নারী টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ-২০২৪ জাঁকজমকপূর্ণভাবে শেষ হল। শুরু হয়েছিল তিন অক্টোবর, শেষ হল ২০ অক্টোবর, নিউজিল্যান্ডের ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে।
এবারের টি-টুয়েন্টি নারী বিশ্বকাপের আয়োজক বাংলাদেশ। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে আয়োজন হয়নি। সেটি না হতে পারার সাথে সাথে অনেককিছুই অনেকের মিস হয়ে গেল। নারী বিশ্বকাপটি অনুষ্ঠিত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে।
এবারের বিশ্বকাপে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ঘটেছে। এক এক করে আসা যাক।
এবারের বিশ্বকাপে দর্শক ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিবার যেটা একেবারেই দেখা যেত না। মেয়েদের খেলা পারতপক্ষে মাঠে এসে দেখতে চায় কমজনই। অথচ এবার একেবারেই উল্টো ঘটনা। গ্যালারিতে এবার উপচে পড়া দর্শক ছিল কানায় কানায়। বিশেষ করে এশিয়ার মেয়েদের খেলা দেখার সময় দর্শকদের চোখে পড়ার মতো আকর্ষণীয় ব্যাপার ছিল।
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এশিয়া কাপজয়ী শ্রীলঙ্কা দল ৪টি ম্যাচের মধ্যে একটিতেও জিততে পারেনি। রানার্সআপ ভারত সেখানে ২টি ম্যাচ জিতলেও শেষপর্যন্ত সেমিতে ওঠার লড়াই থেকে ছিটকে যেতে হয়েছে। হারমানপ্রীত কৌরকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও শেষপর্যন্ত মলিন মুখে ফিরতে হয়েছে নিজ দেশে। এশিয়ার বাকি মেয়েদের চেষ্টারও ত্রুটি ছিল না।
প্রশ্ন জাগে মনে, দেশ বড় নাকি খেলা? পাকিস্তান টিমের অধিনায়ক ফাতেমা সানা জানতে পারেন তার বাবা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন। বাবার চাইতে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ কখনও বড় হতে পারে না। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়েছে। অন্যদিকে এই পাকিস্তানের সাথে খেলার সময় ইনজুরিতে পড়েন অজি অধিনায়ক এলিসা হিলি। তার ছিটকে যাওয়ার কারণেই হয়তো সেমি থেকে ছিটকে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এবারের নারী বিশ্বকাপ আমাদের বেসরকারি চ্যানেলগুলো প্রচার করেছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে গেস্ট হিসেবে যারা এসেছিলেন, তাদেরকে একেবারেই অনভিজ্ঞ বলা চলে। শুধু সুন্দর মুখ, পরিচিত মুখকে গেস্ট হিসেবে এনে ক্রিকেটে প্রতিস্থাপন করতে বসিয়ে দেয়া চ্যানেলগুলোর একেবারেই বোকামি মনে হয়েছে। হাস্যকর বিষয় ছিল, ছেলেদের ক্রিকেট খেলার সময় আমরা যে সকল ছেলে গেস্টকে দেখে থাকি, তারাই মেয়েদের বিশ্বকাপে গেস্ট হিসেবে এসেছেন। প্রশ্ন হল, আমাদের দেশে স্পোর্টস জার্নালিস্ট নারী থেকে শুরু করে নারী ক্রিকেটারদের কি অনেক অভাব ছিল? নাকি টেলিভিশন কর্তারা চাননি যে যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ একটু কথা বলুক।
এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের কথা বলা যাক। এই টিম বিশ্বকাপ খেলতে আসার আগে দশবার টি-টুয়েন্টিতে হেরেছে। রূপকথার গল্পের মতো বিশ্ব ট্রফিটা তারাই জিতে নিল। নিউজিল্যান্ড দলের বিশ্ব ট্রফিটা এবারের প্রাপ্য ছিল। নিউজিল্যান্ড দল জিতে গিয়ে জিতে গেল বিশ্বের সকল নারীরা। খেলা দেখতে বসে নিউজিল্যান্ডের ১৫৮ রান করা দেখেই বুঝেছিলাম এরাই আজকে ট্রফিটা নেবে। শুরুতেই এদের ফোকাস, আত্মবিশ্বাস, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ সবকিছুই বলে দিয়েছে ট্রফিটা আজ আমাদেরই প্রাপ্য, আমরাই নেব। প্রতিটা প্লেয়ার যেভাবে চেঞ্জ করে খেলছিল সবাই যেন মরিয়া কাপের জন্য। ভাবা যায় এই ফাইনাল ম্যাচে বারোটা বাউন্ডারি চার হয়েছে। ব্যাটিংয়ে দুর্দান্ত সুজি বেটস (৩২), অ্যামিলিয়া কের (৪৩), ব্রুক হেলি (৩৮) যেন বিশ্বকাপটা ব্যাটিংয়েই জিতিয়ে দিয়েছেন। অ্যামিলিয়া কের এবং রস্মেরী মায়ের তিনটি করে উইকেট যেন জ্বলজ্বল করে বলছিল আর একটু পরেই কাপটা তোমরা স্পর্শ করবে। এত বড় মাঠে মেয়েদের বেশিরভাগ ক্যাচ আউট হতে দেখা গেছে। মাঠটা যদি ৬৫ ফিটের মধ্যে থাকত, তাহলে টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপটা দারুণ জমতো। তারপরও এই বড় মাঠে এমিলিয়া কের যিনি একইসাথে “প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ” এবং “প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ” হয়েছেন। এই মেয়েরা ২০০৬ সালেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সুজি বেটস, সোফি ডিভাইন এদের কথা কে না জানে। রানের হিসেব করলে তারা চার হাজারের ঘরে অথচ দলীয় কোনো অর্জন ছিল না তাদের। নিউজিল্যান্ড দল আগে দুবার ফাইনাল খেলেছিল এবং দুবারই হেরেছিল। এরপর ১৪ বছর আর কোনো ফাইনাল খেলার সুযোগ হয়নি তাদের। অথচ এই নারী ক্রিকেটে ২০০৬-এর পর থেকে কত ক্রিকেটার চলে গেছেন এবং নতুনরা এসেছেন। অথচ সুজি, সোফি এখনো থেকে গেছেন শেষ স্বাদ পাবার আশায়। সোফিকে দেখছিলাম ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই দুহাত তুলে তালি দিতে। আনন্দঅশ্রু মাখা মুখ সোফির। ক্যামেরা বারবার সোফিকে ধরছিল। সোফির সেই সময়ের অনুভূতি কী ছিল আমি জানি না, তবে সোফি-সুজির সাথে জিতে গিয়েছে বিশ্বের সকল মেয়েরা। সোফি, সুজি একসাথে এতটা বছর। তাইতো ম্যাচ শেষ হতেই সোফি এগিয়ে গিয়েছেন সুজির দিকেই। তাদের আলিঙ্গন যেন হাজারো কষ্ট দুঃখ হতাশার ১৮ বছরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। খুলে দিয়েছে আরও হাজারো দরজা। যেই দরজায় তরুণদের আহ্বানের ডাক। নিউজিল্যান্ডের বাস্তবতা হল ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টি ট্রফির মালিক এই মেয়েরা। কারণ নিউজিল্যান্ডের ছেলেদের বিশ্বজয়ের ট্রফি এখন পর্যন্ত আসেনি।
সাউথ আফ্রিকার কথা একটু হলেও বলতে হয়। একমাত্র ক্যাপ্টেন লোরাকে দেখেছি কতটা আত্মবিশ্বাস ছিল তার ব্যাটিংয়ে, পুরো ম্যাচজুড়ে। টানা দুবার ফাইনালে এসেও হেরে গেল লোরার টিম। এদের কী জানি হয়! বোধহয় টসে জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। আমি জানি না। তবে ব্যাটিংটা লোরার নিউজিল্যান্ডকে দেয়াটা উচিত হয়নি। বোলিংয়ের সময়ই সাউথ আফ্রিকা হেরে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল ব্যাটিংটা কেবল করতে হবে বলে করা।
এবার টি-টুয়েন্টি নারী বিশ্বকাপে চোখে পড়ার মতো বিষয় ছিল আরও অনেক। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল মেয়েদের আম্পায়ারিং। পুরো ম্যাচে আইসিসির প্রত্যেকটা নারী আম্পায়ারকে দেখা গিয়েছে। আইসিসির এটি দারুণ উদ্যোগ বলা চলে। শুধু কী তাই, বিশ্বমঞ্চে ছেলেরা যে পরিমাণ অর্থ পায় মেয়েরাও ঠিক একই অর্থ পেয়েছেন। এমনটাই ঘোষণা দিয়েছে আইসিসি। ফলে এখন আমরা বলতেই পারি আমাদের সামাজিকতার জায়গা, দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা অনেকটাই পাল্টেছে। যেকোনো মেয়েই এখন ক্রিকেট খেলতে আসতে পারেন। ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নিতে পারেন।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







