বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস চার বছরেরও বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করার পর আগামী ৩০ জুন পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছেন।
গত মঙ্গলবার দায়িত্ব শেষ হওয়ার প্রায় এক বছর আগেই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন তিনি ।
২০১৯ সালের এপ্রিলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে’র মনোনীত ডেভিড ম্যালপাসকে বিশ্বব্যাংকের ১৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পরের পাঁচ বছরের জন্য তিনি এ দায়িত্ব পান।
পদত্যাগের কারণ নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও এক বিবৃতিতে ম্যালপাস বলেন: অনেক চিন্তার পরে নতুন চ্যালঞ্জ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য এখন নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষা করছি।
ম্যালপাস বলেন, অনেক প্রতিভাবান এবং ব্যতিক্রমী মানুষের সাথে বিশ্বের প্রধান উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করাটা সম্মানের বিষয়। গত চার বছর আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অর্থবহ ছিল। অনেক অগ্রগতি এবং অনেক চিন্তাভাবনার পরে, আমি নতুন চ্যালেঞ্জগুলি অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময়ে আমাদের ক্রিয়াকলাপগুলির কার্যকারিতা জোরদার করতে প্রতিদিন কাজ করা আমাদের কর্মী এবং পরিচালনা পর্ষদেকে ধন্যবাদ জানাতে চাই।
ধারণা করা হচ্ছে, মানব সৃষ্ট কার্বন নির্গমন হওয়ার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা জড়িত বিষয়ে একমত ছিলেন না ম্যালপাস। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে হোয়াইট হাউজের সঙ্গে টানাপোড়েন চলছিল তার। আর একারণেই হয়ত পদত্যাগের কথা জানান তিনি। ম্যালপাস জলবায়ু পরিবর্তনসহ বৈশ্বিক অন্যান্য ইস্যুতে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বেশ চাপে ছিলেন। এমনকি বেশ কয়েকবার তাকে পদত্যাগের দাবির মুখেও পড়তে হয়।
গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি ঘটনার পর ম্যালপাসের পদত্যাগের আহ্বান জোরদার হয়, যখন নিউইয়র্ক টাইমসের একজন সাংবাদিক তাকে ‘মানবসৃষ্ট কার্বন নির্গমন গ্রহটিকে উষ্ণ করছে’ নিয়ে তার মতামত জানতে চান এবং তিনি একে অস্বীকার করেন। যদিও পরে তিনি তার অবস্থান স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন এবং বলেন যে তিনি জলবায়ু বিরুদ্ধে নন। তিনি তার শব্দ চয়নের জন্য অনুতপ্তের কথাও জানান।
ডেভিড ম্যালপাসের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত উন্নয়নশীল দেশ, দাতা, বিশেষজ্ঞ এবং প্রচারকদের আনন্দিত করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ম্যালপাসের পদত্যাগকে বুধবার সন্ধ্যায় জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং প্রচারণাকারীরা স্বস্তি ও আনন্দের সাথে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি ক্ষতিগ্রস্থ রাষ্ট্রগুলোকে অর্থায়নের জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করবে। তাদের দাবি জলবায়ু রোধে বিশ্বব্যাংকের অনুদান প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
এবিষয়ে ‘ইউএস ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিলে’র জলবায়ু বিষয়ক পরিচালক ‘জেক স্মিট’ বলেছেন, ম্যালপাসের প্রস্থান বিশ্বব্যাংককে আঘাত করবে এবং অবশেষে জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে উদ্ভুদ্ধ করবে। নতুন নেতৃত্বের সাথে বিশ্বব্যাংক এখন দ্রুত বিকশিত হবে।
এদিকে ট্রেজারি সেক্রেটারি ‘জ্যানেট ইয়েলেন’ বুধবার ম্যালপাসকে তার কাজের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছেন, রাশিয়ার অবৈধ এবং অপ্রীতিকর আক্রমণের মুখে ইউক্রেনের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থন, আফগান জনগণকে সহায়তা করার জন্য তার কাজ এবং প্রতিশ্রুতি থেকে বিশ্ব উপকৃত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, ম্যালপাসের মেয়াদকালে তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন, জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং সরকারি ঋণের বোঝা কমানোর জন্য শক্তিশালী নীতির খোঁজে মনোনিবেশ করেছিলেন। গত চার বছরে ব্যাংক বিশ্বব্যাপী সংকটে দ্রুত সাড়া দিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী, ইউক্রেনে যুদ্ধ, তীক্ষ্ণ বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিক্রিয়ায় রেকর্ড ৪৪০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে।
ম্যালপাসের গ্রহণ করা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলো হল কোভিড-১৯ মহামারীর প্রতিক্রিয়া হিসাবে ১৫৭ বিলিয়ন ডলার এবং ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ১৭০ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন বাস্তবায়িত। ১০০ টিরও বেশি দেশে জরুরি স্বাস্থ্য এবং ভ্যাকসিন অপারেশন সরবরাহ করেছে। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির সাথে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যকে আরও ভালোভাবে সংহত করতে জলবায়ু পরিবর্তন কর্মপরিকল্পনা চালু করা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর খাদ্য, সার এবং জ্বালানী সংকট মোকাবেলায় প্রকল্পগুলোতে ৩০ বিলিয়ন ডলার নিশ্চিত করা। ভঙ্গুর এবং সংঘাত-আক্রান্ত অঞ্চলের জন্য বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুত এবং পুষ্টির জন্য অর্থায়ন এবং কর্মীদের সংখ্যা বৃদ্ধি অন্যতম।
আগামী ৩০ জুনের মধ্যে ঘোষণা করা হবে নতুন প্রেসিডেন্টের নাম। এখন দেখার বিষয়, জলবায়ু সংকটের কারণে সভ্যতা-হুমকিপূর্ণ বিপদ এবং সৃজনশীলভাবে সাড়া দেওয়ার জন্য নতুন প্রধান কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।








