শীত, গ্রীষ্ম নাকি বর্ষা কোন ঋতু সবচেয়ে বেশি পছন্দ মানুষের?

ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষের পোশাক, খাবার এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরনও। কারও কাছে শীত মানেই কুয়াশামাখা সকাল, পিঠাপুলি আর উৎসবের আমেজ। কারও কাছে বর্ষা মানেই বৃষ্টির শব্দ, ভেজা মাটি আর এক কাপ চা।
আবার গ্রীষ্মের দীর্ঘ দিন, আম-কাঁঠালের মৌসুম ও ছুটির আনন্দও অনেকের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। কিন্তু পছন্দের প্রশ্নে শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষার মধ্যে কোন ঋতু এগিয়ে?
গবেষণা কী বলছে?
মানুষের আবহাওয়াবিষয়ক পছন্দ নিয়ে ২০১৬ সালে হংকং জার্নাল অব পেডিয়াট্রিকস -এ একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। গবেষণাটিতে হংকংয়ের ৩ হাজার ৫৮০ জন কিশোর-কিশোরীর মতামত নেওয়া হয়েছিল। গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল আবহাওয়ার প্রতি তাদের পছন্দ এবং আবহাওয়া কীভাবে মানসিক অবস্থাকে প্রভাবিত করে, তা বোঝা।
গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের কাছে শরতের শুরু থেকে শীতের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সবচেয়ে জনপ্রিয়। অর্থাৎ তুলনামূলক শীতল আবহাওয়ার প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি ছিল। গবেষকদের মতে, আরামদায়ক আবহাওয়া মানুষের পছন্দের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শীত কেন এত জনপ্রিয়?
শীতের আবহাওয়ায় অতিরিক্ত গরমের অস্বস্তি থাকে না। ঘাম, ক্লান্তি ও অতিরিক্ত আর্দ্রতার সমস্যাও তুলনামূলক কম অনুভূত হয়। এ সময় অনেকেই বাইরে ঘুরতে, ভ্রমণ করতে কিংবা বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতেও শীতের জনপ্রিয়তার প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির প্রতিবেদনে বলা হয়, শীত মৌসুমে রাঙামাটিতে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলোতেও ছিল পর্যটকদের ভিড়।
তবে শীত সবার কাছে সমান আনন্দের নয়। নিম্ন তাপমাত্রা, কুয়াশা ও শীতজনিত অসুস্থতা অনেকের দৈনন্দিন জীবন কঠিন করে তুলতে পারে।
বর্ষা কেন মানুষের মন ভালো করে?
বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ধরনের আবেগ ও নস্টালজিয়া। বৃষ্টির শব্দ, মাটির সোঁদা গন্ধ, জানালার পাশে বসে চা পান কিংবা বৃষ্টিভেজা প্রকৃতি অনেকের কাছে মানসিক প্রশান্তির উৎস।
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করা মানুষের মানসিক সুস্থতায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বর্ষার অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, যানজট ও চলাচলের অসুবিধা অনেকের কাছে এই ঋতুর আনন্দ কমিয়ে দেয়।
গ্রীষ্মেরও রয়েছে আলাদা আকর্ষণ
গ্রীষ্ম মানেই শুধু তীব্র রোদ কিংবা গরমের অস্বস্তি নয়। এ সময় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ নানা মৌসুমি ফল পাওয়া যায়। শিক্ষার্থীদের গ্রীষ্মকালীন ছুটি, দীর্ঘ দিনের আলো এবং বিভিন্ন আনন্দ আয়োজনও এ ঋতুর বিশেষ আকর্ষণ।
তবে অতিরিক্ত তাপমাত্রা মানুষের স্বাভাবিক কাজকর্মে প্রভাব ফেলতে পারে। গরমে ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও অস্বস্তির কারণে অনেকেই গ্রীষ্মকে পছন্দের তালিকায় পিছিয়ে রাখেন।
বাংলাদেশের মানুষের পছন্দ কোনটি?
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে কোন ঋতু সবচেয়ে জনপ্রিয়, তা নির্দিষ্ট করে বলার মতো জাতীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিত্বশীল জরিপের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে রাঙামাটির ২০০ পর্যটককে নিয়ে করা একটি গবেষণায় ৪৫ শতাংশ উত্তরদাতা শীতকালে ভ্রমণ করতে পছন্দ করেছেন। একই গবেষণায় বর্ষাকালকে সবচেয়ে কম পছন্দের ভ্রমণ মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে মনে রাখতে হবে, এটি সাধারণ মানুষের ঋতু-পছন্দ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকার ভ্রমণকারীদের পছন্দের চিত্র।
আসলে কোন ঋতু সবচেয়ে ভালো, তার কোনো সর্বজনীন উত্তর নেই। ব্যক্তির বয়স, অভ্যাস, বসবাসের পরিবেশ, কাজের ধরন এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি ঋতু পছন্দের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। কেউ শীতের কুয়াশায় খুঁজে পান আনন্দ, কেউ বর্ষার বৃষ্টিতে, আবার কেউ গ্রীষ্মের রোদে। ঋতুর সৌন্দর্য হয়তো সেখানেই—প্রত্যেকের কাছে তার প্রিয় ঋতুর গল্প আলাদা।






