ভেনেজুয়েলার নতুন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে ডেলসি রদ্রিগেজ

ভেনেজুয়েলার দায়িত্ব নেওয়া ডেলসি রদ্রিগেজ
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযানের সময় রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার পর দেশটির নেতৃত্ব নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের হাতে ন্যস্ত হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতিতে ভাইস প্রেসিডেন্টই অস্থায়ীভাবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
রোববার ৪ জানুয়ারি মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।
ভেনেজুয়েলার সংবিধানের ২৩৩ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদে প্রেসিডেন্টের অস্থায়ী কিংবা নিরঙ্কুশ অনুপস্থিতির ক্ষেত্রে নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণের বিধান রয়েছে। সেই অনুযায়ী শনিবার বিকেল থেকেই প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন শুরু করেন ডেলসি রদ্রিগেজ।
মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করার কয়েক ঘণ্টা পরই রদ্রিগেজ অন্যান্য মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে জাতীয় প্রতিরক্ষা কাউন্সিলের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে তিনি মার্কিন সামরিক অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান এবং মাদুরো দম্পতির ‘অবিলম্বে মুক্তি’ দাবি করেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল ভিটিভিতে সম্প্রচারিত ভাষণে ভেনেজুয়েলার পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে রদ্রিগেজ বলেন, ভোরের এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইন ও ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার জনগণ এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করবে এবং ল্যাটিন আমেরিকার সরকারগুলোও এর নিন্দা জানাবে।
তিনি বলেন, “আমরা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। আজ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা যেকোনো দেশের সঙ্গেই করা হতে পারে। জনগণের ইচ্ছাকে দমন করতে এই ধরনের বলপ্রয়োগ বিপজ্জনক নজির।”
মাদুরোর ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন
৫৬ বছর বয়সী ডেলসি রদ্রিগেজ কারাকাসে জন্মগ্রহণ করেন এবং ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের রাজনৈতিক আন্দোলন ‘চাভিসমো’-এর একজন গুরুত্বপূর্ণ নেত্রী হিসেবে তিনি দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন।
তার ভাই জর্জ রদ্রিগেজ বর্তমানে জাতীয় পরিষদের সভাপতি। ডেলসি রদ্রিগেজ ২০১৩-১৪ সালে যোগাযোগ ও তথ্যমন্ত্রী এবং ২০১৪-১৭ সালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে ভেনেজুয়েলার সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ মোকাবিলায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
২০১৭ সালে তিনি গণতান্ত্রিক জাতীয় পরিষদের সভাপতি হন এবং ২০১৮ সালে নিকোলাস মাদুরো তাকে নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর শুরু হওয়া মাদুরোর তৃতীয় মেয়াদেও তিনি এই পদে বহাল ছিলেন এবং একই সঙ্গে দেশটির অর্থনীতি ও পেট্রোলিয়াম খাতের দায়িত্বে ছিলেন।
ভেনেজুয়েলার বিরোধীরা দাবি করে, ২০২৪ সালের নির্বাচন জালিয়াতিপূর্ণ ছিল এবং প্রকৃত বিজয়ী ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত এডমুন্ডো গঞ্জালেজ উরুতিয়া—যাকে এই অঞ্চলের কয়েকটি সরকার সমর্থন জানিয়েছে।
সাংবিধানিক আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসে ম্যানুয়েল রোমানো সিএনএনকে বলেন, ডেলসি রদ্রিগেজ সরকারের ভেতরে একজন ‘অত্যন্ত প্রভাবশালী’ ব্যক্তি এবং রাষ্ট্রপতির ‘পূর্ণ আস্থা’ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, “তিনি ফলাফলমুখী এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ পুরো সরকারি কাঠামোর ওপর তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা কতটুকু?
মাদুরোকে আটক করার কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে ডেলসি রদ্রিগেজের যোগাযোগ হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছে, ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি নমনীয় হবেন—এমন সম্ভাবনা কম। জ্যাক ডি. গর্ডন ইনস্টিটিউটের নীতি বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক ইমদাত ওনার বলেন, “তিনি মাদুরোর কোনো মধ্যপন্থী বিকল্প নন। বরং তিনি ব্যবস্থার ভেতরে সবচেয়ে শক্তিশালী ও কট্টরপন্থী ব্যক্তিত্বদের একজন।”
মাদুরোর গ্রেপ্তারের পর দেওয়া প্রথম বক্তব্যগুলোতেও ডেলসি রদ্রিগেজ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার ইঙ্গিত না দিয়ে কঠোর অবস্থানই তুলে ধরেছেন।






