‘সুপার এল নিনোর’ বছর হতে যাচ্ছে ২০২৬। এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়া ও জলবায়ুর তারতম্যের ঘটনা বাড়বে? আর চলতি গ্রীষ্মেই তুমুল প্রভাব নিয়ে জাকিয়ে বসবে সুপার এল নিনোর প্রভাব।
এবছর ‘এল নিনো’ অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ‘সুপার এল নিনো’ হতে পারে বলে এই আশঙ্কা করে ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) পূর্বাভাস দিয়েছে। পূর্বাভাস বলা হয়েছে, ‘এল নিনো তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ, এবং এর শক্তিশালী মানে ‘সুপার এল নিনো হয়ে ওঠার সম্ভাবনা চার ভাগের এক ভাগ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব আরো আরো ভয়াবহ হলে আগামী বছর বিশ্বের তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড ছুঁতে পারে। একই সঙ্গে ভয়াবহ ঝড়, খরা ও বন্যার মতো দুর্যোগও বাড়তে পারে।
‘ওয়াল্ড মেট্রোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন-‘ডব্লিুওএমও’ বা ‘বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা’ ছাড়াও ‘এশিয়া প্যাসিফিক ক্লাইমেট সেন্টার-এপিসিসি’ এবং ন্যাশনাল ওসেনিক এটমোসফেরিক এডমেনিস্ট্রেশেনসহ বৈশ্বিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘এল নিনোর’ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও এর মোকাবেলায় করণীয় নিয়ে কাজ করছেন।
‘এল নিনো ঘিরে বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতির বিরুপ প্রভাব বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি কতটা রুদ্ধমূর্তি ধারণ করবে সেই বিষয়টিসহ ‘এল নিনো’র ভয়াল রুপ ‘সুপার এল নিনো নিয়েই আজকের এক্সপ্লেনার।
শুরুতেই আলোচনা ‘এল নিনো’ আসলে কী?
প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশে সমুদ্রের উপরিভাগের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ হয়ে উঠলে তাকে ‘এল নিনো’ বলা হয়। এই অবস্থায় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকে। এই উষ্ণতা বিশ্বের আবহাওয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। মার্কিন জাতীয় আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই অবস্থা সাধারণত উত্তর গোলার্ধের বসন্তে শুরু হয় এবং তিন থেকে সাত বছর পরপর বদলায়।
বৈশ্বিক আবহাওয়া বিশ্লেষন অনুযায়ী ‘এল নিনোর’ প্রভাবে সমুদ্রে সঞ্চিত তাপ বায়ুমণ্ডলে নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক গড় ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। বৈশ্বিক ও দেশীয় আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চলমান উষ্ণায়নের সাথে মিলিত হলে, একটি শক্তিশালী এল নিনো ২০২৬ বা ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
এবারের ‘এল নিনো’ কতটা শক্তিশালী হলে ‘সুপার এল নিনো’র রুপ পাবে?
মার্কিন ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার জানিয়েছে, এই গ্রীষ্মে ‘এল নিনো’ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ। ‘সুপার এল নিনো’ বলতে বোঝানো হয় যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমপক্ষে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়।
১৯৫০ সালের পর থেকে এটি মাত্র কয়েকবার ঘটেছে। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক আবহাওয়া সংশ্লিষ্ঠ ও বিশেষজ্ঞরা ‘সুপার এল নিনো’ নিয়ে নানান আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। তাদের একজন আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. পল রাউন্ডি এ সপ্তাহে লিখেছেন, ‘১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র বাস্তব সম্ভাবনা আছে।’ মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ড.অ্যান্ডি হেজেলটনও আশঙ্কা করে বলেছেন, ‘সব মডেল ও পর্যবেক্ষণ একই দিকে ইঙ্গিত করছে–এটি হবে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘এল নিনো’, যা এ বছর বিশ্বের জলবায়ুতে বড় প্রভাব ফেলবে।’
বৈশ্বিকভাবে খ্যাতিম্যান জলবায়ু বিজ্ঞানী টম ডি লিবার্টো অবশ্য বলেছেন, ‘এল নিনো’ যে সুপার এল নিনো’ হবে এটি ‘নিশ্চিত নয়’, তবে ‘এল নিনোর’ জন্য দরকারি সব উপাদান এখন আছে। তিনি জানান, ‘ঝুঁকি এতটাই বেশি যে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া দরকার।’
এখন প্রশ্ন হলো ‘এল নিনো’ যদি সর্বকালের রেকর্ড ভেঙ্গে ভয়ঙ্কর রুপে প্রভাব বাড়ায় মানে ‘সুপার এল নিনোতে’ রুপান্তর হয় তবে এর বৈশ্বিকভাবে সব অঞ্চলেই সমান প্রভাব ফেলবে? নাকি অঞ্চল বিশেষে কম বা বেশি হতে পারে? এক্ষেত্রে বলা যায় যে, ‘এল নিনো’ বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে। যেমন, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল, ভারত এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে খরা ও তীব্র গরম দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আছে। অ্যামাজনের বনাঞ্চলেও এর বিরুপ প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে এর উল্টো প্রভাব পড়বে কিছু জায়গায়। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ এবং দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ায় ভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এখন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো “এল নিনো’ যদি তার সবোর্চ্চ বিধ্বংসী মাত্রা নিয়েই আর্বিভূত হয় তবে এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ দেশ ভারতে প্রভাব ফেলবে সেই পূর্বাভাস বা আশঙ্কা আছে। এক্ষেত্রে আর ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে? এই প্রসঙ্গে বলা যায়: বাংলাদেশে এমনিতেই উষ্ণতম মাস ‘এপ্রিল’। চলতি গ্রীস্মে উষ্ণতম এপ্রিল আরো উষ্ণ হয়ে তুমুল গরমে জনজীবন দুর্বিসহ করে তুলতে পারে।
ঢাকায় আবহাওয়া অধিদপ্তরের জৈষ্ঠ্য আবহাওয়াবিদ ডক্টর আবুল কালাম মল্লিক আমাকে জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে দুই দফায় মৃদ্যু থেকে মাঝারি মাত্রায় তাপপ্রবাহে আক্রান্ত হয়েছিল দেশের রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চল। সিনিয়র এই আবহাওয়াবিদ ডক্টর মল্লিক বলছেন, এমনিতেই বছরের উষ্ণতম মাস এপ্রিলের গড় তাপমাত্রা ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে গত ১৫ এপ্রিল রাজশাহীতে ৩৯ দশমিক দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। যা চলতি মৌসুমের এখনো পর্যন্ত সবোর্চ্চ তাপমাত্রা।
তিনি বলছেন, চলতি মাসের শুরুতে ২ এপ্রিল থেকে মৃদ্যু মাত্রার তাপপ্রবাহের কারনে গরমের তীব্রতা অনুভূব করেছে রাজশাহী ও খুলনার বৃহত্তর অঞ্চলের জনমানুষ। দ্বিতীয় পর্যায়ে ১২ এপ্রিল থেকে মৃদ্যু থেকে মাঝারি মানের তাপপ্রবাহে আক্রান্ত হয় রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। তবে ২০ এপ্রিল থেকে তাপ প্রবাহের ব্যাপ্তি অঞ্চল আরো বাড়বে। তখন “কিন্তু রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা কখনও কখনও ৪২ ডিগ্রি পর্যন্তও উঠতে পারে। তিনি ২০২৪ এর ১লা এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত টানা তাপপ্রবাহের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। পাশাপাশি আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস অনুযায়ী এমাসেই ১ থেকে ৩টি তীব্র মাত্রার কালবৈশাখি ও স্থানীয়ভাবে বর্জঝড়ের কারণে সিলেটসহ কিছু অঞ্চলে গরম পরিস্থিতি বা তাপপ্রবাহের বিরুপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশে ‘সুপার এল নিলোর’ প্রভাব?
‘এল নিনো’ ‘সুপার এল নিনো’ হয়ে আত্মপ্রকাশ করলে কতটা উত্তপ্ত হবে এবছরের গরমকাল? এমন প্রশ্ন ছিল বৈশ্বিক আবহাওয়াবিশেষজ্ঞের কাছে। এর উত্তরে চীনের ইউনান ইউনিভার্সিটির লিডিং সায়েন্টিস্ট ড. মোহন কুমার দাস বলেছেন, ‘এল নিনোর’ বৈশ্বিক প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত থাকবে না। ‘সুপার এল নিনোর’ প্রভাবে তাপপ্রবাহ বাড়বে।
সময়মত না হয়ে বর্ষার আগমন ঘটতে পারে দেরিতে। আবার বর্ষাকাল দীর্ঘ ও প্রলম্বিতও হতে পারে। আবার স্বল্প সময়েই হতে পারে ভারী বৃষ্টিপাতের ঘটনাও। এর প্রভাবে ভূমিধ্বসের মত ঘটনা বাড়বে বলেও আশঙ্কা ড. মোহন কুমার দাসের।







