মতামত

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে পাকিস্তানি সিরিয়াল?

কেন জনপ্রিয় হচ্ছে পাকিস্তানি সিরিয়াল?

ছবি: সংগৃহীত

প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আত্মসম্মান আর সম্পর্কের টানাপোড়েন পাকিস্তানি সিরিয়ালের গল্পে উঠে আসে পরিচিত জীবনের নানা দিক। শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতেও এসব সিরিয়ালের রয়েছে বড় দর্শকগোষ্ঠী। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও বাড়ছে আগ্রহ। কিন্তু কী আছে পাকিস্তানি নাটকে, যা দুই দেশের দর্শককে আকৃষ্ট করছে?

একসময় পাকিস্তানি সিরিয়াল দেখার জন্য ভারতীয় দর্শকদের নির্ভর করতে হতো ভিডিও ক্যাসেট, কেবল টেলিভিশন কিংবা নির্দিষ্ট সম্প্রচারমাধ্যমের ওপর। পরে ২০১৪ সালে ভারতের জি টিভি নেটওয়ার্কের ‘জিন্দেগি’ চ্যানেলে পাকিস্তানি নাটক প্রচারের মধ্য দিয়ে নতুন করে জনপ্রিয়তা পায় ‘হামসফর’ ও ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’-এর মতো সিরিয়াল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে দেখার মাধ্যম, তবে এসব নাটকের প্রতি আগ্রহ রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম রিলস ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ভারতীয় তরুণদের মধ্যেও পাকিস্তানি সিরিয়াল নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও একইভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে এসব নাটক। ‘তেরে বিন’, ‘কাভি ম্যায় কাভি তুম’ কিংবা ‘জিন্দেগি গুলজার হ্যায়’ এর মতো সিরিয়ালের গল্প ও অভিনয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হচ্ছে। তবে জনপ্রিয়তার পেছনে শুধু অনলাইন প্রচার নয়, রয়েছে গল্প বলার ধরন, অভিনয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতির মতো বিষয়ও।

গল্পে পরিচিত জীবনের ছোঁয়া

পাকিস্তানি সিরিয়ালের অনেক গল্পের কেন্দ্রে থাকে পরিবার ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর ভুল বোঝাবুঝি, ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে দূরত্ব, পারিবারিক প্রত্যাশা কিংবা নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো বিষয় দর্শকের পরিচিত। প্রেমের পাশাপাশি আত্মমর্যাদা, সামাজিক বৈষম্য ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নও উঠে আসে এসব নাটকে। ভারত ও বাংলাদেশের দর্শকের সঙ্গে পাকিস্তানি সিরিয়ালের গল্পের সংযোগ তৈরি হওয়ার একটি কারণ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কিছু মিল। পরিবার, বিয়ে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ও সামাজিক মর্যাদার মতো বিষয় তিন দেশের মানুষের কাছেই পরিচিত। ফলে উর্দু ভাষায় নির্মিত নাটক হলেও গল্পের আবেগ বুঝতে অনেক দর্শকের অসুবিধা হয় না। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টুডে’র ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে ভারতীয় দর্শকদের পাকিস্তানি সিরিয়ালের প্রতি আগ্রহের পেছনে গল্পের সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল এবং সাংস্কৃতিক পরিচিতির বিষয়টি উঠে আসে।

অভিনয় ও সংলাপের আকর্ষণ

পাকিস্তানি সিরিয়ালের জনপ্রিয়তার আরেকটি কারণ অভিনয়ের ধরন। অনেক নাটকে চরিত্রের অনুভূতি প্রকাশের জন্য বড় সংলাপের চেয়ে চোখের অভিব্যক্তি, নীরবতা ও ছোট ছোট প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্ব দর্শকের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। সংলাপেও থাকে প্রেম, অভিমান, আত্মসম্মান ও সম্পর্কের জটিলতা। কিছু সংলাপ কিংবা আবেগঘন দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকে নতুন দর্শক সিরিয়ালটি দেখার আগ্রহ পান। ভারতীয় দর্শকদের মধ্যে উর্দু ভাষার সংলাপ, পোশাক ও সংস্কৃতির প্রতিও আগ্রহের কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

কম পর্বে গল্প বলার প্রবণতা

পাকিস্তানি সিরিয়ালের অনেকগুলোই নির্দিষ্টসংখ্যক পর্বে গল্প শেষ করে। ফলে কাহিনির মূল দ্বন্দ্ব ও চরিত্রের পরিবর্তন তুলনামূলক দ্রুত সামনে আসে। দর্শককে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের ঘটনা দেখতে হয় না।
তবে সব সিরিয়ালের ক্ষেত্রে বিষয়টি সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। গল্পের ধরন অনুযায়ী কোনো কোনো নাটক দীর্ঘও হয়। তবু পরিকল্পিত কাহিনি, চরিত্রের ধারাবাহিকতা ও পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা অনেক দর্শকের কাছে আকর্ষণীয়।

ইউটিউব ও রিলস কীভাবে বাড়াচ্ছে জনপ্রিয়তা

পাকিস্তানি সিরিয়ালের দর্শক বাড়াতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইউটিউবে পর্ব দেখা, ইনস্টাগ্রাম রিলসে জনপ্রিয় দৃশ্য উপভোগ করা কিংবা ফেসবুকে নাটক নিয়ে আলোচনা সব মিলিয়ে দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকদের অনেকে প্রথমে কোনো দৃশ্য বা সংলাপের ভিডিও দেখেন। পরে পুরো সিরিয়াল খুঁজে দেখেন। এভাবে একটি নাটক প্রচারের সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও নতুন দর্শক পেতে পারে। তবে অনলাইনে বিপুলসংখ্যক ভিউ পাওয়া মানেই সমানসংখ্যক আলাদা দর্শক নয়। একজন দর্শক একাধিক পর্ব কিংবা একই দৃশ্য বারবার দেখলেও ভিউ বাড়ে। তাই জনপ্রিয়তা বোঝার ক্ষেত্রে ভিউয়ের পাশাপাশি দর্শকের প্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য তথ্যও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রাজনীতির বাইরে বিনোদনের এক সেতু

ভারত ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক নানা সময়ে উত্তেজনাপূর্ণ থাকলেও দুই দেশের বিনোদন জগতের প্রতি মানুষের আগ্রহ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন নয়। পাকিস্তানি সিরিয়ালের মাধ্যমে ভারতীয় দর্শকেরা প্রতিবেশী দেশের দৈনন্দিন জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, ভাষা ও সংস্কৃতির কিছু দিক দেখতে পান। একইভাবে বাংলাদেশের দর্শকেরাও এসব গল্পে পরিচিত

সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন খুঁজে পেতে পারেন।

সব মিলিয়ে, পাকিস্তানি সিরিয়ালের জনপ্রিয়তার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। পরিচিত সামাজিক বাস্তবতা, আবেগনির্ভর গল্প, অভিনয়, সংলাপ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সহজলভ্যতা সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই আগ্রহ। দর্শক শেষ পর্যন্ত এমন গল্পের প্রতি আকৃষ্ট হন, যেখানে বিনোদনের পাশাপাশি খুঁজে পান সম্পর্কের পরিচিত টানাপোড়েন, নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি কিংবা নতুন করে ভাবার মতো কোনো প্রশ্ন।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:জনপ্রিয় পাকিস্তানি সিরিয়াল

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…