৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে গতকাল শুক্রবার (২১ নভেম্বর) কেঁপে উঠেছিল সারাদেশ, যার প্রভাব রাজধানী ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় বেশি দেখা গেছে।
এই ভূমিকম্পের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শনিবার (২২ নভেম্বর) সকালে আবারও ৩ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। একই দিনে সন্ধ্যা ৬টা ৬ মিনিটে আরও একটি ৩ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এখন প্রশ্ন আসতে পারে ঠিক কেন হচ্ছে এই ভূমিকম্পগুলো? কেনই বা বাংলাদেশে হচ্ছে?
ভূমিকম্প কী এবং কেন হয়?
পৃথিবীর ভেতরের শক্তিশালী কম্পন হঠাৎ অনুভূত হওয়াকে ভূমিকম্প বলা হয়। পৃথিবীর দুটি ব্লক যখন হঠাৎ একে অপরের পাশ দিয়ে যায়, তখন ভূমিকম্প অনুভূত হয়। যে তল বরাবর এই যাওয়ার ঘটনা ঘটে, তা চ্যুতিতল বা ফল্ট প্লেন নামে পরিচিত। আর পৃথিবীপৃষ্ঠের নিচে যে স্থান থেকে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, সেটিকে বলা হয় হাইপোসেন্টার বা ভূমিকম্পের কেন্দ্র। ভূমিকম্পের কেন্দ্রের ঠিক ওপরে থাকা স্থানটিকে এপিসেন্টার বা উপকেন্দ্র বলা হয়।
ভূমিকম্প কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে। ভূমিকম্পের ফলে মাটি কেঁপে ওঠে, ভবন দুলে যায়, ফাটল দেখা দেয়, এমনকি বড় ধরনের ক্ষতিও হতে পারে।

ভূমিকম্পের মূল কারণগুলোর মধ্যে:
১. টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া
পৃথিবীর বাইরের অংশটি কয়েকটি বড় বড় প্লেটে ভাগ করা। এই প্লেটগুলো সব সময় নড়াচড়া করে।
যখন দুইটি প্লেট একে অপরের উপরে উঠে যায়,নিচে চলে যায়,বা ধাক্কা খায়, তখন তাদের মাঝে প্রচুর শক্তি সঞ্চিত হয়। এই শক্তি হঠাৎ মুক্ত হলে মাটিতে কম্পন সৃষ্টি হয় এটাই ভূমিকম্প। এটাই পৃথিবীর সর্বাধিক সাধারণ এবং শক্তিশালী ভূমিকম্পের কারণ।
২. আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত
আগ্নেয়গিরির ভেতরে ম্যাগমা চাপ তৈরি করে বাইরে বের হতে চাইলে ভূগর্ভে কম্পন সৃষ্টি হয়। এ ধরনের ভূমিকম্পকে ভলক্যানিক আর্থকোয়েক বলা হয়।
৩. ভূগর্ভের ফাটল বা ফল্ট লাইনে চাপ বৃদ্ধি
প্লেটগুলোর সংযোগস্থলে বড় বড় ফাটল (ফল্ট লাইন) থাকে। এসব স্থানে চাপ জমে হঠাৎ ভেঙে গেলে ভূমিকম্প হয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সক্রিয় ফল্ট লাইন হলো, ইন্ডিয়ান প্লেট–ইউরেশিয়ান প্লেট সীমান্ত,দাউকি ফল্ট,শিলং প্লাটু অঞ্চল,আরাকান ফল্ট।
৪. মানবসৃষ্ট কিছু কারণ
অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, বড় বাঁধে পানির চাপ, খনি বা ড্রিলিং
এসবও খুব ক্ষুদ্র ভূমিকম্প ঘটাতে পারে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প প্রবণ হওয়ার মূল কারণ
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভূমিকম্পের মূল কারণ। দেশের উপর বিভিন্ন টেকটোনিক প্লেটের চাপ রয়েছে।
প্লেট টেকটোনিক অবস্থান:
বাংলাদেশ ভারতের, মায়ানমারের এবং এশিয়ার ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। বিশেষ করে ভারতীয় প্লেটের উত্তরের দিকে চাপ এবং মায়ানমার স্যান্ডউইচ প্লেটের আন্দোলন দেশের ভূগর্ভে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।

হিমালয় ও আন্ধামান-নিকোবর প্রভাবে চাপ:
হিমালয়ের ক্রিয়াশীল বা সক্রিয় সিলিগ্যাসিয়াস অঞ্চলের কারণে উত্তরে প্লেটগুলি চাপ সৃষ্টি করে। মায়ানমার আর্কের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে পূর্বে এবং দক্ষিণ-পূর্বে সেল্ফ-প্রেসার তৈরি হয়।
সক্রিয় ভলকানো এবং ফল্ড মাউন্টেন রিজ:
দেশের চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের সক্রিয় ফল্ড মাউন্টেন এবং ভূ-গর্ভস্থ ফল্ট লাইন যেমন: ময়মনসিংহ ফল্ট, মেঘনা ফল্ট ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ায়।
ভূগর্ভস্থ ফল্ট লাইন:
দেশের বিভিন্ন ফল্ট লাইন যেমন হাফিজপুর, তিস্তা, মেঘনা ফল্ট দেশের মধ্য দিয়ে যায়। এই ফল্ট লাইন-এ চাপ জমা হলে হঠাৎ ভূমিকম্প ঘটে।
এশিয়া মহাদেশ যেসব দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি
এই দেশগুলো মূলত প্যাসিফিক রিং অফ ফায়ার-এর সাথে সংযুক্ত দেশ, যেখানে টেকটোনিক প্লেটগুলোর সংঘর্ষ বেশি হয়।
ইন্দোনেশিয়া – বিশেষ করে জাভা, সুমাত্রা, সুলাওয়েসি।
জাপান – টোকিও, কিয়োটো, ওসাকা অঞ্চলে বিশেষ ঝুঁকি।
নেপাল – হিমালয়ের পূর্ব ও মধ্যাঞ্চল।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তান – হিন্দু কুশ এবং কারাকোরাম অঞ্চলে।
ফিলিপাইনস – প্যাসিফিক প্লেট ও ফিলিপাইনস প্লেট সংঘর্ষের কারণে।
ভারতের উত্তর-পূর্ব ও হিমালয় অঞ্চলের কিছু অংশ – উত্তরাখণ্ড, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ।
ইরান ও তুর্কমেনিস্তান সীমান্ত অঞ্চল – প্লেট টেকটোনিক সংকটের কারণে।
ভূমিকম্পে তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো
এই দেশগুলোর অবস্থান মূলত স্থিতিশীল প্লেটের মধ্যে অবস্থিত, যেখানে ভূমিকম্পের সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশ – যদিও উত্তরাঞ্চল কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ, দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল তুলনামূলক নিরাপদ।
সৌদি আরব – প্লেট সীমান্ত থেকে দূরে।
মঙ্গোলিয়া – বেশিরভাগ অঞ্চল স্থিতিশীল।
কুয়েত, ওমান, কাতার – টেকটোনিক সক্রিয় নয়।
পূর্ব ও মধ্য চীন – কিছু এলাকায় ঝুঁকি আছে, কিন্তু পশ্চিম চীন ও সমতল অংশ তুলনামূলক নিরাপদ।
বাংলাদেশ ভূ-তাত্ত্বিক দিক থেকে উচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে, বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশ।
বাংলাদেশ ভারতের, চীনের এবং মায়ানমারের সঙ্গে সংযুক্ত টেকটোনিক প্লেটের সংযোগ অঞ্চলে অবস্থিত। বিশেষ করে আলপাইড সিস্টেম এবং হিমালয় অঞ্চলের প্লেট রূপান্তর বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি বাড়ায়। বৃহত্তর প্রাকৃতিক ঝুঁকি রয়েছে সিলেট, চট্টগ্রাম, মেঘনা-গঙ্গা-যমুনা তীরবর্তী অঞ্চলে।
পূর্বের বড় ভূমিকম্প
১৯৫০ সালে আসাম-সিলেট ভূমিকম্প (ম্যাগনিচিউড ৮ দশমিক ৬ মাত্রা) সিলেট অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
১৯৯৭ সালে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বর্তমান ঝুঁকি
ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ম্যাগনিচিউড ৭ বা তার বেশি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকার মতো বড় শহর ভূমিকম্প-প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায়, যদি বড় ভূমিকম্প আসে, মানুষের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। সতর্কতা, নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং ইঞ্জিনিয়ারিং মানদণ্ড অনুযায়ী নির্মাণ অপরিহার্য।








