ভারতের ভোপালে আলোচিত ৩৪ বছর বয়সী ত্বিশা শর্মার মৃত্যুর আগে শেষ ৯০ মিনিটের ঘটনাপ্রবাহ উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআইয়ের ৬০০ পৃষ্ঠার চার্জশিটে। গত ১৪ আগস্ট দাখিল করা চার্জশিটে ত্বিশার স্বামী সমর্থ সিং ও শাশুড়ি গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিবিআইয়ের দাবি, মৃত্যুর দিন ১২ মে রাত ৯টা ৩৬ মিনিটে ত্বিশা তার ননদ রাশি আব্রোলকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠান। এর চার মিনিট পর সিসিটিভিতে তাকে একা ছাদে যাওয়ার দিকে যেতে দেখা যায়। রাত ৯টা ৪১ মিনিটে বাবাকে ফোন করে স্বামীর ‘আক্রমণাত্মক ও সহিংস’ আচরণের কথা জানান এবং দ্রুত বাবা-মাকে তার কাছে আসতে বলেন। রাত ১০টা ৫ মিনিটে মাকেও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
এরপর রাত ১০টা ২৩ মিনিটের দিকে সিসিটিভিতে সমর্থ ও তার মা গিরিবালাকে ছাদের দিকে যেতে দেখা যায়। পরে ত্বিশাকে নিচে নামিয়ে এআইআইএমএস ভোপালে নেওয়া হয়। রাত ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
সিবিআইয়ের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই ত্বিশা নিয়মিত মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। তার অতীতের সম্পর্ক নিয়ে স্বামী তাকে অবমাননাকর ভাষায় কথা বলতেন এবং চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করলেও তিনি ছেলের পক্ষ নিতেন বা তাকে উসকে দিতেন বলে অভিযোগ তদন্ত সংস্থার।
দাম্পত্য কলহের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয় নিয়েও বিরোধ ছিল। সিবিআই বলছে, ত্বিশার প্রায় ২০ লাখ রুপি শেয়ার বিনিয়োগ ছিল। ওই অর্থ যৌথ ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তরের জন্য সমর্থ ও গিরিবালা চাপ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। মৃত্যুর দিনও এ নিয়ে চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে চার্জশিটে বলা হয়েছে।
চার্জশিটে ত্বিশার একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি মাকে নিজের জীবন ‘নরক’ হয়ে যাওয়ার কথা জানান। চিকিৎসকের কাছেও তিনি উদ্বেগ ও মানসিক চাপের কথা জানিয়েছিলেন। পরে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিয়েও পারিবারিক চাপ ও বিরোধের মধ্যে ছিলেন বলে সিবিআই জানিয়েছে।
মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে ত্বিশা বারবার মাকে তার মানসিক অবস্থার কথা জানান এবং ভোপাল ছেড়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ১২ মে সকালে তিনি বাবা-মায়ের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ে গেলেও সম্পর্কের উন্নতির সম্ভাবনা দেখছেন না বলে পরিবারের সদস্যদের জানান।
সিবিআইয়ের বর্ণনা অনুযায়ী, মৃত্যুর রাতে রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে ত্বিশা ননদের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন এবং কাঁদছিলেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনি বাবাকে ফোন করে দ্রুত বাবা-মাকে আসতে বলেন। পরে মায়ের সঙ্গে কথা বলার পরও পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ফোন করা হচ্ছিল।
ত্বিশার মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত নিয়েও বিতর্ক হয়। প্রথম ময়নাতদন্তের পর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের নির্দেশে এআইআইএমএস দিল্লির মেডিকেল বোর্ড দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত করে। সিবিআইয়ের চার্জশিটে ওই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মৃত্যু আত্মহত্যা হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে এবং মৃত্যুর আগে শারীরিক হামলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ ত্বিশাকে শারীরিকভাবে হত্যা করা হয়েছে, এমন অভিযোগ সিবিআইয়ের মামলার ভিত্তি নয়। তদন্ত সংস্থার অভিযোগ, দীর্ঘদিনের মানসিক নির্যাতন তাকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিয়েছিল। ত্বিশার ডায়েরি, সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে করা ফরেনসিক মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়নেও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষতি ও সহায়তার অভাবের চিত্র পাওয়া গেছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই অভিযোগে সমর্থ ও গিরিবালার বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫, ১০৮ ও ৩(৫) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ত্বিশার ব্যবহৃত আইফোনের ফরেনসিক তথ্য পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি বাড়ির ডিভিআর, সিসিটিভি ফুটেজ ও অভিযুক্তদের কণ্ঠের নমুনাও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।










