও শান্তির পথ দর্শায় তাই তো ধর্ম। জীবে দয়া দেখানো, অন্যের বিপদে সহায়তা করা, ভিন্ন ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া- এসব হলো ধর্মের মূল কথন। আল কুরআন, বাইবেল, গীতা, ত্রিপিটক- সকল ধর্মগ্রন্থের মূল নির্যাস তাই। আমরা এমন কোন কিতাবের কথা কোথাও শুনিনি যা মানবতার বিরুদ্ধে বলে। যেখানে কোন ধর্মেই বিনা কারণে হত্যা বা ধ্বংস বা নির্মমতাকে জায়েজ করা হয়নি, সেখানে যারা ধর্মের নামে এমন নির্মম অধর্মের কাজ করে তারা আসলে কোন ধর্মের অনুসারী? এদেরকে কি কোনোভাবেই ধার্মিক বলা যায়? ধর্মের নামে বা দোহাইয়ে নির্মম হত্যাযজ্ঞ বা অমানবিকতাকে আর যাই হোক ধর্ম বলা যাবে না। এর নাম অধর্ম। আর এমন অধর্ম কোন অজুহাতেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা ঘৃণ্য।
ভিন্ন ধর্মের হওয়ার পরও নিউজিল্যান্ডের হাজার হাজার মানুষের সাথে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আহডার্নও সেদিন (২২ মার্চ) আল নূর মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন মুসলমানদের প্রতি সংহতি, সহানুভুতি ও একাত্মতা জানাতে। নেতা তো এমনই হতে হয় যিনি জাত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে তার সকল নাগরিককে সমান চোখে দেখেন এবং তাদের সুখ ও দুঃখের অংশীদার হন।
অথচ আমাদের দেশে কী দেখি? কেউ কেউ ব্লগার হত্যা জায়েজ করে দেন, নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের বেঁচে থাকার প্রধান নাগরিক অধিকার দিতেও অস্বীকার করেন। তাদের কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে দেশান্তরী হয়েছেন। এজন্য আমাদের বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধ নেই। পাশাপাশি নেতৃত্বের মৌলিক তারতম্য দেখেও লজ্জিত হই।
সকল ধর্মের মানুষদের গভীর ভালবাসায় এক কাতারে নামাজ আদায়ের দৃশ্য টিভিতে দেখে সেদিন চোখের পানি আটকানো যাচ্ছিলো না। কী যে চমৎকার দৃশ্য! একঝাঁক মানবিক মানুষের এমন সহৃদয় সম্মীলন দেখে মানবহৃদয় আপ্লুত না হয়ে পারে না।
জীব ও জীবনের প্রতি প্রদর্শিত ভালবাসা দেখে চোখে যখন অবিরাম পানি চলে আসে সেটাই তো প্রকৃত ধর্ম। আর এমন ধর্মই তো অন্তরে লালন করতে হয়। আশরাফুল মাখলুকাত মানে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হওয়ার শিক্ষা এদের কাছ থেকেই তো নিতে হয়। তারা প্রমাণ করে দেখিয়েছে যে সবার আগে আমরা সবাই মানুষ এবং সব ধর্মের সেরা ধর্ম মানবধর্ম। কুর্নিশ জানাই এমন নেতাকে, নতশির কুর্নিশ জানাই এমন মানবধর্মকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







