বাংলাদেশে শিশুদের খাদ্যাভ্যাস দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় শিশুর খাবার বলতে বোঝানো হতো মায়ের হাতে তৈরি ভাত, ডাল, শাকসবজি, ফল কিংবা ঘরে বানানো পুষ্টিকর খাবার।
এখন সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে প্যাকেটজাত স্ন্যাকস, রঙিন পানীয়, অতিরিক্ত চিনি ও লবণসমৃদ্ধ ফাস্টফুড, কৃত্রিম ফ্লেভারযুক্ত খাবার এবং বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার।
বাজারে শিশুদের লক্ষ্য করে যেভাবে আকর্ষণীয় মোড়কে, কার্টুন চরিত্র ব্যবহার করে কিংবা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে খাদ্যপণ্য বিক্রি করা হচ্ছে, তা শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রবণতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, বুদ্ধিবিকাশ এবং সামগ্রিক মানবসম্পদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। তাই শিশু খাদ্যে কার্যকর নজরদারি এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক দায়িত্ব।
দুই. শিশুদের শরীর ও মস্তিষ্ক বিকাশের জন্য সুষম ও নিরাপদ খাদ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর থেকে কৈশোর পর্যন্ত সময়টুকু মানুষের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির সবচেয়ে সংবেদনশীল ধাপ। এই সময়ে পুষ্টিহীনতা যেমন শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত চিনি, ট্রান্সফ্যাট, কেমিক্যাল বা ক্ষতিকর উপাদানসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘমেয়াদে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা এবং আচরণগত জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। অথচ অনেক অভিভাবকই বুঝতে পারেন না কোন খাবারটি শিশুর জন্য নিরাপদ আর কোনটি ক্ষতিকর। কারণ বাজারজাত অনেক পণ্যের গায়ে ‘হেলদি’, ‘এনার্জি’, ‘গ্রোথ’, ‘ভিটামিন সমৃদ্ধ’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে সেগুলোর পুষ্টিমান প্রশ্নবিদ্ধ।
তিন. বাংলাদেশে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যের সমস্যা নতুন নয়। তবে শিশু খাদ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক। মাঝে মধ্যেই খবর আসে শিশুদের দুধ, চকোলেট, জুস, চিপস কিংবা বেকারি পণ্যে অনুমোদনহীন রং, অতিরিক্ত চিনি, ক্ষতিকর কেমিক্যাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ উপাদান ব্যবহারের। এসব খাদ্য শিশুর শরীরে তাৎক্ষণিক অসুস্থতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে। অনেক সময় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লাভের আশায় মান নিয়ন্ত্রণে অবহেলা করে, আর দুর্বল তদারকির কারণে তারা সহজেই পার পেয়ে যায়। ফলে শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ে।
চার. শিশু খাদ্যে নজরদারি জরুরি হওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন। টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা মোবাইল গেমের মাধ্যমে শিশুদের লক্ষ্য করে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের খাদ্যের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, একটি নির্দিষ্ট পানীয় খেলে শিশু বেশি শক্তিশালী হবে, একটি বিশেষ চকলেট খেলে মেধা বাড়বে কিংবা কোনো ফাস্টফুড খেলেই আনন্দপূর্ণ জীবন পাওয়া যাবে। শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই এসব আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় প্রভাবিত হয়। অনেক সময় অভিভাবকেরাও বিজ্ঞাপনের ভাষা দেখে বিভ্রান্ত হন। অথচ এসব খাবারের অধিকাংশই উচ্চ ক্যালরি, নিম্ন পুষ্টিমানসম্পন্ন। উন্নত দেশগুলোতে শিশুদের লক্ষ্য করে জাঙ্কফুডের বিজ্ঞাপনের ওপর নানা বিধিনিষেধ থাকলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে কার্যকর নীতিমালা এখনও দুর্বল।
পাঁচ. বিদ্যালয়ের আশপাশের খাদ্য পরিবেশও একটি বড় সমস্যা। অধিকাংশ স্কুলের সামনে যেসব খাবার বিক্রি হয়, তার মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে খুব কমই নজরদারি থাকে। খোলা খাবার, অতিরিক্ত রং মেশানো আইসক্রিম, অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুড কিংবা নিম্নমানের পানীয় সহজেই শিশুদের নাগালে পৌঁছে যায়। শিশুরা স্বাদ ও আকর্ষণের কারণে এসব খাবারের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। ফলে ধীরে ধীরে তাদের স্বাভাবিক ও পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যায়। রাষ্ট্র যদি স্কুলভিত্তিক খাদ্যনীতিকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন না করে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়বে।
ছয়. শুধু অপুষ্টি নয়, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে স্থূলতার হারও বাড়ছে। শহরাঞ্চলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিসের পূর্বলক্ষণ এবং অলস জীবনযাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের সহজলভ্যতা। একদিকে কিছু শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে কিছু শিশু অতিরিক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন ‘ডাবল বার্ডেন অব ম্যালনিউট্রিশন’-এর মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় শিশু খাদ্যে বৈজ্ঞানিক নজরদারি অত্যন্ত প্রয়োজন।
সাত. বাংলাদেশে শিশু খাদ্যের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো গ্রামাঞ্চলে নকল ও ভেজাল খাদ্যের বিস্তার। বাস্তবতা হচ্ছে, শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি নকল, নিম্নমানের ও ক্ষতিকর খাদ্যপণ্য ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামীণ বাজারগুলোতে। নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়ক হুবহু নকল করে বাজারে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল বিস্কুট, চকলেট, জুস, চিপস, আইসক্রিম ও বিভিন্ন ধরনের শিশুখাদ্য। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল ও নকল পণ্য আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। তারা শিশুদের আকৃষ্ট করতে উজ্জ্বল রং, কার্টুন ছবি ও আকর্ষণীয় প্যাকেট ব্যবহার করছে, অথচ ভেতরে থাকছে নিম্নমানের উপাদান ও ক্ষতিকর রাসায়নিক।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু অসাধু উৎপাদক খাবারে এমন রং ব্যবহার করছে যা আসলে কাপড় বা শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য তৈরি। কাপড়ে ব্যবহৃত কেমিক্যাল রং মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে আইসক্রিম, চানাচুর, মিষ্টি, জেলি কিংবা বিভিন্ন রঙিন খাবার। শিশুরা সেগুলো আনন্দের সঙ্গে খাচ্ছে, কিন্তু ধীরে ধীরে এসব বিষাক্ত উপাদান তাদের শরীরে মারাত্মক ক্ষতি করছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব রাসায়নিক লিভার, কিডনি, হজমতন্ত্র এবং মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অথচ গ্রামের সাধারণ মা-বাবারা অধিকাংশ সময় বুঝতেই পারেন না যে তারা সন্তানের হাতে কী তুলে দিচ্ছেন। গ্রামীণ এলাকার অনেক পরিবার সীমিত আয় ও কম সচেতনতার কারণে কম দামের খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দোকানদারদের কথায় বিশ্বাস করে তারা শিশুদের জন্য রঙিন পানীয়, চকলেট বা প্যাকেটজাত খাবার কিনে দেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সেসব পণ্য হয় নকল, ভেজাল, এমনকি মেয়াদোত্তীর্ণ।
দুঃখজনক হলেও সত্য, একজন মা-বাবা ভালোবাসা থেকেই সন্তানের জন্য খাবার কিনছেন, কিন্তু অজ্ঞাতসারে সেই খাবারই সন্তানের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে। তাই শিশু খাদ্যে নজরদারি শুধু শহরে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; গ্রামের হাট-বাজার, ছোট দোকান এবং প্রত্যন্ত এলাকার সরবরাহব্যবস্থাকেও কঠোর তদারকির আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ জনগণের মধ্যে খাদ্য সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
আট. কার্যকর নজরদারির জন্য শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি। নিয়মিত বাজার তদারকি, ল্যাব পরীক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন কারখানার মান নিয়ন্ত্রণ এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে শিশু খাদ্যের লেবেলিং বাধ্যতামূলক ও সহজবোধ্য করতে হবে, যাতে অভিভাবকেরা সহজেই বুঝতে পারেন খাদ্যে কী পরিমাণ চিনি, লবণ, ফ্যাট বা কৃত্রিম উপাদান রয়েছে।
ডিজিটাল যুগে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও শিশু খাদ্যের বিপণন বাড়ছে। অনেক পণ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যকর বলে প্রচার করা হলেও বাস্তবে সেগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাই অনলাইন বিজ্ঞাপনেও নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। শিশুদের মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করা নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি দায়িত্বশীল সমাজ কখনোই মুনাফার জন্য শিশুদের স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে না।
এখানে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর খাদ্যাভ্যাস গড়ে ওঠে পরিবার থেকেই। অভিভাবকেরা যদি নিজেরাই অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় গ্রহণ করেন, তাহলে শিশুরাও সেই অভ্যাস অনুসরণ করবে। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই স্বাস্থ্যকর খাদ্যের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে হবে। বিদ্যালয়ে পুষ্টি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং শিশুদের খাদ্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলাও জরুরি। কারণ সচেতনতা ছাড়া শুধু আইন দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
উন্নত বিশ্বে এখন ‘চাইল্ড ফুড পলিসি’ বা শিশু খাদ্যনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু। অনেক দেশ স্কুলে জাঙ্কফুড বিক্রি সীমিত করেছে, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের ওপর কর আরোপ করেছে এবং শিশুদের উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশেও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ সুস্থ শিশু মানেই সুস্থ জাতি, আর অসুস্থ শিশু মানেই ভবিষ্যতের জন্য একটি দুর্বল সমাজ।
শিশুরা নিজেরা খাদ্য নির্বাচন সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা পরিবার, বাজার ও বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল। তাই তাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশু খাদ্যে নজরদারি মানে শুধু খাদ্যের মান পরীক্ষা নয়; এটি একটি প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগ। আজ আমরা যদি শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে আগামী দিনে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং মানবসম্পদ—সবকিছুকেই তার মূল্য দিতে হবে। তাই এখনই সময় শিশু খাদ্যে কঠোর নজরদারি, কার্যকর নীতি এবং সামাজিক সচেতনতা নিশ্চিত করার।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







