পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আইনগতভাবে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেলে ন্যাটোতে যোগদানের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে প্রস্তুত বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি। জার্মানির রাজধানী বার্লিনে মার্কিন দূত ও ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে বৈঠকের আগে তিনি এই অবস্থানের কথা জানান।
সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ইউক্রেনীয় ও ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার জন্য বার্লিনে পৌঁছান।
বৈঠকের আগে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলেনস্কি বলেন, শুরু থেকেই ইউক্রেনের প্রধান লক্ষ্য ছিল ন্যাটো সদস্যপদ, কারণ এটিই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কিছু অংশীদার এই পথে সমর্থন দেয়নি।
জেলেনস্কির ভাষায়, এই প্রেক্ষাপটে আজ ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ন্যাটোর ৫ নম্বর ধারার মতো সুরক্ষা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর পাশাপাশি কানাডা ও জাপানের মতো মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। আরেকটি রুশ আগ্রাসন প্রতিরোধের একটি বাস্তব সুযোগ হতে পারে।
তিনি বলেন, এ ধরনের নিশ্চয়তা অবশ্যই আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হতে হবে। তিনি এটিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে একটি বড় আপস হিসেবে উল্লেখ করেন।
এই অবস্থান ইউক্রেনের নীতিতে একটি বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরে ন্যাটোতে যোগদানের দাবি জানিয়ে আসছিল, যদিও মস্কো জোটটির সম্প্রসারণকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
তবে, রাশিয়ার ঘোষিত যুদ্ধ লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এই অবস্থান আংশিকভাবে মিললেও ইউক্রেন কোনো ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। জেলেনস্কি বলেন, তিনি একটি মর্যাদাপূর্ণ শান্তি চান এবং দৃঢ় নিশ্চয়তা প্রয়োজন যে, রাশিয়া আর আগ্রাসন চালাবে না।
রোববারের আলোচনা শেষে মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, আলোচনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। জেলেনস্কির উপদেষ্টা দিমিত্রো লিটভিন জানান, কর্মকর্তারা খসড়া নথি পর্যালোচনা করছেন এবং প্রেসিডেন্ট সোমবার এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন। তিনি বলেন, পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আলোচনা হয়েছে এবং সোমবার সকালে তা পুনরায় শুরু হওয়ার কথা।
এদিকে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস বলেন, ট্রাম্প তার দূতদের পাঠানো একটি ভাল লক্ষণ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করার বিষয়ে ইউক্রেনের অতীত অভিজ্ঞতা তিক্ত। ১৯৯৪ সালে সোভিয়েত যুগের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের বিনিময়ে দেওয়া নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ইউক্রেনকে রুশ আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
পিস্টোরিয়াস আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছাড়া কেবল নিরাপত্তা নিশ্চয়তা খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে।
কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও স্থলপথে লড়াই অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক রুশ হামলায় ইউক্রেনের হাজারো মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের অভিযোগ, শীতের মধ্যে বেসামরিক নাগরিকদের তাপ ও পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত করতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিদ্যুৎ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
কৃষ্ণ সাগর অঞ্চলেও উত্তেজনা বেড়েছে। রুশ হামলায় ইউক্রেনীয় বন্দরে তুর্কি মালিকানাধীন খাদ্যবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওডেসায় শস্য সাইলোতে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগান পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, কৃষ্ণ সাগরকে সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা উচিত নয়। তিনি বন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করে সীমিত যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান।







