জুলাই মাসে বিশ্বের মহাসাগরগুলোর গড় তাপমাত্রা রেকর্ড সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হওয়া এল নিনো পরিস্থিতির পাশাপাশি মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এ তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে বলে জানিয়েছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (১০ আগস্ট) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ তথ্য জানিয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপারনিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে বিশ্বের মেরু অঞ্চলের বাইরে অর্থাৎ ৬০ ডিগ্রি উত্তর থেকে ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে গড় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০২৩ সালের ২০ দশমিক ৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আগের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে এ তাপমাত্রা। গত মাসটি বিশ্বজুড়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় উষ্ণতম জুলাইও ছিল। প্রাক-শিল্প যুগের গড় তাপমাত্রার তুলনায় জুলাইয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল।

জুলাইয়ে পশ্চিম ইউরোপেও তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়া অব্যাহত ছিল। জুন ও জুলাই মিলিয়ে পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ছিল ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ দশমিক ৭৯ ডিগ্রি বেশি এবং এ দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানির কিছু অংশ ও যুক্তরাজ্যে অস্বাভাবিক কম বৃষ্টিপাত এবং মাটির আর্দ্রতা দেখা গেছে। দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে সেন, রাইন ও দানিউবসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানির স্তরও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে। এতে পানি সরবরাহ, সেচ, নৌপরিবহন, জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে শুষ্ক আবহাওয়া পশ্চিম ইউরোপে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউরোপীয় আবহাওয়া পূর্বাভাস কেন্দ্রের জলবায়ুবিষয়ক কৌশলগত প্রধান সামান্থা বার্জেস বলেন, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপ ব্যবস্থা তাপ আটকে রেখেছিল এবং শুষ্ক মাটি প্রাকৃতিক শীতলীকরণের ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছিল। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহ ও খরা একে অপরকে আরও তীব্র করে তুলছে।
জুলাইয়ে ইউরোপের আটলান্টিক উপকূল ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরেও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। একই সময়ে ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের বড় অংশে সমুদ্রের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেশি ছিল। প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। আগামী মাসগুলোতে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া ব্যবস্থা হলেও মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার তীব্রতা বাড়াতে পারে।
মহাসাগর পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক। বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত তাপের বড় একটি অংশ মহাসাগর শোষণ করে। কিন্তু সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত উষ্ণ হয়ে উঠলে এর কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণের সক্ষমতা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিভিন্ন প্রজাতি ঠান্ডা পানির সন্ধানে স্থানান্তরিত হওয়ায় খাদ্যশৃঙ্খলও ব্যাহত হতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়ায় যুক্তরাজ্যেও পানি সরবরাহের ওপর চাপ বাড়ছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে প্রায় ১৯০ বছর আগে রেকর্ড শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে শুষ্ক জুলাই পার হয়েছে। ইংল্যান্ডের বড় অংশ ও পুরো ওয়েলসকে ইতোমধ্যে খরাকবলিত এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইংল্যান্ডের আরও এলাকাকে খরাকবলিত ঘোষণা করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে দেশটির পরিবেশ সংস্থা।
মেট অফিসের জলবায়ু তথ্য বিজ্ঞানী মাইক কেনডন বলেন, একসময় যে ধরনের আবহাওয়াকে চরম বলে মনে করা হতো, তা এখন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। তার মতে, বিংশ শতাব্দীর জলবায়ু এখন অতীতের বিষয় হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনো সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়নের প্রধান কারণ মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগের তুলনায় বর্তমানে বিশ্ব গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ।








